স্বীকৃতি : কিছু প্রশ্ন কিছু উত্তর

img

বর্তমান সরকার এর সব কাজ যেমন প্রশংসনীয় নয়, তেমনি সব কাজ বর্জনীয়ও নয়। কিছু কিছু বিষয় এমন আছে যেগুলো শত বিরোধিতার ভিতর দিয়েও মানতে হয়। এ সরকারের সময়ে নাস্তিকরা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, শাপলার ট্রাডেজির কাছে নাস্তিকরা আবার সেভাবে পরাজিতও হয়েছে। এ সরকারের সময়ে ফতোয়া বিরোধী রায়ের একটি চূড়ান্ত সুরাহা হয়েছে। এমনিভাবে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার অনুমোদনের ব্যাপারে চূড়ান্ত যে সিদ্ধান্তটি গতকাল ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখ রাত প্রায় ১০.০০ঘটিকায় হয়েছে তাও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। 
এখন নানা জনের নানা প্রশ্নে আমরা কেউ হতবাক হচ্ছি, কেউ নির্বাক হচ্ছি, কেউ অতি উচ্ছাস করছি। কেউ প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছি। এ অবস্থায় আমাদের ভাবার প্রয়োজন, আসলে ঘটনা কী ঘটেছে।

স্বীকৃতি বিষয়ে অনেকের মধ্যেই ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। সরাসরি এমএ. মান দেওয়ায় অনেকেই মনক্ষুন্ন হয়েছেন। কেউ বলছেন এ স্বীকৃতি দিয়ে কী করবো? এ স্বীকৃতি আগামী দিনে নানা ক্ষতির কারণ হবে।

আসলে বিষয়টি হলো, একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন সরকারের অনুমোদন ছাড়া চলতে পারে না। একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এ ধারায় শিক্ষিত হয়ে অনুমোদনহীন ভাবে চলছে। এ কারণে তারা নানা উপহাসের শিকার হচ্ছে। এ স্বীকৃতির মাধ্যমে আজ থেকে তা দূরীভুত হলো।

একটি বিষয় সকলের জানা থাকা দরকার, কওমী আলেমগণ স্বীকৃতি দিয়ে কখনই চাকুরী চাননি? কখনই বলেননি, আমাদের এমপিওভুক্ত করতে হবে। বরং সবসময় বলেছেন : একটি রাষ্ট্রীয় অনুমোদন হোক, যেখানে কওমী মাদ্রাসা যেভাবে চলছে সেভাবেই চলার গ্যারান্টি থাকবে। পাশ হওয়া আইনে সেটাই হয়েছে। এতে অবশ্যই কওমী আলেমদের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে তারা যারা এতদিন সরকারী সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আসছেন, তাদের মায়াকান্না দেখে হাসিই পায়।

কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতির ফলে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো ছাত্র সংকটে পড়ার সম্ভাবনা আছে। এতদিন তারা গার্জিয়ানদের বুঝাতো, বাচ্চাদের কোথায় পড়ান? এসব মাদ্রাসার অনুমোদন নাই, ভবিষ্যত নাই। এখন অনুমোদন হয়ে যাওয়ায় যারা সন্তানদের দ্বীন শিখাতে চান, তারা আর ঐ দিকে পা মাড়াবেন না। ফলে কিছুটা সংকট তৈরী হবেই।

এছাড়া আরো একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার, সেটা হলো, এই সনদ দিয়ে কী কী সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাবে, এটা দিয়ে সরকারী কোন চাকুরী পাওয়া যাবে কী না? উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করা যাবে কী না? বিদেশে ডিগ্রী অর্জন করা যাবে কী না? এসব বিষয় পরিস্কার হতে একটু সময়তো লাগবেই। অনুমোদন যখন রাষ্ট্র দিয়েছে, তখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনাইতো প্রবল। সুতরাং এত হতাশ হওয়ার কী আছে? স্বীকৃতির আগে যেমন কওমী আলেমরা না খেয়ে মরেনি, স্বীকৃতির পরেও না খেয়ে মরবে না। উপরুন্ত যতই দিন যাবে, ততই কওমী সন্তানদের অল্প অল্প করে কর্মক্ষেত্রও বাড়তে থাকবে।

এতদিন যারা সরকারী মসজিদে পর্যন্ত চাকুরীর পথ কওমীদের জন্য বন্ধ করে রেখেছিল, তারাতো মনক্ষুন্ন হবেই। কারণ এখন আর কওমী আলেমদের অন্তত সরকারী মসজিদে চাকুরীর জন্য চাতুর্যপূর্ণ কামিল পাশ বাধ্যতামূলকের বিধান আর দেখানো যাবে না। এছাড়া অনেক বেসরকারী চাকুরীতে কওমী সন্তানদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা সেখানে স্থান পাচ্ছিল না কোন প্রকার অনুমোদিত শিক্ষা সনদ না থাকায়। এখন যে কোন বেসরকারী চাকুরীতে সনদ উপস্থাপন করতে পারবে। বলতে পারবে, আমি ইসলামিক স্টাডিজ ও এরাবিকে যারা এমএ পাশ করেছে তাদের সম যোগ্যতা রাখি। আমাকে পরীক্ষার সুযোগ দাও, পাশ করতে পারলে চাকুরী দাও।

মাত্র অনুমোদন হলো। এখনই বিসিএস ইত্যাদি সহ নানা চাকুরীতে কওমীদের কী ভুমিকা হবে সেই সকল প্রসঙ্গ তুলে বিকৃত হাসি দিচ্ছে। তাদের জানা উচিত, কওমী সন্তানদের যে যোগ্যতা আছে, তা তারা কিছুটা যদি কাজে লাগাতে পারে, তাহলে অসংখ্য কর্মক্ষেত্রে তারা ঢুকে যাবে।

তবে একটি আবদার সকল কওমীদের প্রতি রাখবো, স্বীকৃতি নিয়ে অতি আহলাদিত না হই। এটা আমাদের দাবী ছিল। সরকার সেটা পুরণ করেছে। এ জন্য আমরা সরকারকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। এটা করতে গিয়ে যেন অতিতোষামোদীতে লিপ্ত না হই। নিজেদের মধ্যে আত্মঘাতি গায়রতহীনতা তৈরী না হয়। যেটা নানুপুর এবং দারুল মাআরিফে সুচিন্তা নামক সংগঠনের মাধ্যমে হয়েছে। এটা গায়রত্হীনতার নিদর্শন। আত্মমযার্দাহীন হওয়ার মতো কোন কাজ যেন আমরা না করি।

স্বীকৃতির ফলে কওমী মাদ্রাসা সমূহে চলমান অরাজকতা, শিক্ষার ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে খামখেয়ালী পর্যায়ক্রমে কমে আসবে এটাই আশাবাদ। কওমী মাদ্রাসায় শর্টকোর্স নামে যে সকল প্রতিষ্ঠান চলছে সেগুলোকে ডিপ্লোমা স্তরে নামিয়ে আনতে হবে। কোন অবস্থাতেই তাদেরকে শর্টকাট পথে দাওরায়ে হাদীস পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। সব ছাত্রদের দাওরায়ে হাদীস পাশ করানো জরুরী বিষয় নয়। অযোগ্য এবং শর্টকোর্সধারীরা যেন কোন অবস্থাতেই দাওরায়ে হাদীসের সনদ গ্রহন করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।