বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ : বাস্তবতা ও অপপ্রচার

img

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

‘সন্ত্রাসবাদ’ পৃথিবীব্যাপী পরিচিত একটি বহুল আলোচিত পরিভাষা। কম-বেশি বহু দেশে সন্ত্রাসবাদ বিস্তৃতি লাভ করছে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলীয় সন্ত্রাসের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ব্যাপকতা শান্তিপ্রিয় মানুষকে অতিশয় সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ এবং মানবতার প্রতি চরম হুমকি। Encyclopedia Encarta তে সন্ত্রাসের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, Violence or the threat of violence, especially bombing, kidnapping, and assassination, carried out for political purposes.
রাজনৈতিক কারণে হোক বা অন্য কোনো ব্যাপারে স্বার্থসিদ্ধি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার নিমিত্তে, বোমা বিস্ফোরণ, অপহরণ, ভয়-ভীতি বা গুপ্তহত্যার মতো ঘৃণ্য কাজ করাই হলো ‘সন্ত্রাসবাদ’; যা সভ্য সমাজে সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়। সন্ত্রাসের কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই, ইসলাম ধর্মে এটি ঘৃণ্যতম কাজ। ভীতি তথা ফিতনা সৃষ্টি হত্যার চাইতেও মারাত্মক। ইসলামের দৃষ্টিতেÑ ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সব মানুষের প্রাণ, সম্পদ, মর্যাদা অত্যন্ত পবিত্র। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করল।’ জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে বা অস্ত্রের বলে ইসলামের আদর্শ কোথাও প্রচারিত হয়নি। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে মুসলিম শাসকদের অনেক সময় প্রতিপক্ষ শক্তির আগ্রাসন প্রতিরোধে ‘পবিত্র জিহাদ’-এর আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবে তরবারি বা অস্ত্রের মুখে ইসলাম প্রচারিত বা চাপিয়ে দেয়া হয়নি। যুগে যুগে সাধক, দরবেশ ও ধর্মপ্রচারকগণ দাওয়াত ও তাবলিগের মাধ্যমে ইসলামকে দুনিয়ার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। তাদের আমানতদারি, পরোপকারিতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, ইত্যাদি দেখে দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসে। ইসলাম দেড় হাজার বছর ধরে টিকে আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে তার কালজয়ী আদর্শ, অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে পারস্পরিক সহ-অবস্থান, সহিষ্ণুতা, মানবিক আচরণ ইসলামের সুমহান শিক্ষা। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, অঞ্চল, ধর্ম ও নৃৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর মাঝে ইসলামের টিকে থাকার ক্ষমতা আছে, তা প্রমাণিত বাস্তবতা। ইসলামে সন্ত্রাসের কোনো ঠাঁই নেই; সাচ্চা মুসলমান কোনো সন্ত্রাস করতে পারে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা। তাই এর অনুসারীরা অকারণে মানুষ হত্যা করতে পারে না, সম্পত্তি বিনষ্ট করতে পারে না। কেননা, নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে পবিত্র কুরআনে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার শামিল বলে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই কোনো মুসলমান নিছক রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে মানুষতো দূরের কথা, অন্য কোনো প্রাণীও হত্যা করতে পারে না।


বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সামাজিক নৈরাজ্য ও অস্থিরতার জন্ম দেয়। মহানবী সা:-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘গোটা বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহ তায়ালার নিকট যেকোনো মানুষকে হত্যা করার তুলনায় অধিক তুচ্ছ ও নগণ্য।’ এর কারণ আসমান-জমিন মূলত সৃষ্টি হয়েছে মানুষের উপকারার্থে; এখন যদি সে মানুষকে হত্যা করা হয় তা হলে এ পৃথিবীর প্রয়োজনীয়তা আর থাকে না। সব ফেরেশতা ও পৃথিবীর সকল প্রাণী বিশেষত ওলামা, সালেহিন, ফাসিক ও জালিম সবাই মিলে যদি কোনো মানুষকে হত্যা করে তবে আল্লাহ তায়ালা এর অপরাধে তাদের সবাইকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ও কুণ্ঠাবোধ করবেন না। ইসলামে জুুলুম করা হারাম। মহানবী সা: বলেন, ‘তোমরা মজলুমের বদ দোয়াকে ভয় করো। কেননা তার দোয়া ও আল্লাহ তায়ালার মধ্যে কোনো পর্দা থাকে না।’ মজলুমের দোয়া আল্লাহ তায়ালার দরবারে তাৎক্ষণিকভাবে কবুল হয়। যে ব্যক্তি কোনো জালিমের শক্তি বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে চলে; অথচ সে জানে যে, ওই ব্যক্তি জালিম, তখন সে ইসলামের গণ্ডি হতে বের হয়ে গেল। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রা: বলেন, আল্লাহর কসম, জালিমের অত্যাচারের অভিশাপে এমনকি সারস পাখিও নিজের বাসায় কাতর অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।


সাধারণত যুদ্ধ ক্ষেত্রে মানবাধিকার ক্ষুণœ হয়, মানবিক আচরণ ব্যাহত হয়, নির্বিচারে মানুষ মারা যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ গোটা পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাস নৃশংসতার উন্মত্ত তাণ্ডবের রক্তাক্ত দলিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: অনিবার্য কারণে যে ২৭টি সশস্ত্রযুদ্ধে (গাযওয়া) এবং তাঁর নির্দেশে সাহাবায়ে কেরাম যে ৩৮টি সশস্ত্রযুদ্ধে (সারিয়্যা) অংশ নেন তাতে যুধ্যমান ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের যাতে প্রাণহানি না ঘটে সে ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। মহানবী সা:-এর কঠোর নির্দেশ যুদ্ধ হলো, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু, নারী, অসুস্থ, উপাসনালয়ে অবস্থানরত পুরোহিতদের হত্যা করা যাবে না, কোনো বৃক্ষ অকারণে কর্তন করা যাবে না এবং স্থাপনা ধ্বংস করা যাবে না।’ কিছু অনিবার্য ব্যতিক্রম ছাড়া রাসূলুল্লাহ সা:-এর এ নির্দেশ হাজার বছর ধরে প্রতিপালিত হয়ে আসছে।


নিজ ধর্মের ইমাম ও অন্য ধর্মের পুরোহিতদের হত্যা, হুমকি, বোমাবাজি, আতঙ্ক সৃষ্টি, বিদেশীদের জিম্মি বানিয়ে হত্যার মতো সন্ত্রাসবাদের দূরপ্রসারী প্রভাবতো আছেই, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও ব্যাপক :
১. বিশ্ববাসীর কাছে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা যায়। বিদেশীরা মনে করেন, ইসলাম সন্ত্রাসী ধর্ম এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম সহ্য করতে পারে না। যেখানে পারো, তাদের খেদাও। এভাবে ইসলামের দাওয়াতি ও জিহাদি তৎপরতা বাধাগ্রস্ত করা সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য।
২. নাম, টুপি-দাড়ি, হিজাব, বোরকা-জিলবাব মুসলমানদের পরিচয় ও ঐতিহ্য বহন করে। বিদেশ বিভূঁইয়ে বসবাসরত মুসলমান নারী-পুরুষ এ ঐতিহ্য লালন ও ধারণে ভীতিগ্রস্ত হচ্ছে। পথে ঘাটে অপদস্থ হওয়ার বহু ঘটনা ঘটেছে।
৩. যে দেশে বিদেশী ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও দাতাসংস্থার পরামর্শক সন্ত্রাসীদের হাতে মারা যান, স্বাভাবিকভাবে সে দেশে বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বিদেশী সাহায্য বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। ৪. জঙ্গি দমনে সহায়তা দানের প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে।


সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা আগে নির্দিষ্ট কতিপয় দেশে বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, ইদানীং পশ্চিম এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকায় তা ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত সশস্ত্র লোকেরা হামলা করার জন্য মার্কেট, হোটেল, গণপরিবহনের স্টেশন, বিমানবন্দর, ধর্মীয় উপাসনালয়, প্রভৃতি বেছে নেয়। আত্মঘাতী বোমার আঘাতে নিজেও উড়ে যায়, অন্যদেরকেও উড়িয়ে দেয়। এখন পৃথিবীর কোনো জায়গাই আর নিরাপদ নয়; সবাই ঝুঁকিতে। সন্ত্রাসবাদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক নেই। ধর্মকে এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় স্বার্থ হাসিলের জন্য। ধর্ম এখানে মূল অবলম্বন নয়, অনুষঙ্গ মাত্র। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ায় প্রচারণা চালাত যে, মাদরাসার ছাত্রগণ সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িত। তাদের মতে, যেহেতু অধিকাংশ মাদরাসার ছাত্র দরিদ্র শ্রেণী থেকে উঠে আসা; সহজেই মোহনীয় টাকার হাতছানি তাদেরকে সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত করে, তাদের এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা ও কাল্পনিক। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, এখন সন্ত্রাসী তৎপরতার সাথে যুক্ত তরুণরা সমাজের অতি বিত্তশালীদের সন্তান, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে উত্তীর্ণ ও দেশ-বিদেশের নামী-দামি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়–য়া। সমাজ বিশ্লেষকদের অভিমত, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতার জন্য কোনো বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দায়ী নয়।

‘কূটনৈতিক পাড়া’ নামে খ্যাত ঢাকার গুলশানের হোলে আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গিদের হাতে ২০১৬ সালে ২০ জন দেশী-বিদেশী নাগরিক প্রাণ হারানোর ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত, বেদনাহত ও আতঙ্কগ্রস্ত। পবিত্র রমজান মাসে নিরীহ মানুষদের এহেন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেউ সহজে মেনে নিতে পারেনি। ইতালির যেসব ব্যক্তি আমাদের দেশে গার্মেন্ট ব্যবসার সাথে জড়িত এবং ঢাকার মেট্রোরেলের পরামর্শক হিসেবে জাপানের যেসব প্রকৌশলী কর্মরত, সন্ত্রাসীরা তাদের জিম্মি বানিয়ে জবাই করেছে। তারাতো কোনো পক্ষ-বিপক্ষের লোক নন, অপরাধী নন বরং উন্নয়ন সহযোগী। এ হত্যাকাণ্ড কোনো ধর্ম, আদর্শ, নৈতিকতা ও রাজনীতির মাপকাঠিতে পড়ে না। ফলে ইসলাম ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে ‘ভুলবার্তা’ গেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক দোষারোপের পুরনো খেলায় মেতে উঠলে প্রকৃৃত অপরাধী গা ঢাকা দেবে; নির্দোষ মানুষ শাস্তি পাবে।

সাম্রাজ্যবাদীদের খেলা বহুমুখী। পৃথিবীর কোনও দেশে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই মুসলমানদের ওপর তার দায়ভার চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা সচেতন জনগণ কয়েক দশক ধরে লক্ষ করছেন। অথচ এফবিআই এবং ইউরোপোলের গবেষণাধর্মী রিপোর্ট থেকে সম্প্রতি ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলেছে, তার সিংহভাগই চালিয়েছে অমুসলিমরা। লোনওয়াচডটকম নামের ওয়েবসাইটের তথ্যানুসারে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ ঘটেছে মুসলিমদের দ্বারা। বাকি ৯৯.৬ ভাগই ঘটিয়েছে অমুসলিম বা অন্য ধর্মের অনুসারীরা। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় যত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেছে তার মাত্র ৬ শতাংশ মুসলিম নামধারীদের দ্বারা হয়েছে। বাকি ৪২ শতাংশ ল্যাটিন, ২৪ শতাংশ বাম মনোভাবাপন্ন, ৭ শতাংশ ইহুদি চরমপন্থী, ৫ শতাংশ সমাজতন্ত্রী ও ১৬ শতাংশ ঘটেছে অন্য গ্রুপগুলোর দ্বারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপ আমেরিকাতে কোনও সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই ঢালাওভাবে এবং বাছবিচার না করেই মুসলমানদের ওপর তার দায় চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে এক শ্রেণীর মিডিয়া সন্ত্রাসের দায় মুসলিম সংগঠনসমূহের ওপর চাপিয়ে যেন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বগল বাজাতে শুরু করে দেয়।

সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে কখনো কখনো দু’একটি মুসলিম নামধারী গ্রুপ নিজেদের ‘ইসলামের অনুসারী’ বলে দাবি করে। কিন্তু আসলেই কি তারা মুসলিম? নাকি মুসলমানের ছদ্মবেশে অন্য কেউ? তারা এমনও হতে পারে যে, বিশেষ কোনও পক্ষের হয়ে কাজ করার জন্য তাদের তৈরি করা হয়েছে। বিশেষত ইসলাম এবং মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসের দায়ভার চাপিয়ে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা নিজেদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজটি কৌশলে চালিয়ে তাদের লক্ষ্য হাসিল করতে চাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত লোনওয়াচডটকমের রিপোর্ট দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে জান-মালের যে ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে তার জন্য ইসলাম বা এর অনুসারীরা দায়ী নয়। দায়ী অন্য কেউ। অন্য কোনো পক্ষ।

হজরত উমর রা: এর পর গত ১৪০০ বছর ধরে মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ, মতবিরোধ, বিসংবাদ, সহিংসতা, সংঘাতে বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত। রক্তপাতে বহু অমূল্য জীবনের অবসান হয়েছে। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং নানা দল-উপদল একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে জীবনীশক্তিকে এভাবে নিঃশেষ করে দিয়েছে যে, দুশমনের সাথে মোকাবিলা করার সামর্থ্য আর অবশিষ্ট নেই। মানবতার বাণী, ঐক্যের ডাক, পরমত সহিষ্ণুতা উপহাসে পরিণত হয়েছে। এর নেপথ্যে কুশীলবের ভূমিকায় ইহুদি আবদুল্লাহ ইবন সাবা, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাইর অনুসারীরা। বর্তমানে তারা আরো বেশি সক্রিয়। এখন মুসলমানরা অনেক বেশি দলাদলিতে বিভক্ত; নিজেদের দল-উপদল নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, কুললু হিজবিন বিমা লাদাইহিম ফারিহুন।’ কার লেখায় কার বর্ণনায় কার কিতাবে কী ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে তার অনুসন্ধানী গবেষণায় তারা অহোরাত্রি ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। উরারফব ধহফ জঁষব পলিসি আজো কার্যকর রয়েছে, এ কথা মুসলমানদের মনে নেই। শত্রু চিনতে ভুল হচ্ছে। ভাই হয়ে গেল দুশমন, দূরের অপরিচিত লোক হয়ে গেল বন্ধু! নতুন বিভেদ সৃষ্টি এবং পুরনো বিভেদকে চাঙ্গা করার জন্য ইসলামের চিরশত্রুরা কতিপয় উদ্যমী তরুণ ভাইকে হাতে নেয় এবং এখনো নিচ্ছে।

পৃথিবীতে একেক সময় একেক বিপদ, ফেতনা, বিপর্যয় মানবজাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। ইহুদি আবদুল্লাহ ইবন সাবা, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই, গুপ্তঘাতকদের নেতা হাসান আল সাব্বাহ, খারেজি নেতা আবদুল্লাহ ইবন আল কাওয়া, পারস্যের নাদিরশাহ, মঙ্গোলিয়ার হালাকু খান ও চেঙ্গিস খান, মধ্য এশিয়ার তৈমুর লঙ, বাংলার মীর জাফর, মহীশুরের মীর সাদিক, স্পেনের ওমর ইবন হাফসুন, জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনি, বলকানের কসাই স্লোভদান মেলোসিভিকের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এক সময় পৃথিবী ছিল সন্ত্রস্ত, বিপর্যস্ত ও বাকরুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দিল্লি, বাংলাদেশ থেকে যুগোস্লাভিয়া পর্যন্ত রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিয়েছে তারা। এখনো মাঝে মধ্যে তাদের উত্তরসূরিরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ঈমানদারদের হতাশ হলে চলবে না। সাহস সঞ্চয় করতে হবে। বুক টান করে দাঁড়াতে হবে। মুসলমানদের সব কাজ হবে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য। ঘন কালো মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে- এ কথা মনে রাখতে হবে। বৈরী পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য তৈরি থাকতে হবে।

১. কেবল সরকার বা রাষ্ট্রের পক্ষে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এ ব্যাপারে সংগঠিত করতে হবে। সামাজিক শক্তিগুলোকে এক করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা যেকোনো উদ্যোগের সবচে বড় শক্তি।
২. সমাজে ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হত্যাকাণ্ড, বোমাবাজি বা আতঙ্ক ছড়াতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। সন্তান-সন্ততিরা উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত হচ্ছে কি না, এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং জড়িত হয়ে পড়লে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে।
৩. প্রতিনিধিত্বশীল বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সঙ্কট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সংলাপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ভারতসহ বহু দেশে এ সংস্কৃতি চালু আছে।
৪. বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. ওলামা-মাশায়েখ সামাজিক শক্তির প্রতিনিধি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সর্বশ্রেণির ওলামা ও মাশায়েখকে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক প্ল্যাটফর্মে জমায়েত হয়ে মিথ্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যের বিকল্প নেই, এ সত্য যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করা যায়, ততই মঙ্গল।
৬. সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভার আয়োজন এবং ক্ষুদ্র-বৃহৎ পুস্তিকা ও জার্নাল প্রকাশের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরলে এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ব্যবস্থা করা গেলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।

৭. সন্ত্রাস ও জিহাদ যে এক নয়, এ কথা আলিম, ইমাম ও খতিবগণ ওয়াজ ও মসজিদের বয়ানে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। জিহাদের পবিত্র চেতনাকে সন্ত্রাসের উন্মাদনার সাথে গুলিয়ে ফেলা মারাত্মক ভ্রান্তি। ইসলামে উগ্রপন্থা নেই এবং মধ্যমপন্থা অনুমোদিত। জিহাদ হবে তাগুত ও কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে। এক মুসলমানের বিরুদ্ধে আরেক মুসলমানের জিহাদ নেই। জিহাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বিধান। জিহাদের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি আছে। জিহাদের নামে আল্লাহ তায়ালা নারাজ, অসন্তুষ্ট ও ক্রোধান্বিত হন, এমন কর্মকাণ্ড শরিয়ত অনুমোদন করে না।

৮. ইসলামের শান্তি, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা ও মানবাধিকারের মৌলিক বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে ব্যাপকভাবে। মুসলিম দেশে অমুসলিমকে হত্যা, আতঙ্কগ্রস্ত করা, সম্পদ বিনষ্ট করা, উপাসনালয়ের ক্ষতি করা মহাপাপ। তাদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। এসব অধিকার যারা কেড়ে নিতে চায়, তারা সন্ত্রাসী। এ কথাগুলো ব্যাখ্যা সহকারে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক
drkhalid09@gmail.com

দৈনিক নয়াদিগন্ত থেকে