২০১৮ সালে সড়কে ঝরেছে ৭২২১ প্রাণ

img

 যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায় গত বছর সড়কে ৫ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ২২১ জন। আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথের দুর্ঘটনার সংখ্যা ৬ হাজার ৪৮টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৭৯৬ জন। আহতের সংখ্যা ১৫ হাজার ৯৮০। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলেন ধরে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ সব পরিসংখ্যান তুলেন ধরেন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ ও সুপারিশমালাও তুলে ধরেন তিনি। দেশের জাতীয় আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্রগুলোতে প্রচারিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে বলঅ হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপদজনক ওভারটেকিং, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ থেকে যানবাহন উঠে আসা, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা দখলে থাকা, ওভারলোড এবং ছোট যানবাহন বৃদ্ধিকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আহতদের মধ্যে ১২৫২ জন চালক-শ্রমিক, ৮৮০ জন শিক্ষার্থী, ৩২১ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৭৮৭ জন নারী, ৪৮৭ জন শিশু, ১০৬ জন শিক্ষক, ৪৩ জন সাংবাদিক, ৩৩ জন চিকিৎসক, ৯ জন প্রকৌশলী, ২ আইনজীবী ও ১৯২ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী রয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫০টি যানবাহনের পরিচয় পাওয়া গেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। 
তিনি বলেন, এসব যানবাহনের মধ্যে ১৮.৯২ শতাংশ বাস, ২৮.৬৮ শতাংশ ট্রাক ও কাভ্যার্ডভ্যান, ৭.৯৩ শতাংশ কার জিপ ও মাইক্রোবাস, ৯.৬১ শতাংশ অটোরিকশা, ২৫.৩০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৩.৭২ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৫.৮০ শতাংশই ছিল নছিমন, করিমন ও হিউম্যান হলার। ৪১.৫৩ শতাংশ গাড়ি চাপায়, ২৯.৭২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষে, ১৬.১৮ শতাংশ খাদে পড়ে, ০.৫৫ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং ০.৮৯ শতাংশ ট্্েরন-যানবাহনের সংঘর্ষে এসব দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে জানান যাত্রীকল্যাণ মহাসচিব।
২০১৮ সালের সড়ক দুর্ঘটনার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংগঠনটির মহাসচিব বলেন, গত বছরের জানুয়ারি মাসে ৪৯৯ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫১৪ জন, আহত ১৩৫৩ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৪৩৯ দুর্ঘটনায় ৪৫৯ জন নিহত, আহত ১৫২১ জন, মার্চে ৪৯১ দুর্ঘটনায় নিহত ৫০৩ জন ও আহত ১৫০৬ জন, এপ্রিলে ৪৫১ দুর্ঘটনায় ৪৭১ জন নিহত ও আহত ১২২৩ জন, মে মাসে ৪৫৮ দুর্ঘটনায় ৪৮৪ জন নিহত ও আহত ১১২৭ জন, জুনে ৫২২ দুর্ঘটনায় নিহত ৬১৫ জন নিহত ও আহত ১৭৯০ জন, জুলাইয়ে ২৭৬ দুর্ঘটনায় নিহত ৪২৫ জন ও আহত ১১২২ জন, আগস্টে ৪৯১ দুর্ঘটনায় নিহত ৫১৯ জন ও আহত ১৬৩৮ জন, সেপ্টেম্বরে ৪২৩ দুর্ঘটনায় নিহত ৫১৪ জন ও আহত ১১৬৬ জন, অক্টোবরে ৩৯৫ দুর্ঘটনায় ৪৯৫ জন নিহত, ৭৭০ জন আহত, নভেম্বরে ৪৩২ দুর্ঘটনায় নিহত ৪৩৩ ও আহত ৯৭৯ জন এবং ডিসেম্বরে ৫৩৭ দুর্ঘটনায় ৫৮৪ জন নিহত ও আহত হন ১২৭১ জন। দুর্ঘটনার পর ৬টি বিভাগীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২০৫ জন মারা যান। 
লিখিত বক্তব্যে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গত কয়েক বছরে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে যানবাহনের সংখ্যানুপাতে দুর্ঘটনার সংখ্যা ‘অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে’ রাখা সম্ভব হয়েছে বলে সমিতি মনে করে। সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতিফল ঘটিয়ে সড়ক নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ নিলে আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি। অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। সেখানে বলা হয়েছে-ট্রাফিক আইন, মোটরযান আইন ও সড়ক ব্যবহার বিধিবিধান সম্পর্কে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। একইসঙ্গে টিভি-অনলাইন, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সড়ক সচেতনতামূলক বা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা, জেব্রাক্রসিং দেওয়া, চালকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, যাত্রীবান্ধব সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন, গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিগত উন্নয়ন-আধুনিকায়ন, জাতীয় মহাসড়কে কমগতি ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা এবং লাইসেন্স নবায়নের সময় চালকদের জন্য ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করার কথা এসেছে তাদের সুপারিশে। 
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তত্তাবধায়ক সরকারে সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লর রহমান, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান, ফ্যামিলিজ ইউনাইটেড অ্যাগেনিস্ট রোড অ্যাক্সিডেন্ট (এফইউএআরএ) এর প্রধান এবং সাবেক পিএসসির চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ, বিএফইজের সহ-সভাপতি ইশতিয়াক রেজা প্রমুখ।

রিপোর্ট: দৈনিক ইনকিলাব