শুধু আমলে নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানেও অগ্রগামী হতে হবে

img

Sabina Ahmed

মুসলমানেরা যখন বিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, সাহিত্য, মিলিটারি পলিসি, টেকনোলজিতে বিশ্বে সবচেয়ে অগ্রগামি ছিল, তখন তারা একের পর একে রাজ্য দখল করে বিশ্বে সবচেয়ে সভ্য আর অগ্রগামী সাম্রাজ্য কায়েম করেছিল। তারা কেবল নামাজ- রোজা- ধর্ম-কর্ম করেনি, সেই সাথে প্র্যাক্টিকাল সব পলিসি নিয়ে সমানে সামনে এগিয়েছে। একই সময় আমেরিকার তো অস্তিত্বই নাই আর বেশীরভাগ ইউরোপে চলছিল অন্ধকার যুগ।


বিশ্বে কোন দেশ বা সভ্যতা এগিয়ে থাকবে তা নির্ভর করে তাদের আপেক্ষিক অবস্থানের উপর। যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যে আব্বাসীয়রা, স্পেনে উমাইয়ারা, ভারতে মোঘলেরা, সেন্ট্রাল এশিয়ায় উসমানিয়রা এগিয়েছিল এবং এসব রাজত্ব ওপেন মাইন্ডেড ছিল তাই বিশ্ব থেকে সবাই এসব রাজত্বেই ব্যবসা করতে, চাকুরি করতে, বসতি গড়তে আসত। ফ্যাক্ট হচ্ছে অর্থনীতি। মানুষ রুজি-রোজগারের জন্যই মুসলিম বিশ্বে মাইগ্রেট করত। এদের অনেকে ধর্মান্তরিত হতো, অনেকেই নিজ ধর্মে থেকে যেত। ইসলামিক সিভিলাইজেশানের ভিতরেই জুইশ সিভিলাইজেশানের প্রসার হয়েছিল।

মুসলিম বিশ্ব যে এগিয়ে ছিল তার জন্য তাদের ধর্মের পাশাপাশি তাদের ফরোয়ার্ড থট প্রসেস কারণ ছিল। ইসলাম যখন এসেছিল তখন তা ছিল সবচেয়ে প্রোগ্রেসিভ ধর্ম। যুগান্তকারী সব পরিবর্তন এনে দিয়েছিল মানুষের জীবন যাত্রায়। খৃষ্টান, ইহুদি, হিন্দু সবাই যখন মানুষকে ধর্মীয় গোঁড়ামির মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে রেখেছিল, ইসলাম তখন মানুষকে দিয়েছিল এক অনন্য স্বাধীনতা, যেখানে কোন ক্লাসিফিকেশান ছিল না, যোগ্যতাই ছিল উপরে উঠার নির্ভরযোগ্য সিঁড়ি। তাইতো মামলুক (স্লেইভ) সেনারা যোগ্যতার বলে হতে পারত সুলতান। এমনকি এই বাংলাতেও সাত বছরের জন্য মামলুক সুলতানাত ছিল। তখন ইট ওয়াজ ভেরী কুল টু বি এ মুসলিম। এরপর মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান নিয়ে যখন ইউরোপ এগিয়ে যেতে থাকল, মুসলিম বিশ্ব তুলনামূলক ভাবে প্রথমে থমকে থাকল, এরপর পিছিয়ে পড়তে থাকল। যেই না মুসলিম বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছাতে শুরু করল শুরু হলো মুসলিম বিশ্ব থেকে প্রথমে ইউরোপে, পরে আমেরিকায় ব্রেইন ড্রেইন।


অনেক মুসলমান নিজেদের ইতিহাস নিয়ে নস্টালজিক। তারা কেবল ধর্মকর্ম দিয়ে অতীতের স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে যেতে চায়। অনেক কনজারভেটিভ মুসলমানের ধারণা মুসলমানের চরম দুর্দশার জন্য আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা দায়ী। অথচ তারা ভুলে গেছে মুসলিম বিশ্বকে সভ্যতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছেছে তাদের নানাবিধ জ্ঞান। গনিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞান, দর্শন, মেডিক্যাল সায়েন্স, মিলিটারি সায়েন্স সবকিছুতে মুসলমানেরা বাকি বিশ্ব থেকে অনেক বেশী অগ্রগামি ছিল।

অতীতে যখন সামান্য ফ্লুতেই অন্যান্য দেশে মরক লেগে যেত, তখন মুসলমানেরা হাসপাতাল বানিয়ে রোগ অনুসারে রোগিকে আলাদা আলাদা ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা করে ঠিক করে তুলত। ভারতীয় হিন্দুরা যখন সমুদ্রে গেলে জাত যাবে মনে করত, মুসলমানেরা তখন দূর পাল্লার জাহাজ নিয়ে সমুদ্র জয় করেছিল। ব্যবসা করতে সুদূর চীন পর্যন্ত তারা চলে গিয়েছিল, সেই সাথে ভারত, শ্রীলঙ্কা, সন্দীপ, চট্রগ্রাম, ইউরোপের বিভিন্ন বন্দর। তারা আন্তর্জাতিক সমুদ্র দিয়ে দিকবিদিক ছড়িয়ে গিয়ে অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিল হাজার বছরের জন্য। এসব অর্থনীতির মুদ্রায় তাদের কোষাগার ভরে উঠেছিল, আর সাথে সাথে তাদের সভ্যতা। তাদের মিলিটারি টেকনোলজির সামনে আর কেউ টিকতে পারে নাই।

যেই মুসলমানেরা প্রথম ডিগ্রি দেয়া ইউনিভার্সিটি স্থাপন করেছিল, সেই তারাই ১৭শ শতাব্দির পর একটা অক্সফোর্ড, ১৮শ শতাব্দির পর একটা হার্ভার্ড আজ পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারে নাই। মুসলমানদের হারটা এখান থেকেই শুরু। বাকিরা যখন শিক্ষা-দীক্ষা, টেকনোলজিতে লিপ্স এন্ড বাউন্ড আগাতে থাকল মুসলমানেরা তখন অতীত আকড়ে পড়ে রইল। যদি কেউ আগাতে চাইল তাকে কাফের, দালাল আখ্যা দিল। তার আগানো মুশকিল করে দিল। মুসলমানদের আজকে যেই দুর্দশা তার জন্য তাদের এই স্ট্যাগ্নেন্ট মানসিকতা দায়ী।


এখনও অনেকের ধারণা ইসলাম মানেই কেবল পর্দা করা, নামাজ কালাম, হাদীস, কুরআন পড়া। অথচ কুরআনে বারবার আল্লাহ বলেছেন সবকিছুতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞান দিয়ে জয় করো। যতদিন না মুসলিম দেশগুলো জ্ঞান আর টেকনোলজিতে বাকি দেশগুলর সাথে পাল্লা দিতে না পারছে ততদিন তাদের দুর্দশা কাটবে না। আর পশ্চিমাদের সুপারসিড করতে হলে জ্ঞান বিজ্ঞান সেই লেভেলে নিতে হবে ,কেবল জায়নামাজে আটকে থাকলে চলবে না।