রমাদান শ্রেষ্ঠতম মাস

img

রমাদান শ্রেষ্ঠতম মাস। আরবি বারো মাসের মধ্যে রমাদান নবম মাস। বছরের বাকি এগারো মাসের তুলনায় এ মাসটির ফযিলত ও বরকত অনেক বেশি। কেননা রমাদান হলো সিয়াম পালনের মাস, পবিত্র কুরআন নাযিলের মাস, কুরআন তিলাওয়াতের মাস, তারাবীর সালাত আদায়ের মাস, লাইলাতুল কদরের মাস, ইতিকাফের মাস, দান-খয়রাতের মাস, ইবাদত-বন্দেগির মাস, সওয়াব ও নেকি অর্জনের মাস। রমাদান বদর যুদ্ধের মাস, ত্যাগ-তিতিক্ষার মাস, সংযম, সমবেদনা ও সহমর্মিতার মাস। রমাদান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। রমাদান জান্নাত লাভের মাস ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস। রমাদান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস। বলতে গেলে রমাদান আরো বহু গুণে  গুণান্বিত একটি মাস। যে সকল গুণাবলী রমাদান মাসকে শ্রেষ্ঠতম মাসে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১. কুরআনে রমাদান মাসের নাম উল্লেখ আছে 
বছরে বারোটি মাস। কিন্তু আলকুরআনে রমাদান ছাড়া অন্য কোন মাসের নাম উল্লেখ করা হয়নি। শুধুমাত্র রমাদান মাসের নাম উল্লেখ রয়েছে। কুরআনের বাণী, ‘রমাদান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে।’ [সূরা বাকারা : ১৮৫]
২. রমাদান কুরআন নাযিলের মাস
আলকুরআন হলো, পবিত্র  আত্মা জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর সর্বশেষ কিতাব। এটি ইসলামী জীবনদর্শনের মূল উৎস। এতে আছে মানুষের জীবন চলার যাবতীয় প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি, নির্দেশনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৌলিক তথ্য। কুরআন মানবরচিত কোনো গ্রন্থ নয়। তার রচয়িতা ও রূপকার গোটা বিশ্ব জাহানের অধিপতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে নবুওয়্যাতের সুদীর্ঘ তেইশ বছরে ইহা নাযিল হয়। আলকুরআন মানুষের জীবনে পরম শান্তি ও শৃঙ্খলা এবং পরলৌকিক জীবনে মুক্তির সন্ধান দেয়। ইহা বিশ্ব মানবতার জন্য শাশ্বত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। আর এ কুরআন রমাদান মাসে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা‘আলার বাণী, ‘রমাদান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ [সূরা বাকারা : ১৮৫] 
৩. রমাদান আল্লাহর মাস
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “শা’বান আমার মাস, আর রমাদান হলো আল্লাহর মাস’ (মা’সাবাতা বিস্সুন্নাহ)। রমাদান মাসে সিয়াম পালন করলে আল্লাহ তা‘আলা প্রতিদান ঘোষণা করেছেন এভাবে : ‘মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, কিন্তু সিয়ামের ব্যাপারটা ভিন্ন। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্যই নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।’ [সহীহ মুসলিম : ১১৫১]
৪. রমাদান সিয়াম পালনের মাস
ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি রুকন হল সিয়াম। আর রমাদান মাসে সিয়াম পালন করা ফরয। সেজন্য রমাদান মাসের প্রধান আমল হলো সুন্নাহ মোতাবেক সিয়াম পালন করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে।’’ [সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৫]
৫. রমাদান কুরআন তিলাওয়াতের মাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাদান ব্যতীত কোন মাসে এত বেশি তিলাওয়াত করতেন না। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘‘রমাদান ব্যতীত অন্য কোনো রাত্রিতে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করতে, কিংবা ভোর অবধি সালাতে কাটিয়ে দিতে অথবা পূর্ণ মাস সিয়াম পালন করে কাটিয়ে দিতে দেখি নি।’’ [সহীহ মুসলিম : ১৭৭৩]
৬. রমাদান কুরআন খতমের মাস  
রমাদানে যেহেতু প্রতিটি ইবাদাতের সাওয়াব ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাই এ মাসে যথাসাধ্য বেশি বেশি কুরআন কুরআন খতম করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ‘সিয়াম ও কুরআন কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য সুপারিশ করবে...।’ [আহমাদ : ৬৬২৬]
৭. রমাদান সালাতুত তারাবীহ পড়ার মাস
সালাতুত তারাবীহ পড়া এ মাসের অন্যতম আমল। তারাবীহ পড়ার সময় তার হক আদায় করতে হবে। হাদীসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমাদানে কিয়ামু রমাদান (সালাতুত তারাবীহ) আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে’ [সহীহ আল-বুখারী : ২০০৯]
 তারাবীহ এর সালাত তার হক আদায় করে অর্থাৎ ধীরস্থীরভাবে আদায় করতে হবে। তারাবীহ জামায়াতের সাথে আদায় করা সুন্নাহ এর অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে আছে, ‘যে ব্যক্তি ইমামের সাথে প্রস্থান করা অবধি সালাত আদায় করবে (সালাতুত তারাবীহ) তাকে পুরো রাত কিয়ামুল লাইলের সাওয়াব দান করা হবে।’’ [সুনান আবূ দাউদ : ১৩৭৭]
৮. রমাদান সাহরী খাওয়ার মাস
সাহরী খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে এবং সিয়াম পালনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাদীসে এসেছে, ‘‘সাহরী হল বরকতময় খাবার। তাই কখনো সাহরী খাওয়া বাদ দিয়ো না। এক ঢোক পানি পান করে হলেও সাহরী খেয়ে নাও। কেননা সাহরীর খাবার গ্রহণকারীকে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর ফেরেশতারা স্মরণ করে থাকেন।’’ [মুসনাদ আহমাদ : ১১১০১]
৯. রমাদান ইফতার করার মাস
সময় হওয়ার সাথে সাথে ইফতার করা বিরাট ফজিলাতপূর্ণ আমল। কোন বিলম্ব না করা । কেননা হাদীসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে, খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি হলো অধিক পবিত্র। ’’ [সুনান আবু দাউদ : ২৩৫৭]
১০. রমাদান ইফতার করানোর মাস
অপরকে ইফতার করানো একটি বিরাট সাওয়াবের কাজ। প্রতিদিন কমপক্ষে একজনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করা দরকার। কেননা হাদীসে এসেছে, ‘‘যে ব্যক্তি কোন সিয়ামপালনকারীকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে, তাদের উভয়ের সাওয়াব হতে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।’’ [সুনান ইবন মাজাহ : ১৭৪৬]
১১.  রমাদান রহমতের মাস
মুমিনদের জন্য অধিকতর রহমত ও আমলের মাস হলো রমাদান। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘রমাদান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়।” [সহীহ মুসলিম : ২৫৪৮]
১২. রমাদান মাগফিরাতের মাস 
আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, “পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুম্মা থেকে আরেক জুম্মা এবং এক রমাদান থেকে আরেক রমাদান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহকে মুছে দেয় যদি সে কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।” [সহীহ মুসলিম : ৮৯৬৬]
১৩. রমাদান নাজাতের মাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ইখলাস নিয়ে অর্থাৎ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার জন্য রমাদানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ [সহীহ বুখারী : ২০১৪]
১৪. রমাদান শয়তানকে বেড়ি পড়ানোর মাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘রমাদান-বরকতময় মাস তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস সিয়াম পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। দুষ্ট শয়তানদের এ মাসে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেয়া হয়। এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল, সে বঞ্চিত হল (মহা কল্যাণ হতে)।’’ [সুনান আত-তিরমিযি : ৬৮৩]
১৫. রমাদান ইবাদাতের সওয়াব বহুগুণ বাড়ানোর মাস
অন্যান্য মাসের তুলনায় রমাদান মাসের ইবাদাতের সওয়াব অনেক বেশি। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি এ মাসে নফল ইবাদাত করলো, সে যেন অন্য মাসের ফরয ইবাদাত পালন করলো। আর যে এ মাসে একটি ফরয পালন করলো, সে যেন অন্য মাসের ৭০টি ফরয ইবাদাত করলো’। অর্থাৎ- অন্য মাসে একটি ফরয ইবাদাতে যে সওয়াব, এ মাসে তা নফল দ্বারাই পাওয়া যায়। আর অন্য মাসের ৭০টি ফরযের সওয়াব এ মাসের একটি ফরয দ্বারা অর্জন করা যায়।’ [বায়হাকি শুয়াবুল ঈমান]
১৬. রমাদান জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা রমাদান মাসের প্রত্যেক দিবস ও রজনীতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। আর প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে  দু‘আ অবশ্যই কবুল করেন।’ [মুসনাদে আহমদ, হাদীস-৭৪৫০, মুসনাদে বাযযার, হাদীস ৯৬২]
১৭. রমাদান জান্নাতগুলোর দরজা খোলা ও জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধের মাস
আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,  “রমাদান মাসের শুভাগমন উপলক্ষে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।” [সহীহ বুখারী, হাদীস -১৮৯৮ (১/২৫৫), সহীহ মুসলিম, হাদীস, ১০৭৯ (১/৩৪৬) ]
১৮. রমাদান লাইলাতুল কদরের মাস
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে মুসলিম উম্মাহর জন্য রমাদান মাসে আরেকটি বিশেষ দান হলো, এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রজনী লাইলাতুল কদর। এই রজনী এত মর্যাদাপূর্ণ যে, এক হাজার মাস ইবাদাত করলেও যে সওয়াব হতে পারে, লাইলাতুল কদরের ইবাদাতে তার চেয়ে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। তাই এই রাতের কল্যাণ হতে বঞ্চিত হওয়া চরম দূর্ভাগ্যের বিষয়। আল্লাহ তা’আলা এ রাত সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, ‘‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’’ [সূরা কদর : ৪]
১৯. রমাদান ইতিকাফ করার মাস
ই‘তিকাফ অর্থ অবস্থান করা। অর্থাৎ মানুষদের থেকে পৃথক হয়ে সালাত, সিয়াম, কুরআন তিলাওয়াত, দু‘আ, ইসতিগফার ও অন্যান্য ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার সান্নিধ্যে একাকী কিছু সময় যাপন করা। এ ইবাদাতের এত মর্যাদা যে, প্রত্যেক রমাদানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাদানের শেষ দশ দিন নিজে এবং তাঁর সাহাবীগণ ই‘তিকাফ করতেন। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ‘‘প্রত্যেক রমাদানেই তিনি শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ করতেন। কিন্তু জীবনের শেষ রমাদানে তিনি ইতিকাফ করেছিলেন বিশ দিন।’’ [সহীহ আলবুখারী : ২০৪৪]
২০. রমাদান মাসে উমরা আদায় করা হাজ্জ করার সমতুল্য
রমাদান মাসে একটি উমরা করলে একটি হাজ্জ আদায়ের সমান সাওয়াব হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রমাদান মাসে উমরা করা আমার সাথে হাজ্জ আদায় করার সমতুল্য।’ [সহীহ আলবুখারী : ১৮৬৩]
২১. রমাদানে সিয়াম পালন বছরের দশমাস সিয়াম পালন তুল্য
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমাদান মাসে সিয়াম পালন করল- রমাদানের এক মাস সিয়াম পালন দশ মাস সিয়াম পালনের সমতুল্য। আর ঈদুল ফিতরের পর (শাওয়াল মাসের) ছয় দিন সিয়াম পালন যেন গোটা বছরের সিয়াম পালন হয়ে গেল।” [আহমাদ : ২১৯০৬]
২২.  রমাদান ফিতরা আদায়ের মাস 
এ মাসে সিয়ামের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে ফিতরাহ দেয়া আবশ্যক। ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের সালাত আদায়ের পুর্বে ফিতরাহ আদায় করার আদেশ দিলেন।’’ [সহীহ আল-বুখারী : ১৫০৩]
২৩. রমাদান  দান-খয়রাতের মাস
এ মাসে বেশি বেশি দান-সাদাকাহ করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। ইয়াতীম, বিধবা ও গরীব মিসকীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ও বেশি বেশি দান খয়রাত করা। হিসাব করে এ মাসে যাকাত দেয়া উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসে বেশি বেশি দান খয়রাত করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিঅল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমাদানে তাঁর এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত।’’ [সহীহ আল-বুখারী : ১৯০২]
২৪. রমাদান তাকওয়া অর্জনের মাস
তাকওয়া এমন একটি গুণ, যা বান্দাহকে আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় পাপকাজ থেকে বিরত রাখে এবং তাঁর আদেশ মানতে বাধ্য করে। আর রমাদান মাস তাকওয়া নামক গুণটি অর্জন করার এক বিশেষ মৌসুম। কুরআনে এসেছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে করে তোমরা এর মাধ্যমে তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।’’ [সূরা আলবাকারাহ : ১৮৩]
২৫. রমাদান দু‘আ কবুলের মাস
রমাদান মাসে দু‘আ কবুল করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘রমাদান মাসে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর সমীপে যে দু‘আ করে থাকে, তা কবুল করা হয়।’ [মুসনাদ আহমাদ : ২/২৫৪]
২৬. রমাদান রাইয়ান নামক জান্নাত লাভের মাস
রমাদানের সিয়ামপালনকারীর আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, জান্নাতের রাইয়ান নামক দরজাটি তাদের জন্য নির্দিষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বেহেশতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। কিয়ামতের দিন এটি দিয়ে সিয়ামপালনকারীরা প্রবেশ করবে। সিয়ামপালনকারী ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (কিয়ামতের দিন সিয়ামপালনকারীকে ডেকে) বলা হবে, সিয়ামপালনকারীরা কোথায়? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা ছাড়া আর একজন লোকও সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাদের প্রবেশের পরই তা বন্ধ করে দেয়া হবে, যাতে ওই দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে না পারে।’ [রোখারি : ১৭৬১] 
২৭. রমাদান ধৈর্য ও সবরের মাস
রমাদানে ঈমানদার ব্যক্তিরা খাওয়া দাওয়া, বিয়ে-শাদি ও অন্য সব আচার-আচরণে ধৈর্য ও সবরের এত বেশি অনুশীলন করেন, তা অন্য কোনো মাসে বা অন্য কোনো পর্বে করেন না। এমনিভাবে  সিয়াম পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেওয়া হয়, তা অন্য কোনো ইবাদতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, ‘‘ধৈর্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেওয়া হবে।’’ [সূরা জুমার : ১০]
২৮. রমাদান বদর যুদ্ধের মাস 
আল্লাহর মুমিন বান্দাদের কাছে রমাদান বিজয়ের মাস। দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ রমাদান মুসলমানরা মদিনার দক্ষিণে বদরের প্রান্তরে প্রথম যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এবং তার সাহাবিরা মক্কার কাফিরদের দীর্ঘ ১৩ বছরের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পেতে মদিনায় হিজরত করার পর প্রায় নয়টি রমাদান পেয়েছিলেন। মদিনায় হিজরত করার দুই বছরের মাথায় কাফিরদের সঙ্গে রমাদান মাসে যে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়, তা হচ্ছে বদর যুদ্ধ। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৬২৪ সালে। এ যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম মুজাহিদ মক্কার এক হাজার কাফির সেনার মোকাবেলায় মহান আল্লাহর সরাসরি মদদে বিজয় লাভ করে। বদরযুদ্ধে আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ মোট ৭০ জন কাফির নিহত হয়। আরো ৭০ জন কাফির মুজাহিদদের হাতে বন্দি হয়। অন্যদিকে ১৪ জন মুসলিম মুজাহিদ বীরবিক্রমে লড়াই করে শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন। বন্দিদের সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এর ক্ষমাসুলভ আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তী সময় অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
২৯.  রমাদান মক্কা বিজয়ের মাস
অষ্টম হিজরীর ২০ বা ২১ রমাদান জুমাবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম মক্কা বিজয় করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলেননি। তিনি এ মর্মে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এক. যারা আপন ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকবে তারা নিরাপদ। দুই. যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে তারাও নিরাপদ। তিন. যারা কাবাগৃহে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ।
মক্কা বিজয়ের এই ঘটনার সঙ্গে আধুনিককালের কোনো রাজ্যজয়ের ঘটনা তুলনা করলেই ইসলাম ও জাহিলিয়াতের পার্থক্যটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। জাহিলিয়াতের ঝা-াবাহীরা বিজয়কে মনে করে নিজেদেরই কৃতিত্বের ফসল। তাই বিজয় উৎসবের নামে তারা প্রকাশ করে দানবীয় উল্লাস। আর সে উল্লাসের শিকার হয় অসহায় ও নিরস্ত্র মানুষ।
৩০. রমাদান তাবুক যুদ্ধের মাস
নবম হিজরীর রজব মাসে তাবুক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় নবম হিজরীর রমাদান মাসে। [আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিণল্লাতুহু : ৩/১৬২৭]
তাবুক মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম। মদিনা থেকে এটি ৬৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এ যুদ্ধ ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে আরবের কাফির ও মুনাফিকদের শেষ চেষ্টা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি রোমান ও আরবের কাফিরদের সমন্বয়ে ঘটিত যৌথ বাহিনীর রণপ্রস্তুতিই এ যুদ্ধের মূল কারণ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  মক্কা বিজয় ও হুনায়েনের যুদ্ধ শেষে যখন মদিনায় ফিরে এলেন, এর কিছুদিন পর সিরিয়া থেকে ফিরে আসা কিছু বণিকদলের কাছ থেকে খবর পেলেন, রোম স¤্রাট হিরাক্লিয়াস মদিনা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে সিরিয়া ও আরব সীমান্তে তারা এক বিশাল বাহিনী মোতায়েন করছে। রোম ছিল তৎকালীন দুনিয়ার বৃহৎ শক্তি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  ফয়সালা করেন, হিরাক্লিয়াসের আক্রমণের অপেক্ষা না করে মুসলমানরা নিজেরাই আগে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। তিনি মদিনার সব মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরিক হওয়ার নির্দেশ দিলেন। পরে রোমানরা মুসলমানদের ভয়ে যুদ্ধ না করেই পলায়ন করেছে।
৩১.  রমাদান কাদেসিয়া যুদ্ধের মাস
কাদেসিয়া যুদ্ধ ১৫ হিজরী সনের রমাদান মাসে সংঘটিত হয়। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাছ রাদিআল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে মুসলমান ও রস্তুম ফাররাখজাদের নেতৃত্বে পারসিকদের মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তবে ইবনে কাছির রহমাতুল্লাহ আলাইহি তারিখ উল্লেখ ছাড়াই বলেছেন, এটি ১৪ হিজরী সনে হয়েছিল। [আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৯/৬১৩]
এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য ছিল সর্বসাকল্যে ৩৬ হাজার বা তার চেয়ে কিছু বেশি। আর কাফিরদের সৈন্য ছিল দুই লাখ। চার দিন ও তিন রাত প্রচ- যুদ্ধ চলার পর কাদেসিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। মাত্র ৩৬ হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ সুসজ্জিত পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে। এ যুদ্ধের ফলে ওই অঞ্চল ইরাকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং সেখানে ইসলামের প্রচার-প্রসারের সব বাধা দূরীভূত হয়। যুদ্ধের পর চার হাজার পারসিক সৈন্য সরাসরি ইসলাম গ্রহণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন গোত্র ও ইরাকে বসবাসরত ধর্মযাজক দলে দলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাছ রাদিআল্লাহু আনহুর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়।
৩২. রমাদান মূর্তি অপসারণের মাস
রমাদান মাসে মক্কা বিজয় হয়। আর মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবাঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম সেখানে রাখা মূর্তি বাইরে ছুড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তখন কাবাগৃহে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অষ্টম হিজরীর ২৫ রমাদান খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিআল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে একদল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন নাখলা নামক জায়গার একটি বৃহদাকার মূর্তি অপসারণের জন্য, কাফিররা এর পূজা করত, যার নাম ছিল উজ্জা। খালেদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিআল্লাহু আনহু নিজ হাতে ওই মূর্তি অপসারণ করেন। এরপর তিনি বলেন, আর কখনো এখানে উজ্জার উপাসনা হবে না। [আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৪/৩১৬]
নবম হিজরীর রমাদান মাসে তায়েফের সাকিফ গোত্র স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং তারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের উপাস্য ‘লাত’ নামক মূর্তি অপসারণ করে। [আলবিদায়াহ ওয়াননিহায়াহ : ৫/৩১৬]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমার উম্মত যদি মাহে রমাদানের গুরুত্ব বুঝত, তাহলে সারা বছর রমাদান কামনা করত।’ [মাজমাউজ যাওয়ায়েদ-৩য় খ- পৃষ্ঠা ১৪১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে থেকেই রমাদান মাসের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতেন এবং রজব মাসের চাঁদ দেখে মাহে রমাদান প্রাপ্তির আশায় বিভোর থাকতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবেগভরে পরম করুণাময়ের দরবারে প্রার্থনা করতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি রজব ও শাবানের মধ্যে আমাদের জন্য বরকত দান করুন এবং আমাদের রমাদান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ [মুসনাদে আহমাদ  : ২৩৪৬]
প্রকৃতপক্ষে মাহে রমাদান মুসলমানদের জন্য একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ কোর্স, যার মাধ্যমে সিয়ামপালনকারীর জীবন প্রভাবিত হয়। মাহে রমাদানের অসীম কল্যাণ ও বরকত লাভের প্রত্যাশার জন্য আগে থেকে সবার দৈহিক ও মানসিকভাবে ইবাদাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। মাহে রমাদানের পবিত্রতা রক্ষার্থে মাসব্যাপী ইবাদাত-বন্দেগি তথা সেহরি, ইফতার, তারাবি, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, ইতিকাফ, তাহাজ্জুদ, দান-সাদকা, তওবা-ইস্তেগফার প্রভৃতি আদায়ের সামগ্রিক প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।


লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক