নিঃসঙ্গ আলেম সমাজ : পাশে নেই কেউ

img

১লা ডিসেম্বর টঙ্গী ময়দানে ন্যাক্কারজনক একটি ঘটনা ঘটে গেলো। আজ প্রায় ১সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। ময়দানে একদল হায়েনা হিংস্রের মতো আলেম- উলামা ও মাদ্রাসা ছাত্রদের ওপর হামলে পড়েই ক্ষান্ত হয়নি। প্রত্যেকের মাথায় আঘাত করে জীবনকে সংকটময় করে দিয়েছে। বিভিন্ন মাদ্রাসায় মারাত্মক আহতদের সারিবদ্ধ ছবি দেখেছি। অসংখ্য ভিডিও দেখেছি বিভিন্ন হাসপাতালের যেখানে মাদ্রাসা ছাত্র, মাদ্রাসা শিক্ষক মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

দুয়েক জন নয়। শত শত। হাজারের ওপরে হবে এমন আহত যারা বেঁচে থাকবেন মৃত্যুর যন্ত্রনা নিয়ে। ঘটনার ভয়াবহতা কত ছিল তা বুঝতে ঢাকার যে কোন মাদ্রাসায় হাজির হলেই অনুভব করা যাবে। মাঠের ভেতরে সেদিন যারা দায়িত্ব পালন করছিলেন, খেদমত করছিলেন, মাদ্রাসায় কুরআন হিফজ করছিলেন তাদের কেহই রেহাই পায়নি। কুকুরের মতো পিঠানো হয়েছে। নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে জীবন বাঁচাতে বাধ্য করেছে একদল হায়েনা। একজন দুজন নয়, শত শত মানুষকে।

যারা বাইরে থেকে এসেছিল তথাকথিত জোড়ের নামে, তারা কেহই কোন প্রকার সামানা নিয়ে আসেনি। তারা এসেছিল আক্রোশ মিটাতে। সেই লোকগুলো কারা? তারা সেই সব লোক যারা সারা জীবন তাবলীগের কাজ করেছে। মসজিদে মসজিদে একরামুল মুসলিমুনের বয়ান করেছে। যারা আলেমদের কদর বুঝে খেদমত করার নসিহত করেছে। তারা আলেম ও মাদ্রাসা ছাত্রদের এমন খেদমত করেছে যা বাংলাদেশের আলেম সমাজ কোনদিন ভুলতে পারবে না। এই ক্ষত আগামী ৫০বছরেও শুকাবে না।

অবশ্য আমরা খুব সহজেই ভুলে যাওয়া জাতি। হেফাজতের ৫মে’র কথা খুব সহজেই ভুলে গিয়েছিলাম। শুকরিয়া মাহফিলে আমরাই অপ্রাসঙ্গিকতার সুরে হেফাজতের সাথে ৫মে কিছুই ঘটেনি সেই বয়ানও শুনেছিলাম। এই বয়ান শোনার ক্ষেত্র আমরাই প্রস্তুত করেছিলাম। ১লা ডিসেম্বরও কিছুই ঘটেনি এমন পরিবেশও হয়তো আসতে পারে। তবে যারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তারা কি ভুলতে পারবে? যারা নিজের চোখে সুন্নাতি লেবাসপরা তথাকথিত এতাআতিদের নিষ্ঠুরতা দেখেছে, নিপীড়ন সহ্য করেছে তারা কি ভুলতে পারবে? না, তারা পারবে না। হয়তো আমি ভুলে যাবো।

কিন্তু যে কথাটি বলার জন্য এই লম্বা লেখা, সেটা হলো, টঙ্গীতে এত এত মানুষ আহত হলো, কী বৃদ্ধ, কী শিশু, কী মুহাদ্দিস, মুহতামিম কেউ বাদ যায়নি, সেদিনের নির্মমতা থেকে। তাদের পাশে কোন সরকার দাঁড়ায়নি। কোন বিরোধী দল দাঁড়ায়নি। কেউ কোন প্রকার আফসোস করেছে, হা-হুতাশ করেছে, শুনিনি। আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয়পার্টি, কাউকেই দেখিনি তারা কোন মাদ্রাসায় গিয়ে মাদ্রাসা ছাত্রদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দিতে। রাষ্ট্রের সকল রাজনৈতিক শক্তির এই উদাসীনতা, উপেক্ষা আমাদের কি সামান্যও ভাবায় না?

ভিকারুননেসার একজন মেয়ে নকল করায় বকা দেওয়ায় সে আত্মহত্যা করে। তার জন্য রাষ্ট্র কী তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছে। রাষ্ট্র প্রধান তার বাসায় ছুটে যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী সেই স্কুলে ছুটে গিয়েছে। কিন্তু এতগুলো বনী আদমের মাথা ফাটানো হলো, কেউ এলো না। এটাকে আমি আলেম সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের যে চলমান অবহেলা সেটার অংশই মনে করি। আমি মনে করি, তারা মাদ্রাসার ছাত্ররা মার খাবে, রক্তাক্ত হবে এটাকেই স্বাভাবিক মনে করে। এরা যেন কোন মানুষই না। এখানে মনে পড়ে যায় মাহমুদুর রহমানের কথা। তিনি একটি বই লিখেছেন। মুসলমানদের মানবাধিকার নেই। সত্যিই, আলেম, উলামা, তুলাবা, আলেমদের সমর্থক সাধারণ সাথী তাদের জীবন যেন তুচ্ছ বিষয়। এটাকে অবহেলাই কাম্য।

সামনে নির্বাচন। সবাই যার যার আখের গুছাতে ব্যস্ত। কীভাবে নির্বাচনী ফলাফল ঘরে তুলবে, তা নিয়ে পেরেশান। সেই তারাই তো ভিকারুননেসার সেই মেয়েটির কথা ভুলে থাকতে পারেনি! তাহলে নির্বাচনের দোহাই দিয়ে কোন মাদ্রাসায় তারা যেতে পারেনি, এটা কোন অজুহাত নয়। অজুহাত অন্য কোথাও। অন্য কোনখানে। আমরা কি বিষয়টি একবারও ভেবেছি? মনে হয় না। এতগুলো মানুষ আহত হলো। নিশ্চয় তা কোন মানুষ করেছে। কিন্তু একজন আসামীও ধরা পড়লো না। এই আঘাতগুলো নিরবেই হজম করে যেতে হবে।

আমরা আজ শুক্রবার সারাদেশে ব্যাপক শোডাউন করলাম। হাজার হাজার মানুষ নিয়ে বিশাল বিশাল মিছিল করলাম। এখানেও নেই রাষ্ট্রের কেউ। নেই বিরোধী দলেরও কেউ। তাহলে কি আমাদের ভোটেরও তাদের কোন প্রয়োজন নেই? আমরা নির্বাচনী ভাবনা থেকে দূরে। আমাদের কোন প্রার্থীও নেই। দেশে দীর্ঘ ১০টি বছর ক্ষমতায় থেকে যারা নানা ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে তাদের একটি ক্রান্তিকাল। কিন্তু আমরা নির্বিকার। পরিবর্তনকামী জনতার সাথেও কি আমরা আছি? আমরাও যেন জাতীয় ইস্যূতে মুল্যহীন। এই নিঃসঙ্গতার দায় কার? আমরা রাষ্ট্র নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। রাষ্ট্রও আমাদের নিয়ে কোন প্রকার ভাবনা করছে না। তাহলে আমরা কারা? আমাদের এই রাস্ট্রে ভুমিকাই বা কি?

07.12.2018