অশ্রুপাতের গল্প

img

Mahmudul Hasan

কূফার বড় মসজিদে সেদিন বাঁধভাঙ্গা মুসলিম জনতার ভীড়। জনতার বিশাল সমাগমে বিশাল মসজিদটি মনে হচ্ছিল খুব ছোট্ট। এত মানুষের সমাগম। কিন্তু কোনো আওয়াজ নেই, উচ্চারণ নেই, শোরগোল নেই। সকলের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ মালেক বিন দীনারের প্রতি। তিনি গভীর নিস্তব্ধ হয়ে আসনে বসেছিলেন, মাথা নিচু করে। কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা উঁচু করলেন। তাকালেন জনতার দিকে।
তাঁর চেহারা দেখে মানুষের চোখ বিস্ফারিত! আশ্চর্যান্বিত!! ভিন্ন এক চিত্র আজ তাদের সামনে। দেখল অন্য রকম দৃশ্য। ইরাকের ফকীহ, ইমাম ও ওয়ায়েজের এমন দৃশ্য তারা কখনো দেখেনি। তাঁর দু’চোখ ছিল অশ্রুতে ভরা! নীরব অশ্রু ফোঁটা গৌরবদীপ্ত শ্মশ্রু ভিজিয়ে দিচ্ছিল!! কাঁদছেন তিনি!!!
তাঁর কথা শুনতে আসা উপস্থিত জনতা বিস্মিত হলো। কারণ, তিনি গতকাল ঘোষণা করেছিলেন, আজ তিনি তাদের অজানা কিন্তু জানা দরকার এমন এক বিষয় নিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু এখন দেখছে, কাঁদছেন তিনি! কেন? কী হলো তাঁর?
মালেক বিন দীনার বলা শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠ শ্রোতা ও ভক্তদের হৃদয়তন্ত্রী স্পর্শ করে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যেন অনেক দূরের কোন অদৃশ্য লোক থেকে শব্দগুলো ভেসে আসছে। তিনি আল্লাহর হামদ ও রাসূলের ওপর দরূদ পাঠ করে শ্রোতাদের জন্য মঙ্গলের দোয়া করলেন। তারপর বললেন :
-গতকাল বলেছিলাম, আজ আমি তোমাদেরকে, আল্লাহর রহমতের ভিখারী, মালেক সম্পর্কে অজানা কিছু কথা বলব। কারণ, আমার নিজের সম্পর্কে আমি যা জানি তোমরা তো তা জানো না; তোমরা আমার ব্যাপারে শুধু সুধারণাই পোষণ কর।
যৌবনে আমি ছিলাম অত্যাচারী এক পুলিশ। বাজারের শৃঙ্খলা বিধান করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। তখন কেউ আমার অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়নি। আমার পৈশাচিক তন্ডব থেকে কোনো ব্যক্তিই রক্ষা পায়নি। কত মানুষকে যে বিভ্রান্ত করেছি, কষ্ট দিয়েছি। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। সে কথা মনে পড়লেই আমার অন্তর যেন প্রচন্ড ব্যথায় ছিঁড়ে যেতে চায়। আল্লাহর অপার দয়া ও করুণায় যদি আমার বিশ^াস না থাকত, আমি আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ‘মালেক’ হতাম।
বন্ধুগণ! হেন কোনো পাপাচার নেই যা আমি করিনি। মদ পান করেছি, মানুষকে মারধর করেছি, তাদের কাজ-কর্মে, এমন কি বেচাকেনাতেও অনধিকার চর্চা করেছি। যারা আমাকে মেনে চলত, অত্যাচারী হলেও আমি তাদের সহযোগিতা করতাম ।
একদিন আমি বাজার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। দেখলাম, দু’জন লোক বচসায় লিপ্ত। একজন কিছু একটা বিক্রি করছে, অন্যজন তা কিনতে চাচ্ছে। বিক্রেতা যে দর হাঁকছে ক্রেতা তা থেকে কম দিতে চাচ্ছে। আগপিছ কিছু না ভেবেই আমি ক্রেতাকে প্রচন্ড ধমক লাগালাম। এমন কি লাঠি দিয়ে মারতেও উদ্যত হলাম। কিন্তু লোকটির ভেতর এমন কিছু ছিল, যা আমাকে স্থির করে দিল। হাত গুটিয়ে নিলাম আমি।
আমি লোকটির দিকে গভীরভাবে তাকালাম। লোকটি বয়স্ক, চুল-দাড়ি ধবধবে সাদা। দেখলেই মনে হয়, একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ। তিনি আমাকে হাতের ইশারায় বুঝালেন, থামো, প্রথমে আমার কথা শোনো। তারপর নাহয় বিচার কর।
বৃদ্ধ লোকটি তার অভিযোগ পেশ করল। জীবনে এই প্রথম আমি কারও অভিযোগ মন দিয়ে শুনেছি। লোকটি একটি হাদীস বলে তার কথা শেষ করল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ বাজারে গেলে এমন কিছু যেন নিয়ে আসে, যা তাঁর মেয়েদের আনন্দিত ও প্রফুল্ল করে।
আমি সফর থেকে ফিরছি। তাই বাড়িতে যাবার আগে এমন কিছু কিনে নিয়ে যেতে চাই, যা পেয়ে আমার মেয়েরা খুশি হবে, আনন্দিত হবে। বিনিময়ে আমি যেন আল্লাহর সুদৃষ্টি পাই।
লোকটির কথায় আমি বিমুগ্ধ হলাম। জিনিসটি তাকে কিনে দিয়ে মনে মনে তার মেয়েদের দোয়া পেতে আগ্রহী হলাম। এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল। কিন্তু লোকটির কথা আমার কানে যেন নিরন্তর বেজে চলছে।
একদিন বাজারে সুন্দরী এক দাসী বিক্রি হতে দেখলাম। আমার অন্তরে তখন এক ভালো চিন্তার উদয় হলো। দাসীটিকে আমি ভালোবেসে ফেললাম। তাকে কিনে নিয়ে বিয়ে করলাম। কিছুদিন সুখেই কাটালাম। সে আমাকে বিশৃঙ্খল জীবনের কথা সম্পূর্ণই ভুলিয়ে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে সুশৃঙ্খল হতে লাগলাম। বিশেষত আল্লাহ যখন আমাকে একটি কন্যা সন্তান দান করলেন।
কিন্তু মেয়েটির জন্মের পর কিছুদিন যেতে না যেতেই তাকে এতিম করে আমার স্ত্রী ইহজগত থেকে বিদায় নিল। এরপর দু’বছর আমি কোনো বিয়ে করিনি। কোনো কাজেই মনোযোগ ছিল না আমার। শুধু কন্যার লালন-পালন করাই ছিল যেন আমার একমাত্র কাজ, একমাত্র ব্রত। আমার জীবনের একমাত্র সংগ্রাম। সে-ই ছিল যেন আমার একমাত্র পৃথিবী, আমার অস্থিত্বের পৃথিবী, আমার জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। আমার মন ও মননের পুরো জগত জুড়ে ছিল সে-ই আমার কলিজার টুকরো মেয়ে।
একদিন কাজ থেকে ফিরে দেখলাম, মেয়ে আমার ব্যথায় অস্থির, ছটফট করছে। কাঁদছে। আমি দ্রæত ডাক্তারের কাছে গেলাম, অষুধ আনতে। কিন্তু অষুধ নিয়ে আসার আগেই সে চলে গেল তার ‘মায়ের কাছে’। মেয়েকে হারিয়ে ফেললাম আমি। তার নিথর দেহ পড়ে আছে বিছানায়। তাকে দেখে আমার দু’চোখে আঁধার নেমে এলো। মনে হলো, আমার ওপর যেন আসমান ভেঙে পড়েছে। জড়িয়ে ধরলাম তাকে। দু’চোখ ভেঙে অশ্রæ নামছে। মেয়েকে আমি জড়িয়ে ধরে থাকলাম। আমার মনে হতে লাগল, মেয়ে আমার আবার জেগে উঠবে, তার শরীরে হয়ত আবার নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটবে। আমার অশ্রুতে তার শরীর ভিজে যাচ্ছে। দুঃখে-ক্ষোভে-বেদনায় আমি গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলাম।
শেষ পর্যন্ত আমি আমার বিষয় আল্লাহর কাছে সঁপে দিলাম এবং আমার মা-মণিটাকে দাফন করে এলাম। এরপর আমি এ-দুঃখী জীবন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম।


সুর-সুরা ও সঙ্গীত-নেশাই হয়ে গেল আমার জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। মদই হয়ে গেল আমার জীবন। হুঁশ ফিরলেই একরাশ নিঃসঙ্গতা, বিষন্নতা ও দুঃখ অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরে আমাকে, খুবলে খায়, ছিন্নভিন্ন হতে থাকি আমি। মানুষের প্রতি আমি আবার আগের মতো নিষ্ঠুর হয়ে উঠলাম। আমার মনে হতো, তারাই যেন আমার স্ত্রী, সন্তান ও সমস্ত সুখ কেড়ে নিয়েছে। আর আমি তারই প্রতিশোধ নিচ্ছি।
একদিন আমি বাজারে ঘুরছি। দেখলাম এক মহিলা অল্প কিছু খাবার নিয়ে যাচ্ছে। আমি জোর করে তা ছিনিয়ে নিলাম। মহিলার বুকফাটা কান্না, মিনতি, আর্তনাদ আর ছোট ছোট বাচ্চাদের করুণ কাকুতি কোনো দিকেই আমি ভ্রুক্ষেপ করিনি। সে রাতে তাড়াতাড়িই আমি বাড়ি ফিরে গেলাম। রাতটা ছিল শাবানের মধ্যরাত (শবে বরাত)। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। স্বপ্নে দেখলাম, কেয়ামত শুরু হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হয়েছে। সকল মানুষ একত্রিত হয়েছে। আমিও আছি তাদের মাঝে। হঠাৎ এক বিকট শব্দ শুনলাম। ফিরে দেখলাম, বড় এক নীল অজগর হাঁ করে আছে। তার চোখ থেকে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে। সাপটি নির্মমভাবে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি দৌড়ে পালাতে লাগলাম। পথে এক অশীতিপর দুর্বল বুড়োকে দেখতে পেলাম। তাকে চিৎকার করে ডেকে বললাম, বাঁচাও, বাঁচাও!! আমাকে এ অজগর থেকে রক্ষা কর!!!

লোকটি নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে বলল, দ্রুত পালাও! তাহলে হয়ত বেঁচে যাবে। আমি দ্রুত পালাতে লাগলাম। সামনে দৌড়াচ্ছি। শেষ পর্যন্ত এক খোলা প্রান্তের উপত্যকায় চলে এলাম। নিচেই জাহান্নামের আগুনের ফুলকি। ভয়ে আমি সেখানে পড়ে যেতে লাগলাম। পিছনে অজগর আমাকে তাড়া করছে। কেউ চিৎকার করে বলল, এখান থেকে ফিরে যাও। তুমি এখানের লোক নও। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ফিরে এলাম। এদিকে অজগরটি আমার পিছনেই তেড়ে আসছে।

দুর্বল বৃদ্ধটির সাথে আবার দেখা হলো। পুনরায় তার সাহায্য চাইলাম। সে আবারও তার অক্ষমতা প্রকাশ করল। একটি পাহাড় দেখিয়ে বলল, তুমি এ পাহাড়ের দিকে যাও। সেখানে মুসলমানদের বেশ কিছু আমানত আছে। তোমারও আমানত যদি থাকে, তবে তোমার উপকারে আসবে।
তাকিয়ে দেখলাম, রূপোর এক ঝকমকে পাহাড়। পাহাড়ের স্থানে স্থানে স্থাপিত সোনালী দরজা থেকে ঔজ্জ্বল্য ঠিকরে বের হচ্ছে। দরজাগুলোয় সিল্কের পর্দা ঝুলানো। যার সৌন্দর্য নজর কেড়ে নেয়। দৌড়ে গেলাম প্রবল বেগে। অজগর আমার পেছনেই আছে। আমি নিকটে পৌঁছতেই এক প্রহরী চিৎকার করে বলল, পর্দা সরিয়ে দাও! দরজা খুলে দাও!!

দেখলাম, চাঁদের মত সুন্দর কিছু শিশু। এ দিকে অজগর আমার প্রায় কাছে চলে এসেছে। আমি হতাশ! কিংকর্তব্যবিমূঢ়!! এক শিশু চিৎকার করে উঠল। আরে, তোমরা তাকিয়ে আছো কেন? কী দেখছ? তাড়াতাড়ি এসো, শত্রæ তো লোকটার সন্নিকটে এসে গেছে। তখন শিশুরা দলে দলে এগিয়ে এল।
হঠাৎ দেখলাম, আমার কন্যা যে কিছুদিন পূর্বে মারা গিয়েছিল, সে আমার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল। বলল, আল্লাহর কসম, ইনি আমার বাবা! তারপর দ্রæত আমার কাছে চলে এল। তার বাঁ হাত আমার ডান হাতের দিকে এগিয়ে দিলে আমি তা চেপে ধরলাম। আর তার ডান হাত দিয়ে অজগরের দিকে ইশারা করল। অজগরটি পালিয়ে গেল। আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। মেয়ে আমাকে বসালো। আমি চ‚ড়ান্ত রকমের ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তাকে বুকে চেপে ধরে রাখলাম। তার চোখে-মুখে চুমু খেলাম। আমার চোখ টলমল করছে অশ্রæতে। আমি তখন শঙ্কিত, মেয়েকে দ্বিতীয়বার হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায়। সে আমার দাড়িতে হাত বুলাচ্ছে। দাড়ি নিয়ে খেলছে। আর মায়াবী চোখ দু’টি দিয়ে আমাকে নিরীক্ষণ করছে। গভীর মমতা ও নিখুঁত ভালবাসা ছিল সে দৃষ্টিতে। সে বলল :
-আচ্ছা বাবা,
﴿أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ﴾
বিশ^াসীদের কি এখনো সময় হয়নি যে তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে সিক্ত হয়ে ওঠবে? [সূরা হাদীদ : ১৮]
মেয়েটির মুখে এ আয়াত শুনে আমি কেঁদে ফেললাম। মনে হলো, এই প্রথমবার আয়াতটি শুনেছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
-তোমরা কি কোরআন শরীফও পড়তে জানো?
-আমরা আপনাদের চেয়ে ভালো জানি।
-আচ্ছা আম্মু বলো তো, এ অজগরটি কী, যা আমাকে শেষ করে ফেলতে চেয়েছিল?
-আপনার অনাচার ও কুকর্ম। আপনিই তাকে শক্তিশালী করেছেন। এখন সেটি শক্তিশালী হয়ে আপনাকে জাহান্নামে ফেলে দিতে চেয়েছিল।
-তাহলে এ দুর্বল বুড়ো কে?
-আপনার সৎকর্ম, যাকে আপনি নেহায়েত দুর্বল করে ফেলেছেন। ফলে সে আপনাকে রক্ষা করতে পারেনি।
-এ পাহাড়ে তোমরা কি কর?
-আমরা মুসলমানদের সন্তান, আমাদের এখানে রাখা হয়েছে। আমরা আপনাদের জন্য সুপারিশ করব।
স্বপ্ন দেখে আমি ভীষণ সন্ত্রস্ত হয়ে গেলাম। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘামে গোটা শরীর জবজবে। তুমুল বষর্ণে যেন আমি ডুবে গেছি। উঠে গিয়ে লাঠি দিয়ে সব বাদ্যযন্ত্র, মদের বোতল ভেঙ্গে চুরমার করে ফেললাম। আমার হৃদয় চিরে অনুতাপ ধ্বনি বের হয়ে এল।
এরপর কয়েকটা দিন বিছানায় পড়েছিলাম। এ সময়ে বারবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছিলাম। তওবা করছিলাম। রহমত ভিক্ষা করছিলাম শুধু। সে দিন থেকে আমি বিশুদ্ধভাবে নিয়ত করলাম, আল্লাহর পথে চলার। প্রথম কিছুদিন আমি ভয়ে ভয়ে তওবা করছিলাম। অজগর যেন সবসময় আমার সামনে বিমূর্ত হয়ে ছিল। এমন এক ভীতিপ্রদ সময়ে আমি নিজেকে মানুষের সাথে মেলামেশা থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম।
একবার অনাবৃষ্টির ফলে মানুষের বিরাট দুর্দশা নেমে এল। আমরা সবাই দোয়া করছি, কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। খেত-খামার সব শুকিয়ে চৌচির। মানুষ-চতুষ্পদ প্রাণী সব পিপাসায় কাতরাচ্ছে।
একদিন আমি মসজিদে বসে আছি। আর কেউ নেই। সবাই ঘরে ফিরে গেছে। হঠাৎ পায়ের হাড় বেশ ক্ষীণ, পেট বড়, কুচকুচে কালো এক মানুষ মসজিদে ঢুকে নামায পড়ল। তারপর আকাশের দিকে মাথা তুলে বলল,
-‘হে মনিব, তোমার বান্দাদের আর কতদিন ফিরিয়ে দেবে তুমি? দিলে তো তোমার কোনো ঘাটতি হবে না, কমবে না। মনিব রে আমার, আর কতদিন তুমি আবদ্ধ রাখবে তোমার রহমতের দরজা? আর কতদিন তোমার বান্দাদেরকে বঞ্চিত রাখবে? তোমার কাছে যা আছে প্রবাহিত করে দাও। আমার প্রতি তোমার ভালোবাসার দোহাই দিয়ে শপথ করছি, এক্ষুণি বৃষ্টি দাও।’
তার দোয়া শেষ হতে না হতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল। কলসের মুখের মতো বড় বড় ফোঁটা। লোকটি ফিরে যেতে উদ্যত হলে আমি তাঁর পথ আগলে দাঁড়ালাম। বললাম :
-‘আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা’ এ শব্দ বলতে কি তোমার লজ্জা হলো না? তুমি কি এতটাই নিশ্চিত যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন?
-ওহে আত্মভোলা, তুমি কি দেখছ না আল্লাহ বলেছেনÑ
﴿هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ لِيُخْرِجَكُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّور وكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا﴾
তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, তাঁর ফেরেশতাগণও রহমতের দোয়া করেন, অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোতে বের করার জন্য। আসলে তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালু। [সূরা আহযাব : ৪৩]
তুমি কি মনে কর, তিনি আমাকে ভালো না বাসলে, এ কথা বলতেন।
লোকটি আমাকে হতবিহŸল করে দিয়ে চলে গেল। সেদিন থেকে আমি একাগ্রচিত্তে আল্লাহর এবাদত করি। সাপের ভয় আমাকে অস্থির করে না।
মালেক বিন দীনার কিছুক্ষণ চুপ থেকে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
-ভাইয়েরা, আল্লাহ রহীম, চির দয়ালু। তাঁর অসীম রহমতের সুসংবাদ নাও। তিনি তোমাদের কত ভালোবাসেন। তোমরা জানতে পারলে কখনো পাপাচারে লিপ্ত হতে না। ওহে মানুষ, তোমরা কি আল্লাহকে ভালবাসো?
তাহলে জেনে রেখো! আল্লাহকে ভালবাসার চিহ্ন হলো সর্বদা তাঁর স্মরণ ও যিকির করা। কারণ, যে যাকে ভালোবাসে তাকে সে অধিকহারে স্মরণ করে। যে মানুষের সঙ্গে গল্পগুজবের চেয়ে আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনকে বেশী ভালো না বাসে, তার জ্ঞান নিশ্চয় অল্প এবং নিজের জীবন সে নিজেই ধ্বংস করছে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহর দিকে ফিরে এসো, তওবা করো।
মালেক বিন দীনার রহ. দাঁড়িয়ে গেলেন। লোকেরাও তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল। সকলে তওবার শব্দ উচ্চারণ করছিল। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ করছিল। তখন থেকে দিনটির নাম হয়ে গেল ‘অনুতাপের দিন’।
মুক্তা কণিকা হতে