কালিমাখচিত পতাকার শান ও মান ধরে রাখতে হবে

img

প্রকৃত মুসলমানদের হাতে দেশ শাসনের সুযোগ খুব কমই এসেছে। বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রের যারা শাসক তাদের প্রায় সকলেই পাশ্চাত্য ধাঁচের শিক্ষায় শিক্ষিত। মনস্তাত্বিকভাবে তারা ইসলামের চেয়ে পাশ্চাত্যকে বেশি সভ্য ও অগ্রগামী মনে করে। অনুসরণযোগ্য মনে করে। মুসলিম দেশগুলোতেও কুরআন-সুন্নাহ নির্ভর আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি। যে কারণে অমুসলিমতো দূরের কথা, অনেক মুসলমানই জানে না, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কেমন হবে? তাঁর উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে? আধুনিক যুগে এসে ইসলামের আলোয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি, মিডিয়া কীভাবে চলবে? ইসলামী আইনে দেশ শাসনের সুফল দেশবাসি কীভাবে ভোগ করবে?

কিছু কিছু মুসলিম দেশে নামধারী শাসকদের নেতৃত্বে ব্যক্তিতান্ত্রিক শোষণতন্ত্রের যে মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটাকে অনেকে ইসলামী শাসন মনে করে। ফলে মানুষের মধ্যে প্রকৃত ইসলামের সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় না। গাদ্দাফি, সাদ্দাম হোসেন, হোসনি মোবারক, বেন আলী এবং আরব বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রে যে গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসন চলে, এটাকেও অনেকে ইসলামী শাসন মনে করে। আসলে এগুলো মুসলিমদের নামে চললেও ইসলামী শাসন নয়। ইসলামের মূল চেতনা নির্ভর মুসলিম শাসন বর্তমান বিশ্বে নেই বললেই চলে।

ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি হবে তাকওয়াভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি। অনেকেই শরিয়াহ কায়েমের নামে এক ধরণের ভীতি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন। শরিয়াহ ভিত্তিক শাসনতন্ত্রের কথা শুনলেই কিছু লোক হাতকাটা, রজম মারা ইত্যাদির শাসনকেই বুঝে। আসলে ইসলামী চেতনাসম্পন্ন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি উদার। অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক। শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকারক। ইসলামী শাসনের কথা শুনলেই ইসলামপন্থীরাও ইসলামের কতিপয় বিষয়ে কঠোরতার কথাগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে। এর ব্যাপকভিত্তিক যে সুন্দর শাসন- প্রণালীও আছে, সেটা পরিস্কার করা হয় না।

আধুনিক বিশ্বে আ ফ গা নে তালেবদের মাধ্যমে নতুন করে যে সরকার গঠিত হয়েছে, এটা একটি চ্যালেঞ্জ। তারা নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেই ক্ষমতায় এসেছে। তাদের সামনে ইসলাম কায়েমের পথে এখন কোন বাহ্যত বাধা নেই। তারা যদি সফল না হতে পারে তাহলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এটা বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যাবে যে, এই যুগে ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব নয়। আ ফ গা নে র আকাশে তারা কালিমার পতাকা উড়িয়েছে। এখন জনগণের সামনে ইসলামের সুমহান আদর্শকে তুলে ধরার সুযোগ এসেছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। এই সুযোগ ধরে রাখার জন্য যা যা করার দরকার তাও করতে হবে। যেমন, আ ফ গা নে এখন আর অস্ত্রের যুদ্ধ নেই। থাকলেও সেটা সীমিত আকারে। তাদের এখন বড় যে যুদ্ধটা করতে হবে, সেটা হলো প্রচার যুদ্ধ। মিডিয়ার যুদ্ধ। সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরার যুদ্ধ। তাদেরকে শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে তুলতে হবে। আ ফ গা ন মুসলমানদের প্রাপ্য নাগরিক মর্যাদা বিশ্ববাসির সামনে প্রতিনিয়ত সুন্দর ভাষায় উপস্থাপন করতে হবে। আ ফ গা নে উন্নত একমুখি বিভেদহীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তারা প্রথম দফায় যে সরকার গঠন করেছিল সে সময় চতুর্মুখি ষড়যন্ত্র এবং অনভিজ্ঞতার কারণে অনেক কিছু ঠিকমতো ডিল করতে পারেনি। ফলে খুব অল্প দিনের ভিতরেই বড় ধরণের বিপর্যয় নেমে এসেছিল। তবে তারা এখন অনেক ত্যাগ ও কোরবানির পর ১৫আগষ্ট,২০২১ আবার বিজয়ীর বেশে ক্ষমতায় ফিরে এসেছে।প্রথম দফা ৫বছর ক্ষমতায় থেকে অনেক কিছু তারা শিখেছে। আর ২০টি বছর সাম্রাজ্যবাদি শক্তির সাথে অসম যুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করে অবশেষে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক শক্তিরও কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা তাদের জন্য বড় ধরণের একটি অর্জন। ১৯৯৬সালের ক্ষমতারোহন আর ২০২১সালের ক্ষমতারোহনের মধ্যে অনেক ব্যবধান রয়েছে।

তালেবরা গোটা আ ফ গা নে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বিষফোঁড়ার মতো থাকা পাঞ্জশীর পর্যন্ত তারা নিয়ন্ত্রনে নিতে পেরেছে। অতঃপর গতকাল ৭সেপ্টেম্বর ২০২১খ্রী: ৩৩সদস্যের একটি অন্তর্বতীকালীন সরকার গঠন করেছে। এমন সরকার গঠন অনেক দেশেই হয়। কিন্তু তাদের সরকারে আসার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। এখানে এমন একদল ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ গোটা দেশটির নিয়ন্ত্রন নিতে পেরেছে যারা তাকওয়াবান। যাদের সামনে ব্যক্তিগত কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই যাদের কাম্য।

দুনিয়ার সবদেশে মানুষ ক্ষমতা গ্রহন করে দুনিয়াবী কিছু অর্জন করার জন্য। এক্ষেত্রে তালেবরা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা প্রথম চ্যালেঞ্জ এ বিজয়ী হয়েছে। এখন দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জেও বিজয়ী হতে হবে। আর এটা যেহেতু মিডিয়ার যুগ, তাই সবকিছু বিশ্ববাসির সামনে চমৎকার করে তুলে ধরতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা সবক্ষেত্রে নতুন কিছু উপহার দিতে হবে। একটি বৈষম্যহীন শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ববাসিকে দেখাতে হবে যে, ইসলামই সেরা। কথায় কথায় শুধু শরিয়া কায়েম করা হবে না বলে বাস্তবেই কুরআন ও সুন্নাহর শাসন কায়েমের যেহেতু সুযোগ এসেছে তাই এটাকে কোনভাবেই অবহেলা করা যাবে না। জ্ঞান- বিজ্ঞানসহ আবিস্কারের ধারায় আবার মুসলমানদের নেতৃত্বের আসনে নিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতা দখল করা যতটা কঠিন, তার চেয়ে বেশি কঠিন এটাকে ধরে রাখা।

বর্তমান বিশ্বে মিডিয়া, সামরিক শিল্প ও শিক্ষা- গবেষণার ক্ষেত্রে যারা উৎকর্ষতা সাধন করবে তারাই নেতৃত্বের আসনে থাকতে পারবে। আবেগ দিয়ে বেশি দিন মানুষকে ধরে রাখা যাবে না। ভালো কিছু না পেলে মানুষ ইসলামকে নিয়ে ভুল বুঝতে শুরু করবে।

আমরা আশাবাদি, মধ্য এশিয়ার সুন্দর একটি দেশে ইসলামের যে বিজয় অর্জিত হয়েছে তা আলো ছড়াবে বিশ্বময়। তারা কথা-বার্তায় হবে অনেক বেশি সতর্ক ও স্মার্ট। ইসলামকে উপস্থাপন করবে সর্বোচ্চ সুন্দর পদ্ধতিতে। তাহলেই মানুষ এ শাসনকে সাদরে গ্রহন করবে। আল্লাহ আ ফ গা নে র নতুন সরকারকে অনেক বেশি সাহায্য করুন। তাদেরকে চূড়ান্ত বিজয় দান করুন। আর আমাদেরকেও তাদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহন করার তৌফিক দান করুন।

বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম
09.09.2021