প্রজেক্ট প্রোফাইল কী ও কেন?

img

আজ এমন একটি বিষয়ে কথা বলবো, যে বিষয়ে আমি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নই। এ বিষয়ে এক্সপার্টও নই। তবে, অভিজ্ঞতার কিছু কথা শেয়ার করবো বন্ধুদের সাথে। আমার ভাই অথবা সন্তানসমতুল্য তরুন প্রজন্মের সাথে। আমরা একটা কঠিন সময়টি পার করে চলে এসেছি, এখন আমাদের সন্তানদের পালা। আমি আমার সন্তানের জন্য যা কল্যাণকর চিন্তা করি, সকল তরুনদের জন্যও তাই চিন্তা করি। আর সে জন্যই কথা বলি, কিছু লিখি সেই প্রেরণা থেকে। দায় থেকে। দায়িত্ব থেকে।

প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি, বাস্তবায়ন কিছুটা পেশাদারিত্বের কাজ। তরুন আলেমদের মধ্যে যারা কিছুটা বাংলা অথবা ইংরেজি চর্চা করেছেন তাদের জন্য এসব আলোচনা কিছুটা হলেও উপকারে আসবে বলে মনে করি। যারা এ বিষয়ে খুবই প্রাজ্ঞ, এক্সপার্ট তাদের কাছে আমার এ কথাগুলোও হয়তোবা অপেশাদার মনে হতে পারে। আমি তাদের কাছে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

প্রজেক্ট প্রোফাইল কি?
সংক্ষেপে বলতে গেলে বলবো যে, আপনি নতুন কিছু করার যে চিন্তা করছেন, মনে মনে পরিকল্পনা করছেন, তার আদ্যোপান্ত লিখিতরূপে নিজের সামনে তুলে ধরা। কোন একটা কাজ করতে গেলে সে সম্পর্কে যতটা সম্ভব পুর্ব ধারণা লাভ করা। সেই কাজটি বাস্তবায়ণের রূপরেখা কাগজে-কলমে আঁকতে পারাই হলো প্রজেক্ট প্রোফাইল।

কেন প্রজেক্ট প্রোফাইল দরকার?
এজন্যই প্রজেক্ট প্রোফাইল দরকার, যাতে কাজ করতে নেমে বড় ধরণের হোচট খেতে না হয়। প্রজেক্ট প্রোফাইল মানে কাজের লিখিত পরিকল্পনা। এটা নিশ্চয় যারা অভিজ্ঞ তাদের ছাড়া করা সম্ভব নয়। আর যারা কাজ করতে করতে, ঠেকতে ঠেকতে শিখেছেন, তাদের চিন্তা, ভাবনা, গবেষণা, তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই যে কোন প্রজেক্ট তৈরি হয়। সে ভাবেই যতদূর সম্ভব ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীভূত করে নিখুঁতভাবে কাজ সম্পাদন করার চেষ্টা করা হয়। একটি প্রজেক্টের প্রোফাইল পুর্ব থেকে তৈরি করা থাকলে সময়ের সাশ্রয় হয়। দ্রুত লক্ষ্যে পৌছাঁ যায়। সবচেয়ে বড় যে উপকারটি হয়, সেটা হলো, প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে হলে কারো একার পক্ষে তা হয়তো কখনোই সম্ভব হয় না। সেজন্য একটি প্রোফাইল তৈরি করা থাকলে সহযোগিতার জন্য লোক পাওয়া যায়। আর আজকাল অনেক বড় বড় ডোনেশন কোম্পানী আছে তাদের কাছে ভালো কোন কাজের প্রোফাইল ‍উপস্থাপন করতে পারলে তাদের অনুদান পাওয়া সহজ হয়।

কীভাবে প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়?
আপনার মাথায় প্রথমেই যে কাজটি করার চিন্তা আছে, সেটা হলো প্রজেক্টের হেডলাইন। শিরোণাম। মনে করেন, একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ সেন্টার খুলবেন। তখন আপনি প্রথমে এর মনে মনে একটি নাম ঠিক করে ফেললেন, তারপর ধীরে ধীরে এর গভীরে গেলেন। এর জন্য নির্দিষ্ট একটি জায়গা লাগবে। কতটুকু স্পেস আপনার পক্ষে নেওয়া সম্ভব সেটা ভাববেন। তারপর সেখানের প্রতিটি ইঞ্চি জমিকে কীভাবে কাজে লাগাবেন, কোন জায়গায় কী বসাবেন, এর দ্বারা টার্গেট শ্রেণি কারা? তাদের নিয়ে কল্পনা করবেন। তাদেরকে আকর্ষণ করার জন্য আপনি কী কী মিডিয়ার আশ্রয় নিবেন, কী কী মালামাল লাগবে। কী পরিমাণ অর্থ লাগবে। এই অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করা যাবে তার অনেকগুলি ধারণাপত্র তৈরি করবেন। যেমন এটা হয়তো কয়েকজন বন্ধু মিলে করবেন, তাহলে শেয়ার মূল্য কত হবে, বন্ধুদের অংশীদারিত্বের কার কতটুকু হার হবে? কার কী দায়িত্ব হবে? অথবা যদি কোম্পানীর নিকট থেকে ডোনেশন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেটা কীভাবে সংগ্রহ করা যাবে? অথবা বিদেশি কোন দূতাবাস, ডোনেশন সংস্থা থেকে যদি সংগ্রহ করা যায়, সেটা কীভাবে কাজে লাগাবেন তার একটি পরিকল্পনা থাকবে। অতঃপর প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে সেখান থেকে এই অর্থ কীভাবে রিটার্ণ আসবে তার একটি পরিকল্পনা করতে হবে। কতদিনের মধ্যে টোটাল অর্থ হাতে আসবে তার একটি পূর্ব ধারণাপত্র তৈরি করতে হবে। এভাবেই একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়।

প্রজেক্ট প্রোফাইল দ্বারা লাভ কি?
এর দ্বারা অনেক লাভ রয়েছে। আজকের বিশ্বে কেউ একা একা ডেভলপ করতে পারে না। কারো না কারো সহযোগিতা লাগে। আর সেই সহযোগিতাটা আদায় করতে হলে একটি সুন্দর প্রকল্প পরিকল্পনা দরকার। সুন্দর একটি পরিকল্পনা কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়। অর্থ পাওয়ার সহজ পথ করে দেয়। একজন সম্পদশালির নিকট যতই বলেন, ভাই আমরা কিছু কাজ করতে চাই, আমরা কিছু লোক বেকার আছি, আমাদেরকে সাহায্য করেন, তারা সহজে করবে না। কিন্তু ভালো মানের একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করতে পারলে তাদের নিকট থেকে অর্থ আদায় অনেক সহজ।

বাংলাদেশের বড় বড় এনজিওগুলো দাঁড়িয়ে আছে প্রজেক্ট প্রোফাইলের ওপরে। আপনি ব্রাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক ইত্যাদির যে কোন একটি শাখায় যান, দেখবেন তাদের প্রতিটি কাজ কত গোছানো। পরিপাটি। কেন? কারণ তাদের প্রতিটি কাজ পুর্ব থেকে পরিকল্পিত। আপনি শতভাগ পুর্বথেকেই পরিকল্পনা করতে পারবেন না। আজকের ব্রাক, আশা শুরুতেই এতটা গোছালো ছিল না। তারা কাজ করতে গিয়ে ঠেকতে ঠেকতে শিখেছে। আর প্রতিনিয়ত নিাজেদেরকে পরিবর্তন করেছে।
আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের দ্বীনি অঙ্গনে অনেক নতুন নতুন কাজ হাতে নেওয়া হয়, কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলো অনেকাংশেই টিকে না। যেমন দেখা গেলো, একটি মাসিক পত্রিকা বের করলো, একটি অনলাইন চালু করলো, কিছুদিন পর এগুলো হারিয়ে যায়। কেন হারিয়ে যায়? এর কারণ, পুর্ব থেকে এগুলো সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা হয় না। এর খরচ সম্পর্কে আইডিয়া না নিয়েই যেনতেন প্রকারে দুয়েক মাস চালানোর পর যখন দেখে কোন লাভ আসে না, তখন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কারা প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে?
যে কোন সরকারী কাজের আগে তার একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করা হয়। এছাড়া আমাদের দেশের প্রতিটি এনজিও’র প্রজেক্ট প্রোফাইল আছে। ছোট থেকে বড়। সবারই একটি করে প্রজেক্ট প্রোফাইল আছে। এদের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক লোক আছে যারা প্রজেক্ট তৈরি করে দেয়। এদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। অথবা নিজেদের মধ্যেই অনেকে আছে এক্সপার্ট্। তাদের দিয়েও প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করা যায়। অবশ্য এর জন্য প্রজেক্ট বিশেষে প্রচুর অর্থও অনেক সময় খরচ করতে হয়।

প্রজেক্ট প্রোফাইল কোথায় উপস্থাপন করবেন?
আজকাল অনেক মুসলিম দেশ আছে যারা দরিদ্র মুসলিম দেশে সাহায্য করে। তারমধ্যে তুরস্ক, কাতার, আরব আমিরাত অন্যতম। সৌদি আরবও একসময় প্রচুর অর্থ বিভিন্ন মুসলিম দেশে সাহায্য করেছে। যদিও সৌদি আরবের সাহায্য-সহযোগিতাসমূহ এতটা পরিকল্পিত ছিল না। কিন্তু কাতার, আরব আমিরাত,কুয়েত, তুরস্ক এদের প্রত্যেকের কাজ আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর। অনেক গোছানো। জবাবদিহিতামূলক। এই সমস্ত দেশের সাথে সম্পর্ক রাখে এমন অনেক ব্যক্তি তারা প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করে। তাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। দেশের ভেতরেও অনেক সম্পদশালি কোম্পানী আছে, তারাও তাদের মতো করে সাহায্য করে। তাদের কাছে যদি সুন্দর করে কোন কাজের প্রকল্প পরিকল্পনা পেশ করা যায়, তাহলেও কাজ করা সম্ভব। এছাড়া অনেক ইউরোপিয়ান দেশ আছে, যে সব দেশের মুসলিম কমিউনিটি দরিদ্র মুসলিম দেশে সাহায্য করে। তাদের কাছেও প্রজেক্ট প্রোফাইল উপস্থাপন করতে পারলে মোটা অংকের সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব। এসব কাজের জন্য আমাদেরকে বিশেষভাবে আরবি ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

তরুনদের প্রতি আমার্ আহবান :
আমি তরুন আলেমদেরকে আহবান করবো, কার কি কাজ চয়েজ? কীভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে, সেই আলোকে লোক খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদের দিয়ে প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করাতে হবে। এটা কাজে সফল হওয়ার সফল ও প্রাথমিক কার্যকরি ধাপ। এর জন্য সময় দিতে হবে। কিছু অর্থতো খরচ করতেই হবে। একসময় তা খুব সুন্দরভাবে ব্যাক করবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তায়ালা এদেশের আলেম সমাজকে জাতির খেদমতে আরো সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার তৌফিক দান করুন। সামাজিক খেদমত করার মাধ্যমে আলেম সমাজ এদেশের মানুষের আরো ঘনিষ্ট হতে পারবে। ড. ইউনুস সাহেব সামাজিক ব্যবসা করে পৃথিবীতে সুনাম কুড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। উলামায়ে কেরাম এরচেয়ে আরো কম পরিশ্রমেই তারা সামাজিক ব্যবসায় সফল হবেন ইনশাআল্লাহ। মানুষের কর্মের সংস্থান করা অন্যতম একটি সামাজিক ব্যবসা। এতে সফল হতে কুরআন ও সুন্নাহ আমাদেরকে অনেক বেশি সুন্দর সুন্দর দিক নিদের্শনা দিয়েছে।

27.06.2021