মহিলা মাদ্রাসায় সতর্কতা ও শিক্ষার বৈচিত্র কাম্য

img

বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতাকে সামনে রেখে এ কথা এখন স্বীকার করতেই হবে যে, মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে আমাদের অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কোন বিকল্প নেই। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক হলো নারী। তাদেরকে দ্বীনি শিক্ষাতো বটেই সাধারণ শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত করা উচিত নয়। তাদেরকে শিক্ষা থেকে দূরে রেখে কোনভাবেই দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট, বহুতল ভবন, প্রযুক্তির কথাই বলছি না, একটি সুন্দর সমাজ, একটি টেকসই পরিবার গঠন করতে হলেও মেয়েদের শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার কোন বিকল্প চিন্তা করতে পারি না। 

এটা খুব আশার কথা যে, বাংলাদেশে যে কোন কারণেই হোক মহিলা মাদ্রাসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। সারাদেশে বহুল পরিমাণে মহিলা মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। এটা একটি ইতিবাচক দিক। তবে, এইক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার বিপ্লব ঘটাতে গিয়ে নানামুখি ঘাটতি রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ছাত্রীদের পর্যাপ্ত আবাসন এর চিন্তা করা হয়নি। মেয়েদের নিরাপত্তা বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। একটি ইতিবাচক পরিবার গঠনে একটি শিক্ষিত মায়ের কী ভূমিকা হবে সেটার প্রতিও যথেষ্ট খেয়াল করা হয়নি। ফলে মহিলা মাদ্রাসা নিয়ে নানা কথা বিভিন্ন সময়ে এমনভাবে প্রকাশ পায় যেগুলো শুনলে আমরা মাঝে মাঝে আঁতকে উঠি। আর এগুলো আলেম-উলামাদের মান-মর্যাদার বিষয়েও বড় ধরণের ঝুঁকি তৈরি করেছে। 

কুরআন ও হাদীসে নারীদের প্রতি যে পরিমাণ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেভাবে নারী অধিকারের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে অসংখ্য আয়াত অবতীর্ণ করা হয়েছে, যেভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের মর্যাদাকে মুসলমানদের সামনে পরিস্কার ও পরিচ্ছন্নভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আজ আমরা খুব লজ্জার সাথে লক্ষ্য করছি, আজ বিশ্বে মুসলমানদেরকেই নারী অধিকার হরণকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, আমরা মুসলিম সমাজে নারীদের ভূমিকা অতীতে কীভাবে আদায় করা হয়েছে, ইসলাম এ ব্যাপারে কী সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছে, শুধু নির্দেশনাই নয়, একেবারে বাস্তবে নারীদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে কীভাবে বিশ্ববাসির সামনে মুসলিম নারীদের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছে, সেই জায়গাটায় আজ আমরা যথেষ্ট পরিমানে পিছিয়ে আছি। 

পবিত্র কুরআনে “সুরা নিসা” নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাই অবতীর্ণ করা হয়েছে নারীদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় নারীদের সম্মানের দিকটি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, আমরা মুসলমানরাই নারী অধিকারের প্রশ্নে হয় অতি সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে নারীদেরকে এক প্রকার কোণঠাসা করে রেখেছি, অথবা মুসলিম সমাজে নারীদেরকে চরম বে-পরোয়া পথে ঠেলে দিয়েছি। উভয় পদ্ধতিই ভুল। একদিকে চরম সঙ্কীর্ণতার পথ অবলম্বন করা হয়েছে, অন্যদিকে চরম ছাড় দেওয়া হয়েছে। নারীদের শারীরিক স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস বারবার সতর্ক করেছে। আর এ জন্যই কঠোর পর্দা প্রথা মেনে চলার জন্য ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। 

এবার আসুন, আমরা আমাদের মহিলা মাদ্রাসাগুলোর দিকে একটু খেয়াল করে দেখি। আসলে মাদ্রাসাগুলোর প্রতিষ্ঠা, খেদমত, ফলাফল কী? দেশে অল্পদিনে বিপুল পরিমাণে মহিলা মাদ্রাসা গড়ে উঠার পেছনে বড় ভূমিকা হলো, এ সেক্টরটি অল্পদিনে খুব ভালো একটি লাভজনক ক্ষেত্র হিসেবে আলেমদের সামনে এসেছে। যেমন, একটি বাসা-বাড়িতে মহিলা মাদ্রাসার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে, ছাত্রীদের যেভাবে ভর্তি করা হয়, সেখানে যে পরিমাণ-বেতন-ভাতা নেওয়া হয়, সেই পরিমাণ শিক্ষা সেবা দেয়া হয় না। অনেক মহিলা মাদ্রাসায় প্রিন্সিপ্যালের বাসা-বাড়ি ও মাদ্রাসার আলাদা অস্তিত্ব নেই। এই ক্ষেত্রে সতর্কতার যথেষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। মাঝে মাঝে অঘটনও ঘটে। নারী বিষয়টিই খুব স্পর্শকাতর জায়গা। তাদের লেখাপড়া করানো, তাদের খুব কাছাকাছি থেকে পুরুষদের অবস্থান প্রায়শই নিরাপদ থাকে না। এজন্য প্রয়োজন হলো, কোন মহিলা মাদ্রাসায় কোন হুজুরের বাসা থাকতে পারবে না। বাসা ও মাদ্রাসার সম্পুর্ণ আলাদা অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। মাদ্রাসার ছাত্রীদের দিয়ে হুজুরের পুরো ফ্যামিলির সেবা নেওয়ার যে অনাকাঙ্খিত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে এ থেকে যে কোন মূল্যে বের হয়ে আসতে হবে। এটা সম্ভব না হলে সেই মহিলা মাদ্রাসা অবশ্যই বন্ধ করে দিতে হবে।  

মহিলা মাদ্রাসার আরো একটি বড় সমস্যা হলো, মহিলা মাদ্রাসাগুলোতে তৃতীয় পক্ষের নেগরানির কোন সুযোগ রাখা হয়নি। অর্থাৎ একজন আলেম, তার বাসায়, তার মনমতো করে মহিলা মাদ্রাসার সাইনবোর্ড লাগিয়ে মাদ্রাসা চালাচ্ছে। সেখানে ঐ আলেমের অবস্থান, হিসাব-নিকাশ, লেখাপড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা, খাওয়া ও আবাসনের মান দেখার কোন সুযোগ রাখা হয়নি। অঘটন ঘটার এটাও একটি বড় কারণ। এ থেকে উত্তরণের জন্য অবশ্যই প্রতিটি মহিলা মাদ্রাসাকে  একটি শক্তিশালী কমিটির কাছে জবাবদিহি করার ব্যবস্থা করতে হবে। যোগ্য ও মেধাবী কোন প্রকার শিক্ষিকা না থাকা সত্বেও মেয়েদের বছরের পর বছর পাঠদান করা হচ্ছে। নামকাওয়াস্তে উপরের ক্লাশে  উত্তীর্ণ দেখানো হচ্ছে, এতে করে লেখাপড়ার বদনাম হচ্ছে। কোনরকম ভাবে মেয়েদের সময় পার করার একটি নিরাপদ জায়গা হিসেবে এগুলো অবতীর্ণ হচ্ছে। লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না করে বড় বড় মেয়েদের আশ্রয় দেওয়ায় সেই সকল মেয়েরাও নানা আপত্তিকর কাজের সাথে অনিচ্ছাতেই জড়িয়ে যাচ্ছে। 

মহিলা মাদ্রাসার ব্যাপারে দেশের সাধারণ আলেম-উলামা ও দ্বীনদার মানুষের একটি বড় অভিযোগ হলো, মাদ্রাসা পড়–য়া মেয়েদের মধ্যে বিবাহিত জীবনে পরিবারে শান্তি-শৃঙ্খলা আনয়নে বড় ধরণের ঘাটতি দেখা দেয়। এক ধরণের অসামাজিক মানসিকতা তাদের মধ্যে গড়ে উঠে। তারা সবার সাথে মিলে-মিশে চলতে পারে না। সামাজিক বাস্তবতা মেনে নিতে পারে না। যে কারণে অনেক পরিবারে মাদ্রাসার মেয়েদের বিবাহিত জীবন সুখকর হয় না। এ সমস্যা সমাধানের জন্যে মেয়েদের শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি। মেয়েদেরকে যেন-তেন প্রকারে দাওরায়ে হাদীস পাশ করিয়ে দেওয়ার মানসিকতা এক ধরণের আলেমদের মধ্যে দেখা যায়। ফরিদপুরে এক মাদ্রাসার কথা জানি, প্রিন্সিপ্যাল একাই ৪/৫জন দুর্বল স্টাফ নিয়ে দাওরায়ে হাদীস  মাদ্রাসা চালু রেখেছে। এটা কীভাবে সম্ভব? ৪/৫জন শিক্ষক নিয়েই দাওরায়ে হাদীস মাদ্রাসা খোলা, ছাত্রীদের পরীক্ষা দিয়ে পাশ করিয়ে দেওয়া, তাদের হাতে এম.এ এর সনদ ধরিয়ে দেওয়া এটা বড় ধরণের ইলমি খেয়ানত। এটা বাংলাদেশের অনেক জায়গার চিত্র। দাওরায়ে হাদীস মাদ্রাসার সাইনবোর্ড লাগিয়ে মূলত: মেয়েদেরকে আলেমাহ বানানোর ইচ্ছার চেয়ে ব্যবসায়িক চিন্তাই তাদের মধ্যে বেশি কাজ করে। 

একজন মেয়ে বিবাহিত জীবনে কীভাবে সংসার চালাবে, কীভাবে পরিবারের আর দশজনের সাথে উঠাবসা করবে, মুরুব্বিদের সাথে ব্যবহার করবে, ছোটদের সাথে মিলিয়ে চলবে এমন মেজাজ তৈরি করা হয় না। অথচ আমরা হাইস্কুলগুলোতে দেখি মেয়েদের জন্য গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইগুলো খুব গুরুত্বের সাথে পড়ানো হয়। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এসব বিষয় মাদ্রাসায় পড়ানো হয় না। মেয়েদেরকে যে কোন মূল্যে দাওরায়ে হাদীস পাশ করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা মেয়েদেরকে অহঙ্কারী করে তুলে। কেন সবাইকে কাগজপত্রের মুহাদ্দিস বানিয়ে দিতে হবে? কেন অধিকাংশ মেয়েকেই দাওরায়ে হাদীসের সনদ ধরিয়ে দিতে হবে? দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত যেতে যেসব মৌলিক কিতাবাদি পড়া একেবারেই জরুরি, তার কতটুকু পড়ানো হয়? একজন মেয়ে কীভাবে সংসার চালাবে, কীভাবে সামাজিক হবে তার জন্য কী কী কিতাব পড়ানো দরকার তার প্রতি কোন গুরুত্বই দেয়া হয়  না।

আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে মেয়েদের পড়ালেখা করানো আসলেই একটি কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আর এ কাজটি যদি উলামায়ে কেরাম করেন, তাহলে অধিকতর সতর্কতার কোন বিকল্প নেই। কারণ, শত্রুরা ওৎ পেতে আছে, কীভাবে সমাজের আলেম সমাজকে জনগণের সামনে বিতর্কিত করা যায়, আলেমদের চরিত্র নিয়ে ব্যঙ্গ-তামাশা করা যায়। এ অবস্থায় একটু অসতর্কতা গোটা আলেম সমাজের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। দেশের মহিলা মাদ্রাসাগুলোর ঢালাওভাবে একথা প্রযোজ্য না হলেও যেহেতু সাদা জামায় দাগটা বেশি দেখা যায়, সেহেতু কীভাবে ছোট-খাট সমস্যাও যাতে না হয়, তার প্রতি চূড়ান্ত পর্যায়ের দৃষ্টি রাখতে হবে। 

মেয়েদের দিয়ে কোন প্রকার ব্যক্তিগত সেবা নেওয়া, মেয়েদেরকে মোবাইল ব্যবহার করতে দেওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। বড় মেয়ে ও ছোট মেয়েদের মধ্যে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলার ব্যবস্থা করা। মেয়েদেরকে যেনতেন প্রকারে দাওরায়ে হাদীস পাশ না করিয়ে আনুষাঙ্গিক বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা বেশি  উপকারী হবে। যেমন  দুর্বল মেয়েদের সেলাই প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ভাষা প্রশিক্ষণ, হাতের লেখা সুন্দর ও হাতের কাজ শেখানো ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্তুর্ভক্ত করতে হবে। অলিতে-গলিতে মেয়েদের দাওরায়ে হাদীস মাদ্রাসা হাস্যকর পর্যায়ে চলে গেছে। এ প্রবণতা থেকে ফিরে আসতে হবে। যতদূর সম্ভব মেয়েদের আবাসিক না রাখা। একান্ত প্রয়োজন হলে, তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি, মান-সম্মত খাবার-দাবারের প্রতি যতœবান হতে হবে। অধিকাংশ মহিলা মাদ্রাসায় মেয়েদের খাবার-দাবারের কষ্ট দেওয়া হয়। তাদের খোরাকির টাকা দিয়ে নানা উন্নয়ন করা হয়। অথচ তাদেরকে মানসম্মত খাবার দেওয়া হয় না। এগুলো তদারক করারও কোন সুযোগ রাখা হয় না। 

সারাদেশে যে সকল আলেম-উলামা মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি তাদের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণিও উচ্চারণ করতে চাই, আপনাদের গাফলতির কারণে আলেমদের বড় ধরণের ক্ষতি হযে যেতে পারে। এজন্য মহিলা মাদ্রাসার বিষয়গুলো একেবারেই নিজের মতো না করে, উপযুক্ত কমিটি, বোর্ড, কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির আওতায় এনে এগুলো পরিচালনা করুন। এতে নিজের মান-সম্মানও ঠিক থাকবে। আর আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম সুন্দর মানসিকতা নিয়ে বড় হবে। আল্লাহ  তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। 

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট (বিআইএম)
২২.০৬.২০২১