বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা: প্রেক্ষিত তুরস্ক ও মালয়েশিয়া

img

হতাশাগ্রস্থ মুসলিম বিশ্বে ক্ষণে ক্ষণে আশার আলো মাঝে মাঝেই জ্বলে উঠে। আবার নিভে যায়। আবার জেগে উঠে। এভাবেই চলছে বিংশ শতাব্দী থেকে একবিংশ শতাব্দীর চলমান সময় পর্যন্ত। বিগত শতাব্দীতে মুসলমানদের জন্য তাসবীহের দানার মতো বিপদ আসছেই। এ যেন শেষ হবার নয়। কত কান্না মুসলিম বিশ্ব দেখেছে, কত রক্তের বন্যা মুসলিম বিশ্ব দেখেছে তা লেখে শেষ করা যাবে না। কাশ্মীর, চেচনিয়া, হারজেগোভিনা, ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, আফগান, আর আরাকান এ যেন রক্তের ইতিহাসে লেখা মহাসাগর। তবুও কি মুসলিমগণ থেমে আছে?

না, থেমে নেই। একদল মুসলিম সবসময় জেগেছিল, এখনো জেগে আছে। কীভাবে এই উম্মাহকে উদ্ধার করা যায় সেই ভাবনায় পড়ে আছে আল্লাহর রাস্তায়। তারা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে, আবার কীভাবে একটি সুন্দর প্রভাতের জন্ম দেওয়া যায়। এ জন্য আলী ইজ্জত বেগোভিচ, ইমাম শামেল, বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী, উসামা বিন লাদেন, মাসউদ আজহার, মোল্লা উমর, ইয়াসির আরাফাত, ড. মুরসী, মাহাথির মুহাম্মদ, এরদুয়ান প্রমুখ ব্যক্তিত্বরা আজীবন কাজ করে গেছেন, কাজ করে যাচ্ছেন। যদিও এদের সবার কার্মপদ্ধতি এক নয়, তথাপি তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু একই।

সর্বশেষ বড় দুটি ঘটনা আমাদেরকে উজ্জীবিত করেছে। প্রেরণা যুগিয়েছে। আর সেই দুটি দেশ হলো- মালয়েশিয়া ও তুরস্কে মাহাথির মুহাম্মদ এবং এরদুয়ানের বিজয়ীবেশে ফিরে আসার ঘটনা। মালয়েশিয়া আমাদের খুব কাছের দেশ। তারা তাদের দেশটাকে সর্বদিক দিয়ে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। একটি সুন্দর জাতি গঠন থেকে শুরু করে একটি সুন্দর দেশ গঠন পর্যন্ত। মানুষের মধ্যে নৈতিকতা তৈরী, দেশের প্রতি মমত্ববোধ জাগানো, দেশের উন্নয়নকল্পে যে কোন বড় সিদ্ধান্ত গ্রহনে তাদের সাহস আমাদেরকে কিছুটা হলেও প্রেরণা যোগায়।

মালয়েশিয়া শুধু একটি ধর্মীয় লেবাসে পরিচিত দেশ নয়। জাগতিক উন্নয়নেও তারা সেরা। অনেক মুসলিম দেশের মধ্যে তারা শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করতে পারে। মালয়েশিয়া একজন ব্যক্তির হাত ধরে আজ এ পর্যায়ে এসেছে। তিনি হলেন মাহাথির মুহাম্মদ। তিনি শেষ বয়সে এসেও এমন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন যেটা অভাবনীয়। ৯২ বছর বয়সে নির্বাচন করা, সেই নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া, শুধু তাই নয়, তিনি যে দলের ব্যানারে দীর্ঘদিন শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রটাকে গড়ে দিয়ে এসেছিলেন সেই দলটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামা নতুন চমক। যারা মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দীর্ঘ ৬০ বছর ক্ষমতায়, সেই দলটিকে দূর্ণীতির অভিযোগে প্রত্যাখ্যান করে, বিরোধী দলের সাথে হাত মিলিয়ে আবারও ক্ষমতায় আসা বড় ধরণের চমক।

মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। একটি আদর্শ মালয় জাতি গড়ে তুলছে, যারা একদিকে ধর্মপ্রাণ, অপরদিকে উন্নত। আমরা সাধারণত মনে করি, ইসলাম মানেই একটি অভাবী, হতদরিদ্র শ্রেণি। গোটা আফ্রিকার দিকে তাকালে এমনই মনে হয়। মালয়েশিয়ায় ইসলাম অনুশীলনের যে সুন্দর চর্চার পরিবেশ দেখা যায় তা আমাদের অনেকেরই কাম্য। যদিও সেখানে এখনো অনেক কিছুই ইসলামের সাথে মিলে না এমন বিষয় রয়ে গেছে। মালয়েশিয়া যে গতিতে, যে নীতিতে জাগতিক উন্নতির পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগরণেও বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে তা থেকে কিছু হলেও আমাদের শিক্ষণীয় আছে। মালয়েশিয়া আমাদের জন্য উন্নয়নের মডেল নয়, তবে তাদের দেখে আমরা উন্নয়নের কিছু কৌশল গ্রহন করতে পারি।

অপরদিকে তুরস্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তুরস্কের অতীত ইতিহাস, বিগত শতাব্দীর কর্মতৎপরতা, সর্বশেষ এরদুয়ানের বিজয়, বিজয়ের ধারাবাহিকতা, মুসলিম বিশ্বে কিছুটা হলেও প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। উম্মাহর সদস্য হিসেবে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে যে কোন বিজয় প্রকৃত মুসলমানদের মনে দোলা দেয়। প্রাণচাঞ্চল্য জাগায়। বিশ্বের যে কোন প্রান্তের মুসলমানদের কষ্টে যেমন আমরা কাঁদি, তেমনি কোন বিজয়ে আমরা হাসি। তুরস্ক এমনই একটি রাষ্ট্র, যার অতীত খুব গৌরবময়। ইসলামের সাথে তাদের অগ্রযাত্রার ইতিহাস যেমন সুখময়, তেমনি ইসলাম ধ্বংসে তুরস্কের ভূমিকাও কম কষ্টের নয়। দীর্ঘ একটি সময় তুরস্ক ইসলামের প্রাণস্পন্দন নিভাতে অপচেষ্টা চালিয়েছে। সে ঘোর অমানিশা ভেদ করে তুরস্ক আবার স্বপথে ‍ ফিরে আসছে। সেটাই আশাবাদি হওয়ার কারণ।

তুরস্কে এরদুয়ানদের অগ্রযাত্রা শুধু তুরস্কেই সীমাবদ্ধ নয়। এরসাথে মুসলিম বিশ্বের প্রাণস্পন্দনও বাড়ছে। নিপীড়িত মানুষগুলো যেন আশার আলো দেখছে। বিশেষকরে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এরদুয়ানের দাপুটে উপস্থিতি আশান্বিত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। অবশ্য তুরস্কের মাটি ও মানুষের মেজাজ আমাদের দেশের মতো নয়। আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিতে যেভাবে শকুনের চোখ পড়েছে,তাতে আমাদের খুব সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ থেকে বের হতে হলে অবশ্যই চতুর্মুখি চক্রান্ত সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে।

মালয়েশিয়া এবং তুরস্কের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমাদের মতো নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, ধর্মীয় অঙ্গনটা বেশ জটিল ও কুটিল। এতদসত্ত্বেও আমাদেরকে তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার অগ্রযাত্রা থেকে আমাদের যতটুকু সম্ভব ভালোটা গ্রহন করতে হবে। আমাদের মাটি ও পরিবেশের সাথে খাপ খায় এমন বিষয়গুলো অনুসরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে আমরা একটি উন্নয়ন রূপরেখা তৈরী করতে পারি। প্রস্তাবনা তৈরী করতে পারি। কি কি বিষয় আমরা গ্রহন করতে পারি, কতটুকু গ্রহন করা আমাদের জন্য সম্ভব নয় সেটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। আলোচনা হতে পারে। সংলাপ হতে পারে।

বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট ( বিআইএম) মনে করে, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক যে মডেল অনুসরণ করে সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা হুবুহু বাংলাদেশে অনুসরণীয় না হলেও অবশ্যই কিছু দিক নির্দেশনা দিবে। তুরস্ক তার গৌরবময় অতীতে ফিরতে নানা প্রকার কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ এবং বহিঃশক্তির নানামুখি ষঢযন্ত্র, চক্রান্ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। শত বছর আগের নীতি ও কৌশল এখন প্রযোজ্য নয়। আধুনিক প্রযুক্তির উৎর্ষতার এই সময়ে এতটা সহজ নয়, অতীতে ফিরে যাওয়া। তবুও ইসলামের চির আধুনিকতার দীক্ষা গ্রহন করে এরদুয়ানরা যে স্বপ্ন মুসলিম বিশ্বের তরুণদের মনে জাগাতে সক্ষম হয়েছে তার প্রমাণ মিলে সর্বশেষ তুরস্কের নির্বাচনী ফলাফলে। এ নির্বাচন যেন তুরস্কের নয়, এ নির্বাচন যেন মুসলিম উম্মাহর। একে পার্টি হেরে যাওয়া মানে মুসলিম উম্মাহর হেরে যাওয়া। এটা এরদুয়ানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের কারণেই হয়েছে।

সুতরাং আমাদেরকে বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে হবে। চর্তুমুখি বহিঃশক্তি দ্বারা বেষ্টিত একটি রাষ্ট্রে ইসলামের সুমহান আদর্শের ওপর অবিচল থেকে কীভাবে উম্মাহর প্রতিটি সদস্যকে নিয়ে নীতি ও আদর্শের ওপর অবিচল থাকা যায়, কীভাবে এ মাটি ও ভূমির হেফাজত নিশ্চিত করা যায় তা আলোচনার বিষয় বটে।

আর সে জন্যই বিআইএম সিদ্ধান্ত নিয়েছে : “বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা : প্রেক্ষিত মালয়েশিয়া ও তুরস্ক” শীর্ষক আলোচনা সভা করার। আমার মনে হয় একটি সময়োপযোগি বিষয়। যা আমাদের দেশের তরুণদের মনে আশা জাগাতে, সাড়া ফেলতে সক্ষম হবে। অন্তত কিছুটা হলেও আলোচনার খোরাক যোগাবে।

রুফাকা টাওয়ার
18.07.2018