শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর দরাজকণ্ঠের হাসি ভুলবার নয়

img

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির ইতিহাসে প্রাতঃস্মরণীয় একটি নাম শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.। আমৃত্যু যিনি দরসে হাদীসের মঞ্চ থেকে রাজনীতির মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। ইসলামী রাজনীতি বলতে যদিও আলাদা কিছু নেই, তদুপরি এদেশে আলেম-উলামাদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক যে সকল আন্দোলন, সংগ্রাম হয়েছে সেগুলোকে ইসলামী রাজনীতি হিসেবে অনেকেই বিবেচনা করে থাকেন। সমাজের অসংগতি, অনিয়ম বিশৃঙ্খলা নিয়ে ভাবেন এদেশের সকল মানুষই। তার মধ্যে সচেতন আলেম সমাজ আরো বেশি ভাবেন। এই সমাজের যে কোন ধরণের নৈতিক অধঃপতন যখন কারো চোখে পরে, তখনই উলামায়ে কেরাম এসব বিষয়ে কথা বলেন। এই কথা বলাটাকে ঈমানী দায়িত্ব মনে করেন। এটাকে ফরযিয়্যাত হিসেবে বিবেচনা করেন। কোন প্রকার চাপ, লোভ, চাওয়া-পাওয়ার হিসেব থেকে এদেশের আলেম সমাজ কখনই রাজপথে আসেন না।

আল্লামা আজিজুল হক রহ. এমন সব প্রতিভার অধিকারী ছিলেন, যা আজকাল খুবই বিরল হিসেবে দেখা যায়। একদিকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অপরদিকে কুরআন ও হাদীসের দরসে গভীর জ্ঞানের পাঠদান। পাশাপাশি লিখনী থেকে শুরু করে ওয়াজমাহফিল গুলোকে জাগিয়ে তোলার সব ময়দানেই ছিল অসাধারণ উপস্থিতি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যিনি আপোষহীনভাবে কাজ করে গেছেন তিনিই হলেন আমাদের সকলের প্রিয় শায়খুল হাদীস রহ.। একাধারে প্রায় ৬যুগ দরসে হাদীসের খেদমত করে গেছেন। পাশাপাশি বুখারী শরীফের মতো বিশাল গ্রন্থের অনুবাদের মতো ভারী কাজ আঞ্জাম দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, তাঁর মধ্যে একই সাথে অনেকগুলো প্রতিভার সংমিশ্রন ঘটেছিল।

আজকাল অনেক বক্তাকে দেখা যায়, আলোচনায় খুব নাম কামাই করেছেন, কিন্তু ইলমের জগতে গভীরতা নেই। অথবা রাজনীতির ময়দানে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেন না। অথচ আল্লামা শায়খুল হাদীস রহ. ছিলেন এসব গুণের সমন্বয়ক। তাঁর মধ্যে কোন অহঙ্কার ছিল না। অহমিকা ছিল  না। দেশ ও জাতির স্বার্থে যে কোন প্রকার ঐক্যের আহবানে তিনি এগিয়ে এসেছেন। তিনি ইসলামী রাজনীতির ময়দানে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়েছিলেন। কত ছাত্র, সংগঠক, রাজনীতিবিদকে তিনি  আশ্রয় দিয়েছেন, ঠিকানা বাতলিয়েছেন, তার শেষ নেই।

২০০১সালের জাতীয় নির্বাচনে মুফতি শহীদুল ইসলাম সাহেবের এলাকায় আল্লামা শায়খুল হাদীস সাহেব গিয়েছিলেন। তিনি ফরিদপুরের বোয়ালমারী বাসস্ট্যান্ডে জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। শায়খের সফরসঙ্গী হিসেবে আমরা ফরিদপুর থেকে যোগদান করি। নড়াইলে বিভিন্ন জনসভায় শায়খ ভাষণ দেন। সে দিনগুলো আজ খুব মনে পড়ে। শুন্য থেকে মুফতি শহীদ সাহেব শায়খের কেরেশমাতে কীভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন তা ভাবলেও এখন ভালো লাগে।

আল্লামা শায়খুল হাদীস রহ. ছিলেন রাজনীতিবিদদের অভিভাবক। তিনি যখন ২০০১ এর নির্বাচনের পর ফরিদপুর যান, তখন দেখেছি তৎকালীন মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ কত মহব্বতের সাথে শায়খের কাছে এসে মসজিদের ফ্লোরে বসেছিলেন। বেগম জিয়া শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল রহ.কে অভিভাবকতুল্য মনে করতেন। শ্রদ্ধা করতেন। যথাযথ মূল্যায়ণ না  করতে পারার বিষয়টি এখানে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় মনে করি। এটা বিএনপির সামগ্রীক রাজনৈতিক অদূরদির্শিতা ছিল।

বর্তমান বাংলাদেশে আমরা এ রকম অভিভাবকের শুন্যতা চরমভাবে অনুভব করছি। ইসলাম ভালোবাসে এমন মানুষগুলো আজ দিশেহারা। তারা কার ডাকে রাজপথে নামবে, কাকে বিশ্বাস করবে, কে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের মূল্যায়ণ করবে এসব বিষয় চিন্তা করে। কিন্তু আল্লামা শায়খুল হাদীস রহ. যখন বাবরী মসজিদ অভিমুখে লংমার্চ আহবান করেছিলেন তখন সাধারণ মানুষ এসব নয় ছয় ভাবেন নাই। এটা ছিল  শায়খুল হাদীসের রাজনৈতিক গ্রহনযোগ্যতা।

শায়খুল হাদীস রহ. এর একটি বড় গুণ ছিল, তিনি সবসময় হাসিমুখ থাকতেন। প্রখর স্মরণশক্তির অধিকারী হওয়ায় অনেকের নাম স্মরণ রাখতে পারতেন। তাঁর অসাধারণ হাসি ভক্ত অনুরাগীদের খুব কাছে টানতো। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। আমরা এখন তাঁর শুন্যতা তীব্রভাবে অনুভব করছি। এমন দরদী আলেম, মেধাবী মুখ, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ খুব সহসাই পাবো বলে মনে হয় না। আল্লাহ তায়ালা হযরতকে পরপারেও শান্তিতে রাখুন।

08.08.2018