কর্মসংস্থান ভাবনা : প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি

img

তরুন আলেমদের মধ্যে করোনা এবং নানা বাস্তবতায় নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির চিন্তা জাগ্রত হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার কিছু আইডিয়া তরুনদের উদ্দেশ্যে শেয়ার করতে চাই। মনে রাখতে হবে, নতুন কিছু করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা ছাড়া সফল হওয়া সম্ভব নয়। আর বর্তমান পরিবেশ যেহেতু আরো বেশি নাজুক, সেহেতু আমাদেরকে পা ফেলতে হবে হিসেব করে। হুট করে কিছু করাও যেমন সম্ভব নয়। আর আলোচনা-পর্যালোচনা ছাড়া কোন কাজে জড়িয়ে পড়াও ঠিক নয়। আজকে আলোচনা করবো, এমন একটি বিষয়ে যেটা আমাদের বিশেষ করে কওমী তরুনদের মধ্যে একেবারেই নতুন।

আপনি যদি নতুন কিছু করতে চান, তাহলে আপনাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যারা অভিজ্ঞ তাদের কাছে যেতে হবে। কাছ থেকে তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করতে হবে। মনে করেন আপনি একটি কিন্ডারগার্টেন জাতীয় স্কুল করবেন, অথবা একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার করবেন, অথবা একটি সেলাই প্রশিক্ষণ সেন্টার চালু করবেন, অথবা রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করবেন, অথবা কোন বড় ব্যবসায়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে কমিশন বাণিজ্য করবেন, অথবা পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়াবেন, অথবা আরো অনেক কিছু, যার সাথে আগে থেকে আপনার পরিচয় নেই, জানাশোনা নেই। অভিজ্ঞতা নেই। তাহলে প্রতিটি ক্ষেত্রে যে পারদর্শী তার স্মরণাপন্ন হতে হবে।

আর উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও যে কোন নতুন কাজ চালু করতে হলে আপনার জন্য উত্তম হলো একটি “প্রজেক্ট প্রোফাইল” তৈরি করা। অর্থাৎ আপনি যে কাজটি করতে চান, সেটা বাস্তবায়ন করতে কি কি জিনিস লাগবে, কোন কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, এগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে, কী পরিমাণ খরচ হবে। অনুমোদনের জন্য হঠাৎ করে কোন অফিসে কাগজপত্র নিয়ে হাজির হলেই অনুমতি দিবে না, তারজন্য পুর্ব থেকে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। এসব বিষয় নোট করতে হবে। একটি কাজ শুরু করবেন, তার জন্য কেমন অর্থের প্রয়োজন হবে, সেই অর্থ কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন আবার কীভাবে রিটার্ন আসবে তার একটি খসড়া ধারণা লিপিবদ্ধ করতে হবে।

একটি সফল “প্রজেক্ট প্রোফাইল” তৈরি করতে পারা মানে কাজের অর্ধেক পথ এগিয়ে যাওয়া। একটি উদারহণ দিই। আমার ছোট ভাই সৈয়দ কামরুল হুদা, একসময় পাবনা খোদাইপুর, নাজিরপুর বড় গোরস্তানের পাশে আল ফোরকান নির্মিত একটি মসজিদ আছে, সেখানে একটি মসজিদ আছে এর দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু অফিস থেকে সেখানে বড় ধরণের প্রজেক্ট তৈরি করে দেওয়া হয়। সেখানে একসাথে কয়েকটি ভবন নির্মাণ করে দেওয়া হয়। তার মধ্যে হিফজুল কুরআন মাদ্রাসার জন্য একটি ভবন, হোমিও দাতব্য চিকিৎসালয়ের জন্য একটি ভবন, মাদ্রাসার জন্য অতিরিক্ত একটি ভবন। মাদ্রাসার ভবনটিতে সংস্থার উদ্যোগে প্রথম কিন্ডারগার্টেন করার জন্য সংস্থার পরিচালক বরাবর প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। তখন পরিচালক মহোদয় বলেন, তোমরা যে কিন্ডারগার্টের চালাইতে পারবা কী না তার একটি প্রজেক্ট তৈরি করে পাঠাও। তখন আমার ছোট ভাই পাবনার সব প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্টেন গুলোতে যাতায়াত করতে শুরু করে। যারা কিন্ডারগার্টেনের বই সাপ্লাই দেয় তাদের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করে। অতঃপর একটি কিন্ডারগার্টেন করতে কেমন খরচ হবে, প্রাথমিকভাবে কী পরিমাণ থোক বাজেট লাগবে, পরবর্তীতে এই টাকা কিন্ডারগার্টেন থেকে কীভাবে রিটার্ণ আসবে, ধীরে ধীরে কিন্ডারগার্টেন কীভাবে স্বাবলম্বি হবে এবং নিজস্ব আয় দ্বারা চলতে পারবে, তার বিস্তারিত লিখিত বিবরণ পেশ করে।

ঢাকা হেড অফিস থেকে যখন লিখিত প্রপোজাল দেখে, তখন আল মুনতাদার তৎকালীণ পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মুজিবুর রহমান সাহেব বুঝতে পারেন যে, এই ছেলের দ্বারা প্রতিষ্ঠান চলবে।

হে প্রিয় তরুন বন্ধুরা! তোমাদের সামনে বিরাট সুযোগ আছে। আমাদের দেশে অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি আছে, তারা নিজেরা সমাজসেবামূলক অনেক কিছু করার সুযোগ পায় না নানা কারণে। উনারা সমাজের জন্য অনেকেই কিছু করতে চান। কিন্তু উপযুক্ত লোকও পান না, পরিবেশও পান না। কার হাতে উনাদের কষ্টার্জিত সম্পদ তুলে দিবেন সেটা নিয়ে নির্ভরতা পান না। আমরা যদি যার কাছে যে কাজটা ভালো লাগে, সেই বিষয়ে ভালো অভিজ্ঞ লোক দিয়ে প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে বিশ্বস্ত লোক মারফত সম্পদশালীদের কাছে যেতে পারি, তাহলে অনেক নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্পদ।
এতদিন আমাদের মুরুব্বিরা শুধু মাদ্রাসা গড়ার দিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরা এ কাজে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি বলে এটাকে খুব সহজ মনে করি। পরিস্থিতি যেহেতু পাল্টে যাচ্ছে, তাই আমাদেরকে নতুন কিছু করতে হবে। সমাজকে আরো বেশি কিছু দিতে নতুন কিছু করার বিকল্প নেই।

মনে করেন, একটি কারিগড়ি প্রশিক্ষণ সেন্টার গড়তে চাইলেন, তাহলে খুব ভালো একজন যোগ্য লোক দিয়ে একটি প্রোফাইল তৈরি করুন। অতঃপর দেশের বড় বড় কয়েকটি কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করুন। মনে করুন, বসুন্ধরা গ্রুপে আপনার পরিচিত কেউ আছে, আকিজ গ্রুপের সাথে আপনার সম্পর্ক তৈরির কোন ওয়ে আছে, তাহলে তাদের কাছে আপনার প্রোফাইলটি পেশ করুন, আমার বিশ্বাস যে, ভালো মানের একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করতে পারলে তাদের নিকট থেকে ৫/১০লাখ টাকা বের করা কঠিন কিছু নয়। তারা খুশিতেই দিবেন। তাদের পরামর্শে আপনার মাধ্যমে দেখা যাবে ৫০জন বা ১০০জন লোকের কর্মসংস্থান হয়ে গেছে। আপনি এর হেড হয়ে গেলেন। একটু ধৈর্য ধরে কাজ করতে পারলে সফলতা আসবেই।

আমরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যেভাবে বড় লোকদের কাছে, অসৎলোকদের দহলিজে গিয়ে ধর্ণা দিই, এরচেয়ে হাজার গুণ ইজ্জতওয়ালা কাজ হবে এটি। তারা যেই কাজটা বুঝে সেই কাজটি যদি আাপনার হাত দিয়ে হয়, তাহলে তারা অর্থের নিরাপত্তা পাবে। অনেক বড় লোক টাকা দিতে চায় না এই কারণে যে, যেই কাজের কথা বলে টাকা আনে অনেকেই সেই কাজ করতে পারে না।

আমি মনে করি, দেশে বর্তমানে অর্থের অভাব্ নেই। পরিকল্পনার অভাব। আমরা সঠিক পরিকল্পনা করতে পারলে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হবে ইনশাআল্লাহ। আমি বিশ্বাস করি যে, এদেশের কওমী তরুনরা অনেক মেধাবী ,সৎ, পরিশ্রমী, সাহসী। সঠিক নির্দেশনা পেলে তারাও জাতিকে অনেক ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে। তারা কোনভাবেই জাতির জন্য বোঝা নয়। কওমী মাদ্রাসায় পড়া প্রতিটি ছেলে জাতির জন্য অমূল্য সম্পদ।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট 'বিআইএম'
26.06.2021