আব্বাস সিদ্দিকী কেন এমন হারা হারলেন?

img

ভোটহীন দেশে বাস করে প্রতিবেশি একটি দেশের রাজ্যসভার নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ভালোই কৌতুহলী হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের দুইপাশের দুটি অঙ্গরাজ্যে মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে আমাদের আশা-এবং হতাশার যন্ত্রনা আরো বৃদ্ধি পেল। কাছাকাছি দুটি দেশ, প্রায় একই সংস্কৃতি, অথচ একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়ছিল রাজ্য ভিত্তিক দলগুলো। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেরা সর্বোচ্চশক্তি ব্যয় করে রাজ্য সরকারের পদ দখলের জন্য হেন কোন কৌশল নেই যা তারা প্রয়োগ করেনি। 

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ভেতর দিয়ে যে জিনিসটি আমাদের অবাক করেছে সেটা হলো, একটি ক্ষুদ্র রাজ্যে মাসব্যাপি ৮দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, একেক দফার ভোট শেষে ইভিএম এবং সীলমারা ভোট সব সীলগালা করে রাখা হলো, একমাস পর ভোট গননা হলো, কেউ সেই ভোট গণনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলো না, কেউ এই অভিযোগ করলো না যে, নির্বাচন কমিশন রাতের আধাঁরে ভোট পাল্টে দিয়েছে। অথচ আমাদের দেশে কী অবাক করা কান্ড ঘটে, কেউ নির্বাচন কমিশনের প্রতি সামান্য ভরসাও রাখে না। আস্থা রাখে না। আস্থা রাখার মতো সামান্য আচরণও আমাদের দেশের মেরুদন্ডহীন নির্বাচন কমিশন করতে পারেনি। এটাই হলো সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি বটে, স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে পারিনি। প্রশাসন বা রাষ্ট্রীয় কাটামো সেভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। 

দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে সেটা হলো, পশ্চিমবঙ্গের সর্বশেষ বিধান সভা নির্বাচনে হঠাৎ করেই আলোচনায় আসেন একজন ব্যক্তি। যিনি পীর হিসেবে খ্যাত। ঐ ব্যক্তির বড় অপরাধ মনে হয় এটাই যে, তিনি কোন সাধারণ মুসলমান না হয়ে পীর বংশের লোক হয়ে কেন নির্বাচনে এলেন। কেন তিনি রাজনীতিতে এলেন। পীর বংশের মানুষ পীরালি করবে, পেট বড় করবে, আরাম করা বালিশে ঘুমাবে, পকেট ভারি করবে, এটাই যেন চিরাচরিত দৃশ্য। তিনি কেন ব্যতিক্রম করতে গেলেন? তিনি বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। পশ্চিমবঙ্গেতো বটেই বাংলাদেশেও একটি রাজনৈতিক শ্রেনি আছে যারা পীর সাহেবদেরকে রাজনীতিতে দেখতে খুবেই অনাগ্রহী। পীর হয়ে আবার রাজনীতি করবেন এটা আবার কেমন কথা? এই হলো তাদের যুক্তি। কেউ কেউ মনে করেন, শুধূমাত্র সাংগঠনিক শক্তি থাকলেই রাজনীতিতে হওয়া যায়। আমি মনে করি, অনেক সময় ব্যক্তি ক্যারিশমাতেও সফলতার চূড়ান্তে পৌঁছা যায়। 

তো এই পর্যায়ে আমি আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক সফলতা ব্যর্থতা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। তার আগে, আমাদের দেশের একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্বাস সিদ্দিকীর এই পরাজয়কে কীভাবে মূল্যায়ণ করেছেন সেটা আমরা দেখে নিই। চ্যাঞ্জ টিভির একজন আলোচক, যিনি সবার কাছে আমিরুল হক মুমেনীন মানিক নামে পরিচিত, তিনি আব্বাস সিদ্দিকীর এই পরাজয়কে মূল্যায়ন করেছেন গো হারা হেরেছেন।পাশাপাশি তার পরাজয়ের পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন।  সেগুলো হলো : 
১। ফুরফুরা দরবার শরীফের যারা অনুসারী তারা শুধূই পীর ভক্ত থেকে গেলেন। তারা আব্বাস সিদ্দিকীকে রাজনৈতিকভাবে নেতা হিসেবে গ্রহন করতে পারেননি। 
২। আব্বাস সিদ্দীকিই যে বিজেপির বা তৃণমূলের বিকল্প সেটা প্রমাণ করতে পারেননি। কারণ অনেকেই তৃণমূলের কারণেই হোক বা বাস্তবতার কারণেই হোক না কেন মনে করতেন যে, আব্বাস সিদ্দিকী হচ্ছেন বিজেপিরই একজন সহযোগী যাকে খুব সহজেই তৃণমূল যাতে হেরে যায় সে জন্য  তিনি বিজেপির ক্রীড়নক হয়ে কাজ করছেন এটি আসলে তার জন্য আত্মঘাতি হয়েছে। এই তকমাটি থেকে বের হতে পারেননি আব্বাস সিদ্দিকী। ফলে তাকে অনেকেই বিজেপির সহযোগি মনে করায় মুসলিম যে ভোটব্যাংক সেটি তার পক্ষে যায়নি।  
৩। আর সর্বশেষ যে কারণটি তিনি বলেন সেটা হলো, কিছুদিন আগেও আব্বাস সিদ্দিকী ওয়াজ মাহফিলে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করতেন, ইসলামের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়ে ইসলামী শাসন-অনুশাসন এর কথা বলতেন, হঠাৎ করে তিনি ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট তথা আইএসএফ গঠন করে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের কথা প্রচার করতে লাগলেন। এই যে বিরোধপূর্ণ জায়গা, সেই জায়গাটায় মানুষ আসলে সন্তোষ ছিলেন না। মূলত: এই তিনটি কারণে আব্বাস সিদ্দিকীর ভরাডুবি হয়েছে। তিনি কিংমেকার হতে তো পারেইনি, তিনি তার শক্তিমত্তাও দেখাতে পারেননি, তিনি যে জনবল দেখিয়েছিলেন বিগ্রেডে, সমাবেশে সেটা যে কেবলমাত্রই আওয়াজ ছিল সেটা নির্বাচনের পর প্রমাণিত হয়েছে।

আমি আমিরুল হক মুমেনীন মানিক এর এই তিনটি কারণের সাথেই একমত না। পাশাপাশি তিনি যে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করেছেন সেটার প্রতিও আমার আপত্তি আছে। এই যে গো হারা, ক্রীড়নক, ভক্ত হলেই মানুষ পীরকে ভোট দেয় না, নেতা মানে না, এগুলো বলে তিনি এক ধরণের আদর্শিক উন্নাসিকতা প্রকাশ করেছেন। আমি বলবো, আব্বাস সিদ্দিকী মূলত: পরাজিত হননি। তিনি রাজনীতিতে যে ঝড় তুলেছিলেন সেটাতে সফল না হওয়ার অন্য কারণ রয়েছে। আমরা যদি ভোটের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, তিনি তিনমাস বয়সী একটি দল করে, ২৭টি আসনে নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে মোট ভোট পেয়েছেন, ৭লাখ ৮৯হাজার ১শত ৭৫টি। ভাঙ্গরের মতো একটি আলোচিত আসনে জীবনের প্রথম নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ছোট ভাই নওশাদ সিদ্দিকীকে ২৬হাজারের অধিক ভোটে বিজয়ী করতে সক্ষম হয়েছেন। মিডিয়া এবং জনজীবনে প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। আব্বাস সিদ্দিকী গো হারা হারেনি, হেরেছে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস। 
রাজনীতিতে রাজনৈতিক সফলতা বলতে আমি শুধু আসন প্রাপ্তিকেই হিসাব করবো না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ম্যাকানিজমে আব্বাস সিদ্দিকী একজন পীর হওয়ার কারণেই মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে বিষয়টি কোনভাবেই এমন নয়। তিনি রাজনৈতিক ময়দান এবং ফুরফুরা দরবারকে যথেষ্ট দক্ষতার সাথে ভিন্ন রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এটা করা ছাড়া তার আর কোন উপায়ওছিল না। ঐটা বাংলাদেশ না। ওটা পশ্চিমবঙ্গ। সেখানের মানুষের মন-মেজাজ কতটা ইসলামী ভাবাদর্শ বিরোধী সেটা ৪৭এর দেশ বিভাগের বিষয়টি মাথায় রাখলেই মানিক সাহেব সেক্যুলার চিন্তা-চেতনার কারণেই তিনি হেরেছেন এ কথা বলতেন না।  তার প্রতিটি সমাবেশে তরুনদের যে ব্যাপক উপস্থিতি ছিল সেটা কোনভাবেই শুধু ফুরফুরা দরবার শরীফকেন্দ্রিক ছিল না। এখানেই তার সফলতা। একজন উদীয়মান রাজনীতিক হিসেবে তিনি খুব দক্ষতার সাথে দরবার এবং রাজনীতিকে আলাদা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত তার পক্ষের অনুসারীরা তাকে কোনভাবেই ত্যাগ করেনি। তার অনুসারীরা তাকে ছুঁড়ে মারেনি। আব্বাস সিদ্দিকী হেরেছে ইজমের জোয়ারে।

আমি মনে করি, আব্বাস সিদ্দিকীতো সামান্য বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছেন,  পশ্চিমবঙ্গে ৩৪বছর ক্ষমতায় থাকা সিপিএম যে একটা আসনও পেলো না? জাতীয় কংগ্রেস ১০বছর রাজ্য সরকার চালিয়েছে সেই কংগ্রেস যে একটা আসনও পেলো না? মানুষ তাদেরকে কেন প্রত্যাখ্যান করলো? এটা কি কখনো কল্পনা করা গেছে যে, কংগ্রেস এবং সিপিএম একেবারে শুন্য আসনে হারবে? সুতরাং এই হারার পেছনে অন্য কারণ কাজ করছে। যেটা বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে হয়তো মিলবে না।

আমার দৃষ্টিতে আব্বাস সিদ্দিকীর কাঙ্খিত ফলাফল করতে না পারার পেছনে যে রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি কাজ করেছে বলে মনে হয় সেগুলো হলো : 
১। ক্ষমতার সামনে হেরে যাওয়া : ভারতের দুটি ক্ষমতাসীন প্রধান শক্তির সামনে আব্বাস সিদ্দিকীর মতো একজন নবীন রাজনীতিকের সফল না হওয়ার পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করেছে অপর দিকে ১০বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতা ধরে রাখার দৃঢ়তার সামনে অসহায় হয়ে যেতে হয়েছে আব্বাস সিদ্দিকীকে। 

২। বিপুল অর্থের কাছে হেরে যাওয়া : ক্ষমতা ধরে রাখা এবং কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা দুটি দলের সকল নেতাকর্মীদের কাছে বিপুল পরিমান অর্থ পুঞ্জিভূত। এই পুঞ্জিভূত অর্থের সামনে দুর্বল বামফ্রন্ট এবং আব্বাস সিদ্দিকীদের আবেগ কোন মূল্য ধরে রাখতে পারেনি। যেটা অসমে পেরেছে। সেখানে বদরুদ্দিন আজমল একজন ধনকুবের। নির্বাচনী ডামাঢোল পাড়ি দেওয়ার জন্য আজমল পরিবারের যে সামর্থ আছে সেটা আব্বাস সিদ্দিকীর কিছুই নেই। উপরুন্ত নিজ পরিবার থেকেই প্রচন্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন আব্বাস সিদ্দিকী। 

৩। ইজমের কাছে হেরে যাওয়া :  আব্বাস সিদ্দিকী যতই নিজেকে একজন সেক্যুলার হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করুন না কেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অন্তরে এক ধরণের মুসলিম বিদ্বেষ চরমভাবে বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর ভারতের আর দশটা রাজ্যের হিন্দুত্ববাদি শক্তি এক নয়। বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের এলিট শ্রেণির হিন্দুদের রয়েছে চরম ঘৃণা। সেই ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে আববাস সিদ্দিকীর ওপর। সাধারণ এবং তরুন প্রজন্মের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আব্বাস সিদ্দিকীকে যতই গ্রহন করুক, যতই তাকে তারা ভাইজান হিসেবে চিহ্নিত করুক, উচ্চবর্ণের লোকদের কাছে আব্বাস সিদ্দিকী একটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল। 

৪। নির্বাচনী রাজনীতির কূটচাল সম্পর্কে  অনভিজ্ঞতা :   আব্বাস সিদ্দিকীর সকল প্রার্থীই ছিল একেবারেই নবীন। তার ভাই নওশাদ সিদ্দিকী যে কি না বিধায়ক হিসেবে পাশ করেছে সে অতীতে কোন নির্বাচনই করেনি। পীরজাদা বায়েজীদ আমীন প্রমুখ ছিল একেবারেই নবীন। নির্বাচনী গেইম সম্পর্কে তাদের কোন পূর্ব ধারণাই নেই। এছাড়া প্রার্থী সিলেকশন, দলের নাম নিয়ে জটিলতা, প্রতীক বরাদ্দ পেতে বিলম্ব, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তার প্রতি চরম অনিহা প্রদর্শন ইত্যাদি কারণই ছিল আব্বাস সিদ্দিকীর এই নির্বাচনে ভালো ফলাফল না করার অন্যতম কারণ। 

ভক্তরা তাকে ভোট দেয়নি এ কথা একদমই বিশ্বাস করতে পারছি না। পীর হলেই মানুষ নেতাকে ভোট দেয় না, এ মানসিকতাটাও আমার কাছে সঠিক মনে হয় না। সোস্যাল মিডিয়ায় তার ব্যাপক উপস্থিতির কারণে তরুন প্রজন্মের কাছে তার  গ্রহনযোগ্যতা থাকলেও গণমানুষ এবং সুশীল সমাজের কাছে তিনি এখনো গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করে উঠতে পারেননি এটা সত্য। 

সর্বেোপরি বিজেপি ঠেকাও এই গণ আওয়াজ সংযুক্তমোর্চাকে একেবারে কুপোকাত করে দিয়েছে। এইক্ষেত্রে শুধু এককভাবে আব্বাস সিদ্দিকীর এটা ব্যর্থতা নয়। আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গেও একজন মুসলিম তরুন নেতার আবির্ভাব ঘটলো যেটা ভবিষ্যতে হয়তো অনেকটা কাজে লাগবে। আগামীতে আব্বাস সিদ্দিকী রাজনীতিতে থাকলে বড় ধরণের ফ্যাক্টর হয়ে উঠবেন সেই ব্যাপারে আমি প্রচন্ড আশাবাদি। নতুন হিসেবে তারও অসংখ্য ভুল আছে। থাকতেই পারে। তবে তাকে আমি ব্যর্থ  বলবো না। আমি আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক জ্ঞানকে শ্রদ্ধা জানাই। 

05.05.2021