সংখ্যালঘু নির্যাতন : সাম্প্রদায়িকতা অভিযোগের আড়ালে ভূমিদস্যুতা ও রাজনৈতিক কায়েমি স্বার্থ ! এবি পার্টি

img

নূরবিডি ডটকম নিউজ :  কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রংপুরের গঙ্গাচড়া ও সর্বশেষ সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় ও বাড়িঘরে সময়ান্তরে ঘটা “সাম্প্রদায়িক হামলা”গুলোর বিচার আজও হয়নি। বিগত এক দশকে সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটা উল্লেখযোগ্য কোনো হামলার বিচারই কার্যত করতে পারেনি বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকার।

এবি পার্টি মনে করে, এমন অভিযোগ ও ধারণা ইতোমধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে যে, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি কায়েমী স্বার্থবাদী চক্র সংখ্যালঘুদের জমি দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তাদের ভিটেমাটিতে ভাঙচুর চালিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে। আবার এহেন জঘন্য উদ্দেশ্য আড়াল করতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি-জামাত জোটের ওপর সংখ্যালঘু নির্যাতনের দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এই সুযোগে একটি তথাকথিত প্রগতিশীল ও সেকুলার গোষ্ঠী “সাম্প্রদায়িকতা” ও “মৌলবাদ”-এর হুজুগ তুলে দেশের আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালানো শুরু করে। বস্তুতপক্ষে, আমাদের দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর অভিমুখ এই ত্রি-চক্রের বৃত্তেই এখনো আটকে আছে।

সুতরাং, এসব হামলার পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে এই সিদ্ধান্তে আসা যৌক্তিক হয়ে পড়ে যে, সংখ্যালঘুদের জানমালের ওপর হামলাগুলো নিছক সাম্প্রদায়িকতা নয়, বরং এর নেপথ্যে মূলত দুটো বিষয় জড়িত: ভূমিদস্যুতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন প্রথম আলোতে সাম্প্রতিক একটি কলামে লিখেছেন: “প্রায় প্রতিবছরই ঘটে যাওয়া এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে এগুলো ঝোঁকের মাথায় নিছক ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকে মূলত ভূমি দখলের রাজনীতি। হামলাকারীরাও ‘সাধারণ’ কোনো মানুষ না, ধর্মীয় অনুভূতির সুড়সুড়ি দিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা চালায় যাদের মূল লক্ষ্য থাকে ভূমি দখল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পেয়েছি, রাষ্ট্র নিশ্চুপ থাকায় হামলাকারীরা প্রশ্রয় পায়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্রমাগত চাপ প্রয়োগে উৎসাহিত করে, যে পর্যন্ত না তারা ভূমি থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক সময় সেই হামলাকারীদের কাছেই নামমাত্র মূল্যে জমিটি বেচে দেয় তারা। ক্ষমতার ক্রমাগত চাপে এবং তাপে তত দিনে তারা জেনে যায়, বাপ-দাদার ভিটাবাড়িতে তারা আর থাকতে পারবে না” (২২ মার্চ, ২০২১, প্রথম আলো)।

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট একটি সংবাদ সম্মেলন করে। সেই সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা তুলে ধরেন কিভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর নানারকম অত্যাচার চালিয়ে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে উচ্ছেদপূর্বক তাদের ভিটেমাটি ও সম্পত্তি জবরদখল করা হয়। এক্ষেত্রে সংগঠনটি বর্তমান সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাকর্মীদের দায়ী করে তাদের নাম ও পরিচয়সহ একটি তালিকা প্রকাশ করে। এর ফলে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত তখন প্রশাসনিকভাবে হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগও করেন। বাংলা ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে রানা দাসগুপ্ত বলেছিলেন, “সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে দুর্বৃত্তরা ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট, জায়গা-জমি, দেবোত্তর সম্পত্তি, গির্জা ও বিহারের সম্পত্তি জবরদখলের উন্মত্ততায় মেতে উঠেছে৷ এ জবরদখলের সঙ্গে সরকারি দলের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী পরিষদের প্রভাবশালী সদস্যের নাম বেরিয়ে আসছে৷ কিন্তু সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না” (২৪ আগস্ট, ২০১৫, ডয়চে ভেলে)।

সাম্প্রতিককালে সুনামগঞ্জের শাল্লায় আমরা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখলাম। সেখানে সংখ্যালঘু নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক ডজন বাড়িঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে হামলাকালীন কোনো ছবি বা ভিডিও ফুটেজ না থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও তদন্তের আগেই মূলধারার গণমাধ্যমে “হেফাজতের সমর্থকদের হামলা” বলে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে পিবিআই-এর তদন্তে বেরিয়ে এলো ভিন্ন বাস্তবতা! শাল্লার ঘটনার মূল হোতা শহিদুল ইসলাম স্বাধীনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। তাকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশ জানায়, শাল্লায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার পেছনে “জলমহাল” নামে একটি ইজারাকৃত দিঘীর (leased water-body) দখল সংক্রান্ত বিরোধ ছিল মূল কারণ (২০ মার্চ, ২০২১, ঢাকা ট্রিবিউন)। সুতরাং, কারা সংখ্যালঘু নির্যাতক এবং সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি দখল করে—তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, রামু, নাসিরনগর থেকে সর্বশেষ শাল্লার ঘটনার একটি কমন মিল হলো, হামলার ঠিক আগে অমুসলিম কোনো যুবকের তথাকথিত ফেসবুক পোস্ট ঘিরে বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি করে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার পথ সুগম করা হয়। অথচ পরবর্তীতে সেসব বিতর্কিত ফেসবুক পোস্ট কিংবা পোস্টদাতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়না! শাল্লায় হামলার আগেরদিন ধৃত হিন্দু যুবক ঝুমন দাসের ছবি কিংবা তার সেই বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টের কোনো স্ক্রিনশট এখনো মূলধারার গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায়নি। প্রতিটি হামলার ঘটনায় এ ধরনের চরিত্র রহস্যই থেকে যায়।

ধর্মীয় ভাবাবেগের কারণেই হোক বা পূর্বোক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই হোক, এদেশে কোনো অমুসলিম ব্যক্তির পক্ষে ইসলাম-অবমাননা করে পাবলিকলি ফেসবুক পোস্ট দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার কথা নয়। তথাপি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি খুবই উদ্বেগের বিষয়। এটা ধরে নেওয়া সঙ্গত যে, কোন সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর স্যাবোট্যাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক হামলার পরিকল্পনারই অংশ এ ধরনের বিতর্কিত ফেসবুক পোস্ট—যার অস্তিত্ব পরবর্তীতে খোদ আদালতেও প্রমাণ করা সম্ভব হয়না। ২০১৬ সালে নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা যার ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে, সেই রসরাজ দাসের আইনজীবী মো. নাসির মিয়ার বক্তব্য হলো, “রিপোর্ট অনুযায়ী ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে পরবর্তীতে যেহেতু ক্ষমা চেয়ে একটি স্ট্যাটাস দেয়া হয়। তাই ধারণা করা যায় অ্যাকাউন্ট থেকে একটি স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছিল। তবে সেই স্ট্যাটাস কে দিয়েছে তা নিশ্চিত নয়। আশা করছি, দ্রুততম সময়ে অপরাধী চিহ্নিত হয়ে রসরাজ দাস নির্দোষ প্রমাণিত হবেন” (২১ অক্টো, ২০১৮, মানবজমিন)।

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে অতর্কিতভাবে সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় ও বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়। বাস্তবতা বিবেচনায় এসব হামলাকে নিছক "সাম্প্রদায়িক হামলা" হিসেবে দেখার অবকাশ আর নেই। কারণ এ ধরনের হামলাকে ভিন্নভাবে দেখার বাস্তবতা হাজির রয়েছে, যদিও একশ্রেণীর মিডিয়া কেবল সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের হুজুগ তুলে এ ধরনের হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য, অনুঘটক ও সংঘটনকারীদের আড়াল করে দেয়। এতে মূলত কায়েমি স্বার্থান্বেষীদেরই পোয়াবারো। ফলে সংখ্যালঘুদের ওপর এ ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক হামলার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়না।

এবি পার্টির জোর দাবি হলো, হাইকোর্ট বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে গত ১২ বছরে ঘটে যাওয়া এ ধরনের সকল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জাতির সামনে তাদের প্রতিবেদন ও সুপারিশ প্রকাশ করা, যাতে সংখ্যালঘুদের নিয়ে চলমান ঘৃণ্য রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়।