কওমি মাদরাসা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

img

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
বাংলাদেশের ২৫ হাজারেরও বেশি কওমি মাদরাসাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব মাদরাসায় ছাত্রসংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি। কওমি মাদরাসাগুলো সরকারি বেতনভাতা ও দান-অনুদানের ওপর নির্ভরশীল নয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য-সহযোগিতাই এসব মাদরাসার আর্থিক চালিকাশক্তি। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডে হাজার হাজার কওমি মাদরাসা শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তানে কওমি মাদরাসার তাকমিল (দাওরায়ে হাদিস) সনদের স্বীকৃতি রয়েছে। কোথাও সরকারের নজরদারি ও হস্তক্ষেপ নেই। সরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলেই কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমনটাই ধারণা কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের।

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর জন্য ‘যুগোপযোগী’ শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সাথে মাদরাসাগুলোকে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনতে একটি নীতিমালাও প্রণয়নের আদেশ দেয়া হয়েছে। গত ২১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের এক অফিস আদেশে এ সংক্রান্ত ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমানকে আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক মো: আব্দুস সেলিমকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে কওমি মাদরাসাসহ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকরকরণ ও সরকারের নিবন্ধনের আওতায় আনার লক্ষ্যে সমন্বিত একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি, কওমি মাদরাসা আলাদাভাবে পরিচালিত ছয় বোর্ডকে সমন্বয় করে একটি কওমি শিক্ষা বোর্ড গঠনের প্রস্তাব প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ১৫ সদস্যের ওই কমিটিতে মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, জননিরাপত্তাবিষয়ক বিভাগের একজন প্রতিনিধি, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কওমি মাদরাসার ছয় বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও পদাধিকার বলে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কওমি মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রম উন্নয়নের বিধান রেখে ‘শিক্ষা আইন ২০২১’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই খসড়ায় বলা হয়েছে- সরকার কওমি মাদরাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কওমি মাদরাসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখেই শিক্ষা কার্যক্রম উন্নয়ন করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে (যুগান্তর, ঢাকা, অনলাইন সংস্করণ, ২৪ জুন-২০২১)।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, কওমি মাদরাসার ইতিহাস, ঐতিহ্য, অবদান, পাঠ্যক্রম, শিক্ষাধারা সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ধারণা স্বচ্ছ ও ইতিবাচক নয়। বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রদত্ত বক্তৃতায় এটা প্রমাণিত হয়। গত ৩ মে জাহানারা ইমামের ৯২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ কর্তৃক ‘সকল কওমি মাদরাসা সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে’-এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে শিক্ষামন্ত্রীর এমন পর্যবেক্ষণ আসে যা কওমি ধারার মানুষের জন্য উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছি, তখন কওমি মাদরাসাগুলোকে শিক্ষার্থীদের জাতিবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, নারীবিদ্বেষী গুজবের কারখানা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চূড়ান্ত অপব্যবহার করছে স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি।’ সরকারের অবস্থান তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘লাখ লাখ কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীকে মূলধারায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মানুষ শুধু দারিদ্র্যের কারণে নয়, ধর্মের কারণেও সন্তানকে কওমি মাদরাসায় ভর্তি করেন। এই বাস্তবতাও আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের সবার দায়িত্ব সমাজে সচেতনতার ক্ষেত্র তৈরি করা। মাদরাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষা না জিহাদের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে বাবা-মাকে জানাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে’ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৪ মে-২০২১)।

এর ধারাবাহিকতায় গত ২৪ জুন কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়ার অধীনস্থ বোর্ডসমূহের চেয়ারম্যানদের নিয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রীর সভাপতিত্বে তার দফতরে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয় এবং সহকারী সচিব (মাদরাসা-৩) ‘অফিস আদেশ’ দেন। সময়স্বল্পতার এবং এ জাতীয় সভায় যাওয়ার আগে বোর্ডগুলোর কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হওয়া দরকার, এমন অজুহাত দেখিয়ে সভায় অংশগ্রহণে আল-হাইআতুল উলয়ার পক্ষ থেকে অপারগতা প্রকাশ করে চিঠি দেয়া হয়।

কওমি মাদরাসার পরিচালকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, কওমি মাদরাসা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেয়া, মাদরাসাগুলোকে সরকারের নিবন্ধনের আওতায় আনা, পাঠক্রম পরিবর্তন, সব বোর্ডকে একত্র করে পৃথক শিক্ষা বোর্ড গঠনের উদ্যোগ ‘কওমি সনদের সমমান আইন-২০১৮’-এর মৌলচেতনা, ধারা ও উপধারার সাথে পুরোপুরি বিরোধপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক। উপর্যুক্ত আইনের ৭, ১(৩) ও ৮ ধারায় বলা আছে, ‘এ আইন কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে আল হাইআতুল উলয়ার অধীন বোর্ডগুলো দ্বারা নিবন্ধিত কওমি মাদরাসাগুলোতে দারুল উলুম দেওবন্দের নীতি, আদর্শ ও নিসাব (পাঠ্যক্রম) অনুসরণে দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হবে। ওই আইনের ২(চ) ও ৯(ঘ) ধারায় আছে ‘পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, মাদরাসা পরিচালনা, পরীক্ষা পদ্ধতি ও পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফলাফল ও সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং প্রভাবমুক্ত থেকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখবে।’

১৮৬৬ সালের ২১ মে (১২৮৩ হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ শহরে আল্লøামা কাসেম নানুতুভী রহ. ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে ‘দারুল উলুম’ নামক যে শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন, এটাই গোটা দুনিয়ায় কওমি মাদরাসার সূতিকাগার হিসেবে স্বীকৃত। বৈরী পরিবেশে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিশুদ্ধ আকিদা, তাহজিব-তামাদ্দুনের বিকাশে দারুল উলুম দেওবন্দের অবদান ঐতিহাসিক। সুপ্রাচীনকাল থেকে ধর্মপ্রাণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা, উদ্যোগ ও অর্থায়নে কওমি মাদরাসাগুলো স্বতন্ত্র শিক্ষাধারায় দ্বীন ইসলামের মশাল প্রজ্জ্বলিত রেখেছে। শত বছর ধরে হাজার হাজার কওমি মাদরাসা এতদঞ্চলে পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ফিকহে ইসলামী শিক্ষাদানের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক, চরিত্রবান, যোগ্য ও আদর্শবান জনগোষ্ঠী তৈরির মহৎ কাজ আঞ্জাম দিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসার সফলতা বলতে গেলে ঈর্ষণীয়। কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ধর্মপ্রচার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সমাজসেবা ও নৈতিক আবহ সৃষ্টিতে কওমি মাদরাসার অবদান সর্বজন স্বীকৃত। সন্ত্রাস, বোমা ও জঙ্গি প্রশিক্ষণের সাথে এসব মাদরাসার দূরতম সম্পর্কও নেই। এসব মাদরাসার পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত-সুনিবিড় ও নৈতিকতানির্ভর। এক পয়সাও ব্যয় না করে বলতে গেলে বিনা লগ্নিতে এতগুলো মেধাবী মানুষের সেবা লাভ করা রাষ্ট্রের সৌভাগ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য ‘মাদরাসা শিক্ষার একটি গৌরবজনক অধ্যায় রয়েছে। উপমহাদেশে যখন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তখন মক্তব-মাদরাসা নামে পরিচিত ছিল। ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলে কমিশনের পর আমরা জানতে পেরেছি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এসব শব্দগুলো। মাদরাসায় লেখাপড়ার মান উন্নত ছিল। কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক পড়ানো হতো। মাদরাসা থেকে বেরিয়েছেন এ উপমহাদেশের বহু জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি। তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে, সমাজসেবার ক্ষেত্রে, ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অথবা কবি সাহিত্যিক হিসেবে স্বনামধন্য। তাদের নাম বলে শেষ করা যাবে না। দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কওমি মাদরাসার প্রচলন হয়। এ মাদরাসার ছাত্রদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে গড়ে তোলার ঐতিহ্য রয়েছে। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম অথবা বিভিন্ন পর্যায়ে জনস্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে কওমি মাদরাসার বড় ভূমিকা ছিল। দেশের একটি বিশাল শিক্ষার্থীর অংশ এখনো কওমি মাদরাসা থেকে আলো পায়’ (নয়া দিগন্ত, ২৩ অক্টোবর-২০০৯)।

এ কথা মনে রাখতে হবে, মাদরাসা শিক্ষা একটি স্বতন্ত্র ধারা। চিকিৎসা, প্রযুক্তি, কৃষি, কারিগরি, বিজ্ঞানের মতো এটা বিশেষায়িত শিক্ষা (ঝঢ়বপরধষরুবফ ঊফঁপধঃরড়হ)। মাদরাসা পাঠ্যক্রমের সাথে আধুনিক ও সাধারণ বিষয়াবলি একাকার হয়ে গেলে মাদরাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য বিনষ্ট হবে, এতে সংশয় থাকার কথা নয়। ‘সংস্কার’ ‘আধুনিকায়ন’ ‘যুগোপযোগী’ ‘একমুখীকরণ’ ‘সরকারি নিয়ন্ত্রণ’ করতে গিয়ে কওমি মাদরাসা যেন তার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা না হারায়। ‘সংস্কার’ ও ‘আধুনিকায়ন’-এর কবলে পড়ে এককালের ‘নিউস্কিম’ মাদরাসা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এগুলো এখন স্কুল-কলেজে রূপান্তরিত। যুগচাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শে দু’-চারটি কিতাব পরিবর্তন করা যেতে পারে, মৌল কাঠামো বহাল রেখে কিছুটা সংস্কার আনা যেতে পারে। ফনুনাত ও মাকুলাতের কিতাবগুলো পরিবর্তন করা যেতে পারে। এ রকম পরিবর্তন স্বয়ং দারুল উলুম দেওবন্দেও হয়েছে। আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞান বিস্ময়কর উন্নতি করেছে। দর্শন ও বিজ্ঞানের উদ্ভাবিত নতুন তত্ত্ব ও তথ্য পাঠ্যতালিকাভুক্ত করা জরুরি ও যুক্তিযুক্ত। দরসে নেজামী এমন এক মাকবুল ও গ্রহণযোগ্য নেসাবে তালিম, যার মাধ্যমে উপমহাদেশে প্রাতঃস্মরণীয় ওলামা-মাশায়েখ তৈরি হয়েছেন। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, পৌরনীতি ও সমাজবিষয়ক বই পাঠ্যতালিকাভুক্ত থাকা চাই। অন্যথায় মাদরাসা ছাত্ররা দেশ, জগত, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে যাবে।

বাংলাদেশে প্রচলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে একেবারে সেকেলে ভাবা ঠিক হবে না। কূপমণ্ডূকতার চর্চা কোনো সময়ে মাদরাসায় হয় না বলে সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই। প্রায় সব মাদরাসায় পবিত্র কুরআন ও হাদিসের পাশাপাশি আরবি ভাষা ও সাহিত্য, আইন ও ব্যবহার শাস্ত্র, ইসলামী অর্থনীতি, ইতিহাস, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (মাকারানাতুল আদিয়ান) বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্য তালিকাভুক্ত। বহু মাদরাসায় নিয়মিতভাবে ছাত্রদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অনেক মাদরাসায় কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোকে বাংলাভাষার অনুশীলন ও চর্চা বৃদ্ধি পেয়েছে। বহু মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পর আগ্রহী ছাত্রদের জন্য এক বছর বা দুই বছরব্যাপী বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ইসলামী গবেষণা বিভাগ খোলা হয়েছে। অনেক কওমি মাদরাসায় মাধ্যমিক বা স্নাতক স্তর পর্যন্ত ইংরেজি, গণিত, সমাজ ও বাংলাভাষার চর্চা হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি মাতৃভাষাসহ আধুনিক বিষয়ের প্রতি আলেমদের গভীর মমত্ববোধের পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মাদরাসার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উপযোগী আধুনিক বিষয়াবলি সংবলিত পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছে, যা বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

স্মর্তব্য, সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুরব্বি আল্লfমা আহমদ শফী রহ.-এর নেতৃত্বে আলেমদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বহু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা-পর্যালোচনার পর ২০১৮ সালে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে এমএ আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের সমমান দেয়া হয়। এর পেছনে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও আগ্রহ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। তখন সরকারের একটি অংশ এর বিরোধিতা করেছিল। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি ছাড়া স্নাতকোত্তর ডিগ্রি হয় কিভাবে, এসব প্রশ্ন তোলা হয়। ভারত-পাকিস্তানের আদলে স্বীকৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কওমি আলেমদের আস্থা অর্জন করতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়া অতীতের কোনো সরকার কওমি সনদের স্বীকৃতি দেয়নি, এ সরকারই দিয়েছে এমন একটি কৃতিত্ব অর্জন করাও সরকারের উদ্দেশ্য ছিল। দুই বছর ধরে সরকার এ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজতে ইসলামের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে আস্থায় ফাটল ধরেছে। এখন সরকার ইউটার্ন নিতে চাচ্ছে। দেশের সব কওমি মাদরাসা হেফাজত নিয়ন্ত্রণ করে, এ ধারণাটি সত্য নয়। মাদরাসাগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ কওমি আলেমরা মেনে নেবেন বলে মনে হয় না। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে এখন উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসা জরুরি বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করে।

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এ আইন মতে, সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কওমি মাদরাসার ব্যাপারে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে না। মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলে ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। কওমি সনদের সমমান আইন-২০১৮-এর ৯(২) ধারায় উল্লিখিত আছে, ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়ার কমিটি তার কার্যক্রম সম্পর্কে সময় সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে।’ প্রণীত আইন ও বিধি মতে, সরকারের সাথে কওমি মাদরাসার সম্পর্ক এতটুকুই। 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক
drkhalid09@gmail.com

দৈনিক নয়াদিগন্তের সৌজন্যে।