নয়া আফগান : নয়া তালেবান

img

আফগানিস্তান দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। এতটা দ্রুত পরিবর্তন আসবে তা কেউ হয়তো এক বছর আগে কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু এই পরিবর্তনের ঢেউয়ের মধ্যেও একটি প্রশ্ন বারবার জাগছে। সেটা হলো, আমেরিকা যদি চাইতো, আফগান থেকে নীরবে সরে পড়বে তাহলে তারা কি সেটা করতে পারতো না? আফগানিস্তানে আশরাফ ঘানির যে বর্তমান সরকার আছে, তাদের হাতে যে পরিমাণ অস্ত্র ও সেনা আছে, তাদের হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে তারা কি খুব চুপিসারে আফগান থেকে সরে পড়তে পারতো না? সেটা না করে তারা কেন আফগান থেকে বিদায়ের আগে, সরকারের সাথে কোন বোঝাপড়ায় না গিয়ে তা লে বা ন দের সাথেই বৈঠকে বসলো? যাদেরকে তারা ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেছিল, যাদেরকে তারা গত বিশটি বছর সীমাহীন জুলুম- নির্যাতন করলো, যাদের নিয়ে বিশ্বব্যাপি মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলো সেই শক্তিটির সাথেই আমেরিকা কেন নিরাপদে আফগান ত্যাগের চুক্তি করতে গেলো? এর পেছনে কি অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে?

আমার কাছে মনে হচ্ছে, যে সরকারকে তারা গত বিশটি বছর প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে চেষ্টা করেছে তাদের প্রতি আমেরিকার কোন আস্থা তৈরি হয়নি। যে ভারত আমেরিকান বাহিনীর পেছনে আঁঠার মতো লেগেছিল তাদের ওপরও কোন ভরসা পায়নি। আর সে কারণেই তারা বাগরাম বিমান ঘাটি ছেড়ে দেওয়ার সময় কোন প্রকার আগাম তথ্য সরকারকে দেয়নি। একেবারেই চুপিসারে চলে গেছে। এতে এক ধরণের পরাজয় থাকলেও এর মাধ্যমে তারা তা লে বা ন দের কে কি কোন বিশেষ সুবিধা দিতে চেয়েছে? আফগানের সরকারি বাহিনীকে অন্ধকারে রেখে এভাবে চলে যাওয়ার মাধ্যমে কি খুব সহজেই বাগরাম ঘাটিও তা লে বা ন রা যাতে দখল করতে পারে সে সুযোগ করে দিতে চেয়েছে?

আফগানের ক্ষমতা ন্যাটো জোটের মাধ্যমে আমেরিকা দখল করেছিল শক্তির জোরে। কোন প্রকার নৈতিকতার মানদন্ডে নয়। আমেরিকা চলে যাচ্ছে, সব ন্যাটো দেশও চলে যাচ্ছে। আর যাদের নিকট থেকে তারা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল, পরোক্ষভাবে তারা কি তাদের হাতেই ক্ষমতা তুলে দিতে চাচ্ছে? এতে আমেরিকার কি নতুন কোন সুযোগের প্রত্যাশা আছে? নাকি শুধূই পরাজয়? আমার কাছে মনে হচ্ছে আমেরিকা পরাজয়ের ভেতর দিয়েও কিছুটা লাভ নিজের ঘরে তুলতে চাচ্ছে।
ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পত্রিকা মারফত খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, আফগানে ব্যাপক পরিমাণ খণিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। যেগুলো তা লে বা ন দের কারণে পরাশক্তিগুলো নিরাপদে উত্তোলন করতে পারেনি। আজকের প্রথম আলোতে আলতাফ পারভেজ এর লেখাটি যারা পড়েছেন তারা জানবেন যে, কী পরিমাণ বিপুল সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে আফগান। আর এ সবকিছুর নিয়ন্ত্রন চলে যাচ্ছে তা লে বা ন দের হাতে। তলে তলে এখন সব পরাশক্তিই ওদেরকে তেল মারা শুরু করেছে। এমনকি আমেরিকাও আড়ালে- আবডালে বিপুল খণিজ সম্পদের লোভে তা লে বা ন দের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চাচ্ছে যাতে আগামী দিনে এসব বিষয়ে তাদের তদবির করা সহজ হয়। বিশেষ করে আমেরিকার পক্ষে তা লে বা ন দের সাথে যিনি শান্তিচু্ক্তিটি ডিল করেছেন তিনি এবং তার সন্তান এসব বিষয়ে খুবই এক্সপার্ট। এ সম্পর্কে জানতে নীচের লেখাটি পড়তে পারেন। https://www.prothomalo.com/opinion/column/

তা লে বা ন রা এখনো ক্ষমতায় আসেনি। ইতিমধ্যেই তারা রাশিয়ার সাথে বৈঠক করেছে। চীনের সাথে বৈঠক করেছে। ইরানের সাথে করেছে। সবগুলো সীমান্ত তারা দখল করে নিয়েছে। খণিজ সম্পদ এলাকাগুলোতেও তাদের নজরদারি বাড়িয়েছে এবং দখল নিতে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করে দিয়েছে। আশরাফ ঘানির সরকার যে খুব বেশি দিন টিকবে না এটা আমেরিকা ইতিমধ্যেই নানা এ্যাঙ্গেলে জানিয়ে দিয়েছে। এক্ষত্রে রাজনৈতিক কলা-কৌশলে সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় রয়েছে প্রতিবেশি দেশ ভারত। তারা একদিকে গোপন চ্যানেলে তা লে বা ন দের সাথে আপোষে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অপরদিকে আশরাফ ঘানি সরকারকে দিয়ে তালেবানদের দমন করার জন্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পাঠানোর খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
সংবাদের লিঙ্ক .. https://m.dailyinqilab.com/article/398400/

এসব অস্ত্র দিয়ে তা লে বা ন দের দমন করাই যে মূল উদ্দেশ্য তা তো পরিস্কার। তবে, এই মুহুর্তে তাদের অস্ত্রের চালান বড় ধরণের ভুল পদক্ষেপ বলেই মনে হচ্ছে। যেখানে সবগুলো পরাশক্তি তা লে বা ন দের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তখন তাদের এই কয়েক বিমান অস্ত্রের চালান তাদের সাথে আগামী দিনের সম্ভাব্য আফগান সরকারের সাথে সম্পর্কে তিক্ততা বাড়াবে বৈ কমাবে না। এক্ষেত্রে একটি কথা খুব মনে পড়ছে। সেটা হলো, “আমেরিকা হলো তা লে বা ন দের শিক্ষিত শত্রু। আর ভারত হলো মুর্খ বন্ধু”। তারা সময়ের সেরা রাজনীতিটা উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরান আফগানের হাজারা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে তা লে বা ন দের সাথে বন্ধুসুলভ নিশ্চয়তা আদায় করে নিয়েছে। চীন যেখানে উইগুর মুসলমানদের নিয়ে আফগানিস্তানের আগামী সরকার যেন কোন রকম মাথা না ঘামায় সেটা নিশ্চিত করেছে সেখানে ভারত এখনো ঘানি সরকারকে অস্ত্র দিচ্ছে। এটা যে আফগানকে অস্থিতিশীল করতে কাজে লাগানো হবে সেটাতো সবার কাছেই পরিস্কার। অথচ পার্শ্ববর্তী সবগুলো দেশই তা লে বা ন দের সাথে সুসম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে।

এমনকি বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো তা লে বা ন দের সাথে এক ধরণের আপোষ রফায় যেতে চাচ্ছে। তারাও চাইবে না, আফগানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হোক। কারণ তাদের বড় ধরণের স্বার্থ কাজ করছে। আমার মনে হচ্ছে, একমাত্র ভারত ছাড়া আর কেউ চাইছে না আফগানে আবার গোষ্ঠীগত দাঙ্গা মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক। সেটা নিশ্চিত করতে তা লে বা ন রাও অনেক কৌশলী অঙ্গীকার করে যাচ্ছে। তারা ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে, “চীন আমাদের শত্রু নয়, কৌশলগত বন্ধু”। আর মুসলিম বিশ্বের উদীয়মান শক্তি তুরস্ক নতুন করে আফগানে এসে ঘাটি গাড়ছে। তা লে বা ন দের আগামী ইসলামী সরকারের পথে তুরস্ক কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি করবে না এটা মোটামুটি জোর দিয়েই বলা যায়। তুরস্কের সাথে আফগানের রয়েছে গভীর হৃদ্যতা ও দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। কাবুলের আন্তর্জাতিক হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার কথা ইতিমধ্যেই এরদোয়ান প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে। একেবারেই তা লে বা ন দের সম্মতি না থাকলে কোন অবস্থাতেই তুরস্ক এই ঝুঁকি নিতো না। কিছু বাধা থাকলেও তারা তুরস্ককে শত্রু হিসেবে গন্য করবে না।

সবমিলিয়ে মনে হচ্ছে বৃহৎশক্তিগুলোর আশির্বাদ নিয়েই নতুন শক্তি হিসেবে তারা ক্ষমতায় আসবে এবং একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র বিশ্ববাসিকে উপহার দিতে পারবে। বিশ্বশক্তিগুলো যেহেতু জোরকরে তাদের নিকট থেকে খণিজ লুট করতে পারে নাই, এখন তারা তেল মেরেই এগুলো ভোগ করার চেষ্টা করবে। এতে নতুন সরকার খুব ভালো করেই লাভবান হবে বলে মনে হচ্ছে। আফগানিদের এসব খণিজ সম্পদ বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে এক ধরণের দরকষাকষির সুযোগ করে দিয়েছে। নগদ অর্থের বিনিময়ে তারা এসব খণিজ সম্পদ আহরণ করতে পারবে। বিনিময়ে তারা যে নতুন ধাঁচের সরকার গঠন করবে, সেই ক্ষেত্রে হয়তো তেমন একটা বাধার সৃষ্টি করবে না।

সময়ই বলে দিবে আফগানের আকাশে নতুন সুর্য কীরূপে আবির্ভাব লাভ করে। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতি এটা প্রমাণ করছে যে, তারা দীর্ঘ মেয়াদিই হবে ইনশাআল্লাহ। এবং দক্ষতার সাথেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। আফগানের স্থিতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো মুসলিম জনপদের জন্য কিছুটা হলেও আশির্বাদ হয়ে দেখা দিবে। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির সংজ্ঞা ধীরে ধীরে পাল্টে যাবে পত্রিকার পাতা থেকে। আফগানে একটি স্থিতিশীল সরকার ক্ষমতায় আসুক সেই প্রত্যাশাই আমাদের। আর যারা তাদের আজন্ম শত্রু আল্লাহ যেন তাদের উচিত শিক্ষা দেন সেই দুআ করছি তাদের জন্য।


জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম
13.07.2021