Notice: Undefined variable: blog in /home/noorbd/public_html/app/core/noorbd/editorial.php on line 58

Notice: Undefined variable: blog in /home/noorbd/public_html/app/core/noorbd/editorial.php on line 59
আস্থার জায়গার ভূমিধ্বস

আস্থার জায়গার ভূমিধ্বস

img

বাংলাদেশের দ্বীনি অঙ্গনে পরিবর্তনটা দ্রুত ঘটে যাচ্ছে। আমরা কেউ বুঝতে পারছি, আর কেউ বুঝতে পারছি না। নেতৃত্বশুন্যতা সর্বত্র যেভাবে তৈরী করা হয়েছে এমনিভাবে দ্বীনি অঙ্গনেও নেতৃত্বশুন্যতা তৈরী হয়ে যাচ্ছে আমাদের অজান্তেই। এমনসব দুর্বল নেতৃত্ব আগামীর নেতৃত্ব নিতে প্রস্তুত হচ্ছে যাদের প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থার পরিবেশও ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে। এরদ্বারা যে সংকটটা তৈরী হচ্ছে, সেটা হলো, এমন একটি নেতৃত্ব সামনে আসবে যাদের প্রতি আস্থা নেই, ভরসা নেই। কোন প্রকার ভক্তি ও শ্রদ্ধাও নেই। কিন্তু তারপরও তারাই নেতৃত্বের আসনে বসে থাকবে। এতে অভ্যন্তরীণ সংকট ঘনীভূত হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী অভ্যন্তরীণ বিরোধ জিইয়ে রেখে দূর থেকে গোটা শক্তিটাকে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি হিসেবে নিয়ন্ত্রন খুব সহজ হয়ে যাবে।

একের পর এক এমনসব ঘটনা ঘটছে যেগুলো দেখার জন্য গোটা কওমী অঙ্গন কখনো প্রস্তুত ছিল না। সর্বশেষ সংঘটিত ঘটনা নিয়েই আজকে কিছু কথা বলতে চাই। গতকাল দারুল ‍উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে বেফাক এর খাস কমিটির বিশেষ মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এ মিটিং এর ধরণ, উপস্থিতি, সিদ্ধান্তগ্রহনের সবকিছু পর্যালোচনা করলে হতাশার চূড়ান্ত বার্তা আমাদের দেয়।

প্রথমত: মিটিং এর ধরণ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। বেফাক একটি জাতীয় বোর্ড। বাংলাদেশের অধিকাংশ কওমী মাদ্রাসা যে বোর্ডের নিয়ন্ত্রনে চলে। যার সাথে সম্পৃক্ত এদেশের হাজার হাজার শীর্ষ আলেম এর রক্ত ও ঘাম। অথচ এমন একটি বোর্ড এর মিটিং বোর্ড অফিসে করার ক্ষমতা রাখেন না তার চেয়ারম্যান। তিনি চলনশক্তিহীন। প্রায় বাকশক্তিহীন। মৃত্যুপথ যাত্রী। মানবিক এবং জাগতিক কোন দৃষ্টিতেই এমন ব্যক্তির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে একটি জাতীয় বোর্ডের জটিল জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা থাকার কথা না। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সে ঘটনাই ঘটছে। রহস্যজনক কারণে এ ধরণের বৈঠক সম্পর্কে মুখ খুলছেন না এদেশের বিজ্ঞ আলেম সমাজও।

দ্বিতীয়ত: একটি জাতীয় বোর্ডের জাতীয় সংকট দূর করতে এর চেয়ারম্যান মিটিং ডেকেছেন। সেই মিটিং এ চলমান কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুনমোদিত গঠনতন্ত্রের আলোকে গঠিত খাস কমিটির ১৬সদস্যের মধ্যে প্রভাবশালী ৭জন উপস্থিত হননি। একটি বিশেষ মুহুর্তে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এদের অনুপস্থিতি বেফাকের অভ্যন্তরে স্থায়ী বিভাজনের বীজ বপন করে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

তৃতীয়ত: খাস বৈঠকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটিতে কারা থাকবেন তাদের নাম পরিস্কারভাবে উল্লেখ করা হয়। উনারা কতদিনে তদন্ত করবেন, কবে রিপোর্ট প্রদান করবেন তার সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়। এটুকু সব ঠিক আছে। প্রশ্ন উঠেছে এই সভাপতির কার্যালয় থেকেই কিছুদিন পুর্বে বেফাক মহাসচিব এর ব্যাপারে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে একটি সাফাইপত্র দেওয়া হয়। যেটাকে বেফাকের পেইজ থেকে প্রকাশ করতে বোর্ডের প্রশাসনিক সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জনাব যুবায়ের আহমদ চৌধুরীকে বাধ্য করা হয়। সেই পত্রে পরিস্কার লেখা ছিল, মহাসচিবের ব্যাপারে সভাপতি তদন্ত করেছেন। ঘটনা যাচাই বাছাই করে তিনি কোন অনিয়মের সন্ধান পাননি। শুধু তাই নয় সম্মানিত সভাপতি তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করে মহাসচিবের পক্ষে একটি বিবৃতিও প্রকাশ করেন। সেই চিঠি নিয়ে তখনই চতূর্দিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। কখন তদন্ত কমিটি গঠন হলো? কারা সেই কমিটির সদস্য? কখন রিপোর্ট জমা দিলো এর কোন কিছু সম্পর্কেই জাতিকে অবহিত করা হলো না। অথচ বোর্ডের পেইজ থেকে জোরপুর্বক একটি সাফাইপত্র প্রকাশ করা হলো। এটা যে সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল সেটা গত ১৬.০৮.২০২০তারিখের মিটিং এ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো।

প্রশ্ন উঠেছে যেই অফিস থেকে মিথ্যা সাফাইপত্র প্রকাশ হতে পারে, যেই অফিস থেকে তদন্ত ছাড়াই তদন্তনামা তৈরীর কথা বলতে পারে, সেই অফিস যে আগামীতেও এমন আজগুবি সাফাইপত্র প্রকাশ করবে না এর কী গ্যারান্টি আছে? এটা একটি চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতারণা। এই ঘটনার পর সভাপতির কার্যালয় সকল দিক দিয়ে আস্থা হারিয়েছে। এটাকেই আমি কওমী জগতের ভূমিধ্বস বিপর্যয় বলে আখ্যায়িত করতে চাই।

চতুর্থত: কওমী মাদ্রাসাসমূহ সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে এতদিন যাবত পরিচালিত হয়ে আসছে। মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা তারা নিরঙ্কুশভাবে পেয়ে আসছে। লাখ লাখ আলেম মানুষের শ্রদ্ধা ও সম্মান নিয়েই দ্বীনি খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। গুটি কয়েক ব্যক্তি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সামান্য দায়িত্ব পেয়ে যেভাবে গোটা কওমী অঙ্গনকে কলুষিত করছে তা দেখে কলিজা ফেটে যাচ্ছে এদেশের কওমী তরুন আলেমদের। এখন যেহেতু মিডিয়ার যুগ। কোনকিছুই আর তাই আড়াল করা যাচ্ছে না। সেহেতু এসব কিছু নিয়ে লুকোচুরি করার কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সরকারের একটি আইন আছে তথ্য পাওয়ার অধিকার। প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত যে কোন তথ্য পাওয়ার অধিকার এখন সবাই রাখে। এছাড়া এখন ডিজিটাল যুগ। যে কোন সময় যে কোন জায়গা থেকে তথ্য বের করা যায়। সেহেতু কওমী অঙ্গনের কেউ যদি মনে করে কোন কিছু চাপা দিয়ে রাখবে তাহলে তা আর তার পক্ষে সম্ভব না।
আফসোসের বিষয় হলো, বেফাক এর অনিয়ম নিয়ে যখন অনেক তথ্য অনাকাংখিতভাবে প্রকাশ হয়েই পড়েছে, এরপরও এর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলগণ যেভাবে পদ আঁকড়ে আছেন তা দেখে আমরা লজ্জিত। উপরুন্ত বেফাকের সর্বেোচ্চ পরিষদ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের দ্বারা এটা আবারও প্রমাণিত হলো যে, এখানে দুর্র্নীতি হযেছে, অনিয়ম হয়েছে। একজন আলেমের গায়রত থাকলে তিনি স্বেচ্ছায় স্বচ্চতা প্রমাণের জন্য পদ থেকে সরে দাঁড়াতেন। অথচ বাস্তবে আমরা এর বিপরীত দেখতে পাচ্ছি। জাহেল মানুষদের মতো যে কোন উপায়ে পদ আকড়ে থাকার চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। এতে এদেশের বড় ব্যক্তিদের প্রতি আগামী প্রজন্মের আস্থা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব দেশের সামাজিক পরিমন্ডলেও পড়তে বাধ্য।

পঞ্চম যে বিষয়টি আলোচনা করতে চাই, যাদেরকে তদন্ত কমিটিতে নাম প্রস্তাব করা হয়েছে তাদের অনেকেই এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে ইতিমধ্যেই মিডিয়ায় নিউজ হয়েছে। যাদের নাম প্রস্তাব করা হযেছে তারা সকলেই এদেশের সম্মানিত ব্যক্তি। তাদেরকে কি সত্যিকার অর্থেই তদন্ত করতে সভাপতির কার্যালয় থেকে সহযোগিতা করা হবে? বর্তমানে মাদ্রাসা খোলা নিয়ে সকল পরিচালকবৃন্দ ব্যস্ত রয়েছেন। এহেন অবস্থায় যে সময় দিয়ে কমিটি গঠিত হয়েছে সে সময়ে তারা তা সম্পন্ন করতে পারবে কী না ভেবে দেখতে হবে। আমরা চাই সুন্দর একটি সমাধান। আমরা চাই ঘটনা সাহসের সাথে তদন্ত সাপেক্ষে তারা নির্দেোষ প্রমাণিত হন। কারো প্রতি আমাদের্ ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভ কিছুই নেই। কিন্তু দেশের সাধারণ অঙ্গনের মতো যদি ধামাচাপা দিয়ে কিছু করা হয় সেটা হবে আত্মঘাতি। কারণ কওমী মাদ্রাসাসমূহ দেশের সাধারণ মানুষের দান-দক্ষিণায় চলে। একবার এসব বিষয়ে আস্থা নষ্ট হযে গেলে আম-ছালা সবই যাবে। সরকারও কিছু দিবে না। জনগণও মুখ ফিরে নিবে।

ষষ্ঠত: বারবার সিদ্ধান্তহীনতা আস্থার জায়গাটায় আরো বড় ধরণের ধ্বস নামাচ্ছে। ঈদের আগে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মাদ্রাসা খোলার ঘোষণা, ঈদের পরে আবার তা স্থগিত করা। ১৮আগষ্ট বোর্ডের শুরা মিটিং ডেকে আবার তা স্থগিত করা। হাটহাজারীতে ইতিপুর্বে খাস কমিটির মিটিং ডেকে তা স্থগিত করা এসব বিষয় বোর্ডের অভ্যন্তরে অস্থিরতা বিরাজ করার প্রমাণ দেয়। কেন এমনটা হচ্ছে? দেশের শ্রদ্ধেয় আলেম সমাজের বিপুল একটি অংশ এসব বিষয়ে একেবারে নীরব ভূমিকা পালন করছেন দেখে আমাদের মাঝে হতাশা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

সপ্তমত যে বিষয়টি বলতে চাই, দেশে কি সক্ষম, যোগ্য আলেম আর কেউ নেই? আল্লামা আহমদ শফী কি চিরদিন বেঁচে থাকবেন? তাঁর জায়গায় হাল ধরার মতো কি কেউ নেই? কেন মৃতপ্রায় একজন সম্মানিত মানুষকে সামনে রেখে এসব করা হচ্ছে? এসব করে আমরা একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষের ওপরে জুলূম করে যাচ্ছি বলেই মনে হয়। তাঁর আকাশসম গ্রহনযোগ্যতাকে মৃত্যুর আগেই শুন্যের কোটাই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

অষ্টমত যে বিষয়টি বলতে চাই, বেফাক এর পক্ষ থেকে হাটহাজারীতে গিয়ে খাস কমিটির মিটিং যে সময়টাতে হযেছে, সেই সময়টায় সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ইস্যু থাকার কথা ছিল মাদ্রাসাগুলো খোলার ব্যাপারে দিক নির্দেশনা। কী করবে দেশের সকল মাদ্রাসার মুহতামিমগণ? অনেকে মাদ্রাসা খুলছে, অনেকে ভয়ে খুলছে না। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় দিচ্ছে। অনেকে পরিস্কার ঘোষণা না আসায় সন্তানদের মাদ্রাসায় দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। অথচ এই ইস্যুতে কোন কথাই হলো না। প্রকাশিত বিবৃতিতে এ সম্পর্কে একটি বাক্যও উচ্চারণ করা হলো না। এটা কি বর্তমান সভাপতির কার্যালয়ের ব্যর্থতা আবারও প্রমাণ করে না? মিটিং এ ১১তলা ভবন নির্মাণ কাজের জন্য শুকরিয়া জ্ঞাপন করা হয়, অথচ মূল ইস্যুই তারা ভুলে গিয়েছে। এসব কিসের নিদর্শন? নাকি বোর্ডের বিপুল টাকা খরচ করে কোন ব্যক্তি বিশেষকে রক্ষা করাই এসব মিটিং এর উদ্দেশ্য?

আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি রহম করুন। কওমী আলেমদের ইজ্জত ও সম্মানের সাথে দ্বীনি খেদমত করার তৌফিক দান করুন। অযোগ্যদের দুর্বৃত্তপনা থেকে এই অঙ্গনকে রক্ষা করুন।

17.08.2020