পাসপোর্ট সংশোধনের বিষয়টি খোলাসা করতে হবে

img

ইনকিলাব সম্পাদকীয় পাতা থেকে, 
নতুন ইস্যু করা ও নবায়িত পাসপোর্টে, ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড একসেপ্ট ইসরাইল’ কথাটি নেই। তার বদলে স্থান পেয়েছে এই কথাটি, ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড।’ বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশ পার্সপোট সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধন কবে করা হয়েছে, কেন করা হয়েছে, দেশের মানুষ ঘুণক্ষরেও তা জানেনা। পাসপোর্ট সংশোধনের বিষয়টি ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তরফে স্বাগত জানানোর পর তা অনেকের নজরে এসেছে। মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে আলোচনা-সমলোচনা দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ বাধ্য হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘এই বিষয়ে আমরা ৬ মাস আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ কেন এই সিদ্ধান্ত, সে প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘আমাদের দেশের পাসপোর্ট যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো শক্তিশালী হয়, সে জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কথা উঠতে পারে, তাহলে কি আগে বাংলাদেশ পাসপোর্ট দুর্বল ছিল? বলা বাহুল্য, এর কোনো জবাব নেই। অনেকের মনেই বাংলাদেশের ইসরাইলনীতির পরিবর্তন ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে কিনা সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেছেন, ‘ইসরাইল ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান আগের মতোই আছে। আমরা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিচ্ছিনা।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের এ সম্পর্কিত বিজ্ঞপ্তিতে পাসপোর্ট সংশোধনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে,‘বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের ইসরাইল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা অপরিবর্তিতই থাকছে।’

প্রশ্ন হলো, সবকিছুই যদি ঠিক থাকে, আগের মতো থাকে, তবে পাসপোর্টে এই পরিবর্তন কেন আনা হলো? বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যনীতি ও ইসরাইলনীতি সবসময় স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও দ্ব্যার্থহীন। বাংলাদেশ ইসরাইলকে বৈধ রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকার করেনা। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজন বোধ করেনা। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবর থেকে জানা গেছে, ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ইসরাইলের এ প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু সরকার প্রত্যাখ্যান করেছিল। সরকারের এই দৃঢ় অবস্থানের কারণ ছিল, ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকার না করা এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানানো। দীর্ঘ ৫০ বছরে বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটেছে, বিভিন্ন দলীয় সরকার ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু ইসরাইল প্রশ্নে বাংলাদেশের নীতির এতটুকু পরিবর্তন ঘটেনি। গাজায় ইসরাইলের সম্প্রতিক হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুর্গত ফিলিস্তিনীদের জন্য সহায়তা পাঠানো হয়েছে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, বঙ্গবন্ধু স্বয়ং ফিলিস্তিনীদের জন্য ও অন্যান্য সামগ্রী পাঠিয়েছিলেন তাদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত-অনুসৃত নীতিই একদিন মান্য করে আসা হয়েছে। সে নীতি সম্পূর্ণ অটুট থাকলে তো পাসপোর্টে সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়ার কথা নয়। বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীরা তাদের পাসপোর্টে ‘এক্সেপ্ট ইসরাইল’ লেখা থাকার কারণে বিশ্বের কোথাও সমালোচনা বা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। কাজেই, এই সংশোধন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়।

পাসপোর্ট সংশোধন ঠিক হয়নি কিংবা এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল, তা কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়নি। অন্যদিকে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে এমন জল্পনা-কল্পনা রয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক গড়ে উঠতে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে? এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের ইসরাইলনীতি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে সব মানুষের মনে। অবিলম্বে ও এ ধোঁয়াশা কাটানো দরকার। দীর্ঘদিনের কোনো নীতি-অবস্থান থেকে দেশ যদি সরে আসে তবে সেটা অবশ্যই জনগণের জানার অধিকার আছে। সরকারের তরফে সবকিছু খোলাসা করা দরকার। সামনে পার্লামেন্ট বসছে। পার্লামেন্টে এ ব্যাপারে আলোচনা করে জনগণকে অবহিত করতে হবে। সরকার এ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। আমরা আশা করবো, পার্লামেন্ট এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং তাতে জনগণের মনের সংশয় দূর হয়ে যাবে।