শিবলী নোমানী ও তাঁর যুগবয়ান

img

তার জন্ম অগ্নিময় সেই ১৮৫৭ সালে। সিপাহি বিপ্লবের কম্পমান আজমগড়ের বিন্দাওল এলাকায়, রাজপুত জমিদার পরিবারে। যেদিন তার জন্ম হয়, বিপ্লবীরা সেদিন আজমগড়ের জেল ভেঙে বন্দীদের মুক্ত করে দেয়। উপমহাদেশের স্বাধীনতার তরণী যখন রক্তের নদী পেরিয়ে বন্দরের প্রায় কাছাকাছি, তখন ইন্তেকাল হয় তার। ১৯১৪ সালে আজমগড়ের নিজ বাসভবনে যখন তিনি দুনিয়া ত্যাগ করেন, উপমহাদেশ তখন বদলে গেছে। এই বদলে যাওয়ার মধ্যে তার ভূমিকা কি কম ছিল? মৃত্যুর খানিক আগে নিজের লাইব্রেরি, বাসভবন এবং নিকটস্থ বাগানবাড়িটি এই বদলে দেয়ার কাজে ওয়াক্ফ করে যান। যেন এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল মুসান্নিফিন। একটি ব্যতিক্রমী হাইস্কুল বাগানবাড়ির পাশেই তৈরি করেছিলেন তিনি। এখন সেটা জাঁকালো কলেজ। শিবলি কলেজ নামে ভারতবিখ্যাত। আমরা আল্লামা শিবলি নোমানীকে নিয়ে কথা বলছি। বহুমাত্রিক মনীষী ছিলেন তিনি। অন্তর্ভেদী গবেষক, কালজয়ী কবি, বিশ্ববিশ্রুত অধ্যাপক, মনস্বী বাগ্মী, অগ্রগণ্য, মহৎ সাহিত্যিক ছিলেন তিনি। ওসমানী সালতানাত তাকে দেয় তমঘায়ে মজিদি খেতাব, ব্রিটিশ সরকার দেয় শামসুল উলামা উপাধি। সবকিছুর উপর তিনি ছিলেন জনক। তার হাতে গড়ে ওঠেন এমন আলেম শ্রেণী, যাদের তুলনা মেলা ভার।

নিজের শিষ্য ও উপশিষ্যদের নিয়ে বিশেষভাবে একটি কাফেলা তিনি তৈরি করে যান মৃত্যুর আগেই। তার মিশনকে তারা গোটা উপমহাদেশে গতিমান রাখেন এবং বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যান। তাদের জ্ঞানসাধনার প্রভাবে জাতির অগ্রসর সন্তানরা উদ্বুদ্ধ হয় গবেষণায়, গ্রন্থ রচনায়। তাদের শিষ্যরাও অব্যাহত রাখেন এই অভিযান। তাজা ও চলমান রাখেন অভিযাত্রাকে। শিবলী নোমানীকে তাই ব্যক্তি হিসেবে না দেখে জ্ঞান ও সাহিত্যের ইনস্টিটিউট হিসেবে দেখা হয়। জ্ঞানের সাধনায় এবং সাহিত্যের চর্চায় তিনি বিশেষ এক ভাবধারার জনক। যে ধারা তার মধ্যেই স্তিমিত না থেকে স্র্রোতময় থেকেছে ইতিহাসের ভেতর। জীবনবাস্তবতার ভেতর। ভাষা ও চিন্তার ভেতর।

তার শিষ্যদের কয়েকজনের দিকে তাকান। তারা ছিলেন শিবলীর বাহক। প্রত্যেকেই একেক বিদ্যালয়। মাওলানা জাফর আলী খান। কী সাংবাদিকতা, কী কবিতা, কী সৃজনশীল সাহিত্যÑ সবখানেই তার কৃতিত্ব অসাধারণ। মাওলানা মুহাম্মদ আলী। খেলাফত আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং তুখোড় সাংবাদিক। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। ভারতীয় জাতীয়তার জনক, রাজনীতিক, লেখক, ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। হামিদুদ্দীন ফারাহি। কুরআন মজিদের বিখ্যাত তাফসিরকার, দার্শনিক। সৈয়দ সুলাইমান নাদভী। জ্ঞানজগতের মধ্যমণি ছিলেন আপনকালে। জ্ঞান ও চিন্তায় তিনি দুনিয়াময় ছড়িয়েছেন আলো। গবেষণা ও ধর্মীয় প্রজ্ঞায় কিনারাহীন সমুদ্র বলা হতো তাকে। খাজা আবদুল ওয়াজেদ নাদভী। শত শত পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞের গুরু। অগ্রগণ্য বিদ্বান ও বরেণ্য বহু লেখকের জনক তিনি। মাওলানা আবদুুস সালাম নাদভী। বিখ্যাত গ্রন্থকার। ‘উসওয়ায়ে সাহাবা’র লেখক। তার গ্রন্থাবলি বিশ্বময় খ্যাতিমান। জ্ঞান ও সাহিত্যবিষয়ক তার গ্রন্থ বিপুল। ইকবাল সুহাইল শিবলী। গুরুত্বপূর্ণ কবি, নান্দনিক বাগ্মী, সমালোচক। রাজনীতিক এবং জাতীয় পরিষদের সদস্য। এ মনীষীদের প্রত্যেকেই ছিলেন উপমহাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনতরো শক্তিমান জ্ঞানী ও গবেষকের বড় এক কাফেলা তৈরি হয় শিবলীর হাত দিয়ে। তারা প্রবহমান রেখেছেন জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির স্র্রোতধারা। এরপর তাদের শিষ্যরা, প্রশিষ্যরা।

শিবলী প্রথমে ছিলেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। টমাস আর্নল্ড ছিলেন তার একান্ত বন্ধু ও সহকর্মী। টমাস তাকে শেখান ফরাসি ভাষা, তিনি টমাসকে শেখান আরবি। উভয়ের জ্ঞানগত আদান-প্রদান ছিল ব্যাপক। তার সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন মুহসিন উল মুলক, খাজা আলতাফ হোসেন হালি, আবদুর রাজ্জাক কানপুরী, সৈয়দ আলী, সৈয়দ হুসাইনের মতো সাধকরা। তিনি ছিলেন সবার মধ্যমণি। আলীগড় থেকে বিদায় নিয়ে ১৯০৫ সালে তিনি গ্রহণ করেন নদওয়াতুল উলামা লাখনৌ-এর অধ্যক্ষ পদ। নদওয়াকে অনেক সমৃদ্ধ করে তিনি অবশেষে বিদায় নেন এখান থেকে। তার চিন্তার গতির সাথে প্রথাগত আলেমদের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে বিলম্ব হয়নি।

উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের চার স্তম্ভের একজন ছিলেন শিবলী। রাজমহলের চার স্তম্ভ বলে বিখ্যাত সেই মনীষীরা হলেন মৌলভি হুসাইন আজাদ দেহলভি, খাজা আলতাফ হুসাইন হালি, ডিপুটি নাজির আহমদ ও মাওলানা শিবলি নোমানি।
উর্দু সাহিত্যে, বিশেষত জ্ঞানধর্মী প্রবন্ধে তার যে শৈলী, সেটা যেমন বরেণ্য তেমনি জনপ্রিয়। তার রচনাশৈলী সম্পর্কে কোনো এক বিশ্লেষক বলেছিলেন, শিবলীর রচনাশৈলী খুবই মনোহর। এর প্রভাব এত বেশি যে, শিবলীর বিরুদ্ধবাদীও যদি শিবলীর বিরুদ্ধে কিছু লেখে, সে শিবলীর রচনাভঙ্গির অনুসরণ না করে পারে না। শিবলীর রচনা সরল আর প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা। মাধুর্য ও গতিময়তার এমন সমন্বয় সচরাচর ঘটে না। সৃজনশীল বা মননশীল ধারায় তিনি যা লেখেছেন, হোক তা কাব্য বা গল্প অথবা রসরচনাÑ সবখানেই তিনি সেরাটা দিয়েছেন। উচ্চমান এবং উচ্চ বৈশিষ্ট্য জারি রেখেছেন। ফলে তার রচনায় দ্বিতীয় শ্রেণীর কিছু নেই। তৃতীয় শ্রেণীর তো প্রশ্নই আসে না। তার গ্রন্থাবলি কেবল উর্দু ভাষার গৌরব, তা নয়। যে সব ভাষায় তার বইগুলো অনূদিত হয়েছে, সেসব ভাষারও অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে তার রচনাবলি। বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন শিবলী। এর মধ্যে ‘আল ফারুক’ ‘শেরুল আজম’, সিরাতুন্নবী, সিরাতুন নুমান। এগুলোসহ তার বহু বই ফার্সি, ইংরেজি, আরবি, তুর্কিসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়। তবে তার সাবলীল রচনাধারা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে তার অগ্রগামিতার বহিঃপ্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় তার আল কালাম ও ইলমুল কালাম গ্রন্থে। ইলমে কালাম হচ্ছে ইসলামভিত্তিক দূরকল্পী দার্শনিকতা। গ্রিক দর্শনের অভিঘাতের জবাবে যা তৈরি করেন প্রাচীন মুসলিম বিশেষজ্ঞরা। নোমানী এর নবায়ন করতে চান ইউরোপীয় আধুনিকতার প্রতিক্রিয়ায়। যুক্তিবাদী সেই নবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ ছিল তার এ গ্রন্থ। চার খণ্ডে তিনি সাজাতে চেয়েছিলেন বইটি। কিন্তু দুই খণ্ডেই লক্ষ্যপূরণ হয়ে যায়। এতে ইসলামী যুক্তিবাদিতার ইতিহাস ও ইসলামী দার্শনিকদের নিয়েও ছিল আলোচনা। এ রচনার ভিত্তিতে অস্তিত্ব পায় নতুন এক জ্ঞানমার্গ- আধুনিক কালামদর্শন।

নোমানী দেখান, ইসলামী জীবনবাদ হচ্ছে বিশ্বাস, ইবাদত ও চরিত্রমহিমা। একটি সময় এমন ছিল, যখন এসব ঐশ্বর্য ছিল হৃদয়স্পর্শী। সবাই সমানভাবে এগুলো গ্রহণ করতে পারছিলেন। যারা লাভ করেছিলেন প্রিয় নবী সা:-এর সান্নিধ্য এবং শুনেছিলেন তার বাণী, তাদের ভাবনা ছিল এ বাণীকে কর্মে রূপায়ণই আসল ঈমান। তাদের মনে না ছিল সন্দেহের লেশ, না সংশয়ের কুয়াশা। যতদিন প্রিয় নবী সা: আর সাহাবিরা দুনিয়ায় ছিলেন, ততদিন কোনো দর্শন ও চিন্তাধারা মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসে আঁচড় লাগাতে পারেনি। মহান চার খলিফার পরে খলিফাদের ভাবনায় দিগি¦জয়ের উদ্যম জাগে। ফলে বড় রকমের পরিবর্তন আসে মুসলিমদের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির ক্রমধারায়।

এ প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে আব্বাসীয় সাম্র্রাজ্যের কথা। শাসকরা তখন ইসলামের চিরায়ত সরলতা ও সাম্যের দাবি উপেক্ষা করে একনায়কতন্ত্র, ভোগ-বিলাস ও যথেচ্ছাচারের মহড়া দেখাতে থাকেন। তারা যেমন আরবিতে রূপান্তরিত করেন ফার্সি ও গ্রিক দর্শন, তেমনি পশ্চিমা দুনিয়ার সাথে গড়ে তুলেন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন। ফলে তৈরি হয় বিশেষ টানাপড়েন। এর ধাক্কায় মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গায় তৈরি হয় প্রবল কম্পন। আকিদার ময়দানে জেগে উঠে শত শত প্রশ্ন। সংশয় তৈরি হয় আত্মা, নবুয়ত ও আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে। পশ্চিমাদের ‘আস্তি’ ও ‘নাস্তি’ চিন্তাধারা ছড়াতে থাকে ক্রমাগত। পথ হারাতে থাকেন বড় বড় মুসলিম ধর্মপ্রচারক, তাফসিরকার। তাদের মুখে ফুটতে থাকে সমালোচনার খৈ। ভাঙন দেখা দেয় মুসলিমদের বিশ্বাসের পাটাতনে। তখনই মুসলিম চিন্তানায়করা উপলব্ধি করেন ইলমে কালামের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। আত্মনিয়োগ করেন এর উন্নয়নে। মুসলিমদের মুখোমুখি হয়ে সমরমাঠে লড়ার সামর্থ্য পশ্চিমাদের ছিল না। কিন্তু এটা বোঝার সামর্থ্য তাদের ছিল যে, সশস্ত্র মোকাবেলায় তাদের পরিণতি এমনই হবে, যেমনটি হয়েছিল প্রিয় নবীর আমলে। অতএব তারা সহায়তা নেয় বুদ্ধিবৃত্তির। ইসলাম ধর্মের উপর হামলা করে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির তরবারি দিয়ে।

মুসলিম চিন্তার অগ্রপথিকদের সামনে এলো নতুন লড়াই। বুদ্ধিবৃত্তির ঢাল দিয়ে তারা করলেন এর প্রতিরোধ। যুক্তিবাদ ও ওহিভিত্তিক দর্শন দিয়ে তার কেবল নাস্তিকতাকেই রুখলেন তা নয়, বরং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাদের বিক্রম প্রদর্শন করলেন। মুসলিম চিন্তকদের এ ধারা অগ্রগতির পথে নিয়ে যায় আবু মুসলিম আবু বকর, আবুল কাসেম বলখিসহ বহু আলেমকে। তারা আল কুরআনের তাফসির করেন গ্রিক ভাবধারার জবাবে। ইলমে কালাম নিয়ে রচনা করেন বহু স্বতন্ত্র গ্রন্থ। দুনিয়াকে তারাই প্রথম চিনিয়ে দেন বিশেষ এক শাস্ত্রের সাথেÑ যার নাম যুক্তিবাদী ইলমে কালাম। যুক্তিবাদের প্রবল প্রতাপের মোকাবেলাই ছিল ইমাম রাজি, গাজ্জালি, ইবনে রুশদ কিংবা কাজী ইয়াজদের লক্ষ্য। যদিও বিচিত্র ছিল তাদের মতামত ও ভাবধারা। এর প্রভাব পড়ে দ্রুত। মুসলমানদের মধ্যে প্রতিরোধের মানসিকতা ছড়িয়ে পড়ে প্রবল বাতাসের মতো। এ পদক্ষেপ ছিল দূরদর্শী ও অনিবার্য। এর ফলে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা বা মাকুলাতের প্রয়োজন তীব্রভাবে জেগে ওঠে মিসরে, সিরিয়ায়, তুরস্কে, মুসলিম জাহানের দিগন্তে দিগন্তে। এসব অঞ্চলে মুসলিম চিন্তানায়করা এ শাস্ত্রকে দেন উন্নতি, দৃঢ়তা ও বিস্তৃতি। ফলে সে যখন ধাক্কা দিলো, গ্রিক দর্শনের প্রভাব মুসলিম মনে অকার্যকর হতে থাকল।

মুসলিম ভারতে থেকে গিয়েছিল গ্রিক ও ইরানি দর্শনের ছড়ানো-ছিটানো অবশেষ। যা মুসলিম চিন্তাজগৎকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করে চলছিল। কিন্তু এর চেয়েও বিপজ্জনক ছিল আধুনিক চিন্তা, সংস্কৃতি ও দর্শনের জোয়ার। যার ভেতরে নিহিত ছিল এমন সব উপাদান, যা মুসলিম মনকে মুসলিম থাকতে দেয় না। এ বিপদের প্রতি শুরুতেই নজর দেন স্যার সৈয়দ আহমদ। তার কাছে এটি অসহনীয় ছিল যে, কালের স্রোতে ভেসে গিয়ে পথ হারাবে মুসলিম জনগোষ্ঠী। ‘তাফসিরুল কুরআন’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তিনি লেখেন এই মানসিকতার নির্দেশে। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন পশ্চিমা শিক্ষার আলোকে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তির বিনির্মাণ। পশ্চিমা আধুনিকতা ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার মানদণ্ড সামনে রেখে তিনি অগ্রসর হতে চান।

শিবলী নোমানী এখানে আলাদা। তিনি ইসলামী ও আধুনিক উভয় শিক্ষা যুগপৎ গ্রহণের প্রস্তাব করেন। ধর্মীয় ও পার্থিব জ্ঞানের পাশাপাশি দুনিয়ার অগ্রসর চিন্তাস্র্রোতে মুসলিমদের প্রভাবক হতে বলেন। আধুনিকতাকে তিনি ইসলামের হাত দিয়ে যাচাই করতে চান। বিজ্ঞানের সাথে ইসলামের কোনো দূরত্ব তিনি পাননি। এতে মুসলিমদের বিপুলভাবে এগিয়ে আসা চাই। তিনি দেখেন, আধুনিক দর্শন ইসলামকে উত্ত্যক্ত করছে। এর বিপরীতে ইসলামের দার্শনিক বয়ান কালের ভাষায় হাজির করা চাই। তিনি দেখছিলেন নাস্তিক্যের প্রবল ঢেউ এগিয়ে আসছে। এর মুখে বাঁধের ভূমিকা রাখেন একনিষ্ঠভাবে। আলেমদের তিনি এ বিষয়ে সাবধান করেন, দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

নদওয়াতুল উলামার এক সভায় আলেমদের লক্ষ্য করে তিনি বলেন, ভারতের সীমান্তে ধেয়ে আসছে অবিশ্বাস ও নাস্তিক্য। সে আসছে দর্শনের নামে। একে জানা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর মোকাবেলা আলেমদের দায়িত্ব। এ আহ্বানে সাড়া আসেনি। খুব কম লোকই একে ভালোভাবে নিতে পেরেছিল। উল্টো বরং তাকে বলা হলো জড়বাদী, প্রকৃতিবাদী। কেউ কেউ তো ধর্মহীন বলতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু পা থেকে মাথা অবধি তিনি ছিলেন মুসলিমদরদি। চারদিক থেকে তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ ছড়ানো হতো, তিনি তার জবাব দিতেন মুখে হাসি ছড়িয়ে। জনতাকে আবেগের স্র্রোতে সঁপে না দিয়ে তিনি চাইতেন আপন বাণীকে তাদের হৃদয়ঙ্গম করাতে।

হানাফি চিন্তাশিবিরের বসিন্দা ছিলেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে কেউ যাতে দ্বিধায় না থাকে, সে জন্য ‘সিরাতুন নুমান’-এর মতো গ্রন্থ লিখেই থামেননি, নিজের নামে স্থায়ীভাবে খোদাই করে নিয়েছেন ‘নোমানী’।
মুসলিম মনকে বেপথু হতে দেননি শিবলী। যথার্থ বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান দিয়ে মুসলিম বিশ্বাসকে তিনি প্রমাণ করেন।
তার বয়ানে ইসলামের মূল আকিদাসমূহ জ্ঞান ও যুক্তিবাদের জবানে উপস্থাপিত হয়েছে। যারা এতদিন বাতাসের উপর রেখেছিলেন ধর্মবিশ্বাসের সৌধ এবং কেবলই মনের টানে অটল ছিলেন ধর্মবিশ্বাসে, তাদের জন্য শিবলীর বয়ান ছিল উজ্জ্বল উদ্ধার। ফলে দৃঢ়তা লাভ করে তাদের ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না শিবলীর বয়ানের ফায়দা। পশ্চিমা দর্শনের কণ্ঠে ইসলামী আকিদার বিরুদ্ধে যে বজ্রনিনাদ উচ্চারিত হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে মুসলিম চিন্তকরা শিবলী থেকে সহায়তা নিয়ে থাকেন।

শিবলী যখন আধুনিক চিন্তাস্র্রোতের মুখোমুখি হয়েছেন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মুসলিমরা তখন ছিল মেরুদণ্ডহারা। তাদের ধর্মবিশ্বাসকে বিধ্বস্ত করে দিতে সক্রিয় ছিল পশ্চিমা দর্শন ও সমাজব্যবস্থা। বিশেষত প্রাচ্যবিদদের জবাবি প্রয়াসে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। পালমার, উইলিয়াম ম্যুর, ¯স্প্রেঙ্গার, মারগোলিয়াথ প্রমুখের ইসলামব্যাখ্যা তার চ্যালেঞ্জের কবলে পড়ে। এ চ্যালেঞ্জ সংবলিত তার সিরাতুন্নবী, জিজিয়া, ইসলামী কুতুবখানা, হুকুকুল জিম্মিয়িন, কুতুবখানায়ে ইস্কান্দারিয়া ইত্যাদি রচনা ছিল মুসলিমদের জ্ঞানগত বিজয়ের মতো।

শিবলী নোমানী জ্ঞানের বহু দিগন্তে সফর করে ইতিহাসে ডেরা গাড়েন নিবিড়ভাবে। ইতিহাসের ভেতর থেকে তিনি খুঁজে আনেন জাতীয় জাগরণের জ্বালানি। তার রচনাবলি সেই জ্বালানি বুকে নিয়ে শতাব্দীর পরিক্রমায় আমাদের অবচেতন অনগ্রসরতার বিপরীতে রোদন করছে।