আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস ইসলামের মৌলিকত্বে আঘাত

img

মাও. সাইয়েদ কামাল উদ্দিন জাফরী একজন বিখ্যাত আলেম। আলিয়ার ফারেগ। বাংলাদেশের বিখ্যাত আলিয়া মাদরাসা নরসিংদীর জামেয়া কাসেমিয়ার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। বর্তমানে অবসরে। বিখ্যাত ওই প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর হাদিসের খেদমত করার সুযোগ হয়েছে আমার। আলিয়ার সিলেবাসের জেনারেল সাবজেক্টগুলো স্কুলের অনুরূপ করেছে সরকার; আরও কিছু ঝামেলা ছিল। যে কারণে হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন করেছে। কিন্তু আলিয়া মাদরাসার কেউ একটি প্রতিবাদ দূরের কথা বিবৃতি পর্যন্ত দেয়নি। একদিন শিক্ষকদের মিটিংয়ের সময় জাফরী সাহেব বলতেছিলেন, আলিয়ার সিলেবাস নিয়ে কওমির লোকজন আন্দোলন করছে, হেফাজত মাঠে নেমেছে। তাঁরা আপনাদের সিলেবাস সংস্কারের জন্য কথা বলছে। কিন্তু আপনার চুপ করে বসে আছেন। কোথায় জমিয়তুল মুদার্দেছিন? ওরা শুধু তেল নিয়ে ঘুরে। সরকারকে কোনভাবে কখন তেল দেওয়া যায় এসব নিয়ে কাজ করে। 

বেশ ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলেন তিনি।

আলিয়ার সিলেবাসে কী কী সমস্যা?

১. ইসলামের বুনিয়াদ নষ্ট করার ষড়যন্ত্র থেকে যুগে যুগে ইসলামের ধূর্ত শত্রুরা সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রহনন করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। উসমান রাদি. এর যুগে আত্মপ্রকাশকারী সাবাঈ চক্র সর্বপ্রথম সাহাবাবিদ্বেষের মিশন শুরু করে। তারা এক্ষেত্রে দু’জন সাহাবিকে টার্গেট করে। একজন খলিফাতুল মুসলিমিন উসমান রাদি.। দ্বিতীয় জন হযরত আমিরে মুআবিয়া রাদি.।আমরা আজ শুধু দাখিল জামাতের ইসলামের ইতিহাস বই থেকে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি।
এ বইয়ে বিখ্যাত সাহাবি হযরত মুআবিয়া রাদি. ও হযরত আমর ইবনুল আস রাদি. এর চরিত্রহনন করা হয়েছে খুবই নির্মম শব্দে। এক জায়গায় উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রাদি. এর বিষোদগারও করা হয়েছে।
এ বইয়ে হযরত মুআবিয়া রাদি.কে ‘স্বার্থান্বেষী’ ‘সম্পদলোভী’ ‘ক্ষমতালোভী’ ‘উচ্চাভিলাষী’ ‘স্বার্থপর’ ‘উদ্ধত’ ‘জঙ্গী মনোভাবাপন্ন’ ‘চক্রান্তকারী’ ‘পরিস্থিতি ঘোলাটেকারী’ ‘অপরাজনীতিবিদ’ ‘ভোজবাজ’ ও ‘নিকৃষ্টতম শঠ’ এই বিশেষণগুলিই তাঁর সম্পর্কে এ বইয়ে প্রয়োগ করা হয়েছে। 
দেখুন, বইয়ের 149, 151, 152, 153 ও 154 পৃষ্ঠা। শুধু তাই নয়, যেখানে অন্য সাহাবির নামের পর ‘রাদি.’ দুআ এসেছে, সেখানে সতর্কতার সঙ্গে মুআবিয়া রাদি. এর নামের পর ‘রাদি.’ ব্যবহার করা হয়নি।
এর পাশাপাশি আলোচিত পৃষ্ঠাগুলোর নানা স্থানে হযরত আমর ইবনুল আস রাদি.কে ‘ছলচাতুরিকারী’ ‘চক্রান্তকারী’ ‘ধূর্ত’ ‘হঠকারী’ ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘কপট’ বলা হয়েছে। যখনই তাঁর নাম এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে বিশেষণ হিসেবে ‘ধূর্ত’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে, নির্মমভাবে। তাঁর নামের সঙ্গেও ‘রাদি.’ দুআ বর্জন করা হয়েছে।

এমনকি এ বইয়ে জঙ্গে জামালের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা রাদি. হযরত আলি রাদি. এর প্রতি পূর্বশত্রুতা ও পূর্ববিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে এই যুদ্ধ বাধিয়েছেন। দেখুন, পৃষ্ঠা নম্বর 149। (এ অংশটুকু ফারুক ভাই থেকে নেওয়া)

২. বর্তমান সরকার মাজারকেন্দ্রিকতা দ্বারা প্রভাবিত। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে আটরশীর মুরিদ সালাহ উদ্দিনকে খতিব নিয়োগ, সরকারি অনুষ্ঠানে মীলাদ-কিয়াম, তরিকত ফেডারেশন সরকারের জোটে থাকা, বিদআতীদের সাথে সরকারের মাখামাখি, ঈদে মীলাদুন্নবী আয়োজনে সরকারি ছুটি ও ‍পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদি বিষয়াবলি দ্বারা বিষয়টির সত্যতা প্রমাণিত হয়। যে কারণে আলিয়া মাদরাসার সিলেবাসে মীলাদ, মাজার ও বিদআতের অনেক বিষয় রয়েছে। 
৩. নাস্তিক মুরতাদ, ইসলামবিদ্বেষী ও অমুসলিম লেখকদের ওইসব কবিতা-প্রবন্ধ যেগুলো ইসলামী আকিদা ও আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলো দ্বারা আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস ভরপুর।

৪. আলিয়ার সিলেবাসে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের রূপরেখা নেই। একজন আলেম হওয়ার কিংবা নিতান্ত ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অর্জন করতে পারে, এতটুকু পরিমাণ ইলম সেখানে নেই। থাকলেও অনেক কম। যতটুকু আছে ততটুকু জেনারেল সাবজেক্টের চাপের কারণে পড়ানোর সময় নেই। অথবা ভালো শিক্ষক নেই।

৫. নাহু সরফ তথা আরবি ভাষা শেখা ও শেখানোর মতো পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। অথবা গুরুত্ব নেই। সংস্কারের নামে নাহু ও সরফকে একত্রিত করা হয়েছে; নম্বর কমানো হয়েছে। মাদরাসার বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করার পরিবর্তে স্কুলের মতো বানানোর সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জামা উপরে তুলতে তুলতে সতর খুলে গেছে এখন। 
একটি বিষয় ভাবুন, বিভিন্ন সরকার আলিয়া মাদরাসার শিক্ষাকে যুগোপযোগী, বিজ্ঞানসম্মত ইত্যাদি বানানোর নামে আলেম হওয়ার মৌলিক উপকরণগুলোকে বাদ দিয়েছে। আস্তে আস্তে করেছে কাজটা। একদিনে বা একবছরে করেনি। উর্দু বাদ দিয়েছে, আরবিকে কমানো হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব বাদ দিয়েছে। স্কুলের মতোই জেনারেল সাবজেক্টের চাপ দিয়েছে। এগুলো করেছে যেন আলিয়া মাদরাসা কওমি মাদরাসার মতো না থাকে। ভালো কথা। তাহলে সরকার এখন দারুল আরকামের নামে উর্দু ফার্সি আরবিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন মাদরাসার করার কী উদ্দেশ্য? আলিয়াকে আধুনিক বানিয়েছেন আপনারা, এখন আপনারাই আবার পুরাতন ধারার মাদরাসা শুরু করলেন কেন? আপনারা আলেম বানাতে চাইলে কওমি মাদরাসাকে সহযোগিতা করলেই তো উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়। তা ছাড়া যেসব বাম রাম কওমি মাদরাসাকে দেখতে পারত না আরবি ও উর্দুর কারণে, তারাও আজকে চুপ কেন? তারা কেন বলে না দেশে এত কওমি মাদরাসা থাকতে আপনারা আবার কেন কওমি ধারার মাদরাসা শুরু করলেন? একট শব্দও কেউ উচ্চারণ করল না কেন?

প্রতিবাদ করবে কে?

আলিয়ার সিলেবাসে এসব নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। যেগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ দরকার। কে বা কারা করবে প্রতিবাদ? আলিয়ার লোকদেরকেই প্রতিবাদ করতে হবে। সামান্য এমপিও বাতিলের ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়েছে তারা। বিভিন্ন সরকার আধুনিকাত ও সংস্কারের নামে আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে গেছে; তবুও তারা টু শব্দ করেনি! তাহলে মাদরাসা নাম দিয়ে কী লাভ? ইসলামের মৌলিক আকিদা ও চেতনাকে জলাঞ্জলি দিতে হলে ইসলামের নাম বাদ দেওয়াই সমীচীন। আলিয়ার সহ শিক্ষা এবং পুরুষদের মাদরাসায় নারী টিচার, নারীদের মাদরাসায় পুরুষ টিচার রাখার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ পর্যন্ত আপনারা করেননি। সিলেবাসে ইসলাম বিরোধী এতগুলো বিষয় থাকার পরও একটি প্রতিবাদ দূরের কথা একটি বিবৃতি পর্যন্ত কেউ দেয়নি।
প্রতিবাদ ও আন্দোলন না করার অনেক কারণ আছে। সেগুলো আলোচনা করলে তিক্ততা বাড়বে। তিক্ততা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। সমাধানের পথে যাওয়া দরকার। 
সর্বপ্রথম প্রতিবাদ করা উচিত বড় বড় আলিয়া মাদরাসাগুলোর। যেমন : ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসা, দারুন নাজাত, তামীরুল মিল্লাত, জামেয়া কাসেমিয়া নরসংদী, টুমচর মাদরাসা, ফেনী ফালাহিয়া ইত্যাদি। 
এরপর আলিয়া মাদরাসায় বিভিন্ন ধারার নেতৃস্থানীয় লোকজন আছেন; যেমন ফুরফুরা, শর্ষিনা, চরমোনাই, জামায়াত, বায়তুশ শরফ; তাঁরা একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করতে পারেন। 
তারপর আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকদের সংগঠন জমিয়াতুল মুদাররেছীন এগিয়ে আসতে পারেন। তারা অবশ্য সবসময় তেল নিয়ে ঘুরেন। তবুও আমরা আশাবাদী ইসলামের স্বার্থে তারা এগিয়ে আসবেন। 
এছাড়াও আলিয়ার শিক্ষকগণ একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করতে পারেন। অন্তত বিবৃতি দিতে পারেন।

এরপর ইসলামকে ভালোবাসেন এমন সবারই দায়িত্ব প্রতিবাদ ও সংস্কারে শামিল হওয়া। হেফাজত ও কওমির ভাইয়েরাও এগিয়ে আসতে পারেন। বলা চলে, হেফাজতই এ বিষয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। সামনে আরও করবে বলে আমরা আশাবাদী।

প্রতিবাদের পদ্ধতি ও পূর্বপ্রস্তুতি

আলিয়ার সিলেবাসের কোন কোন জায়গায় সমস্যা আছে, পৃষ্ঠা নম্বর সহ চিহ্নিত করতে হবে। মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা দরকার। নয়তো ফুরফুরা, শর্ষিনা, জামায়াত, চরমোনাই, আহলে হাদিস ইত্যাদি ঘরানার সবারই আলিয়া মাদরাসা আছে। এরা একসাথে বসলে সব বিষয়ে একমত হতে পারবে না। তাতে কোনে সমস্যা নেই। শুধু ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েই কাজ করা উচিত। তাহলে কাজ হবে, ফেতনা হবে না। 
সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের আলোকে প্রতিবাদ করলে, বিবৃতি দিলে আন্দোলন করতে পারলে সরকার অবশ্যই সংস্কার করবে। হেফাজতের আন্দোলনের কারণে সরকার তটস্ত। মিডিয়াগুলো সরকারের বিরুদ্ধে এখনও সেসব কথা বলে বেড়ায়। মোটকথা, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আন্দোলন হোক।

শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামের খেদমতের নামে আমরা অনেক কাজ করছি; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই মনে হয় আমরা বাদ দিয়েছি। 
আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।