পরিবার ও সমাজ বিনির্মাণে নারীর অবদান

img

মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই নারী-পুরুষের অবস্থান। সভ্যতা বিকাশে নারীর ভূমিকা অপরিসীম। এই পৃথিবীতে পারিবারিক বন্ধন, বংশবৃদ্ধির ক্রমধারা অব্যাহত রাখা, মানবীয় গুণাবলির সম্মিলন ঘটানো, সর্বোপরি জীবনকে সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ রূপে গড়ে তোলার ব্যাপারে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে। নর-নারীর মাধ্যমে যে মানবসভ্যতার সূচনা, তা আজ প্রায় সাড়ে সাত শ কোটিতে রূপান্তরিত হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। নারী পরিবার, সমাজ, দেশ কিংবা আন্ত রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

নারীরা হলেন ইসলামী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মৌল। কারণ, তাদের ওপরই ন্যস্ত আগামী প্রজন্মের আবেগ-অনুভূতি এবং চিন্তা- চেতনাকে সুস্থ ও অমলিন রাখার দায়িত্ব। প্রবৃত্তি তথা রিপুর তাড়না ও অধোমুখী পাশবিক আচরণের দূষণ থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার সুকঠিন যিম্মাদারিও অর্পণ করা হয়েছে তাদের ওপর। এভাবেই নারীরা অবদান রাখেন সমাজকে পবিত্র করতে এবং এর প্রকৃত সম্পদ ও মর্যাদা অটুট ও অক্ষুণœ রাখতে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই, যত নবী-রাসূল (সা.) এসেছেন, সকলের সহযোগিতায় প্রতিটি কওম থেকে এগিয়ে এসেছিলেন কিছু মহিয়সী নারী। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা, ত্যাগ-কুরবানী এ ইসলামী জমিনকে উর্বর করতে সাহায্য করেছিল। সেই সাথে তাদের অনন্য সাধারণ মানবিক গুণাবলীও যুগে যুগে মুমিন নারীদের অনুপ্রেরণার উৎস।

ইবরাহীম (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে স্ত্রী হাজেরা ও তার শিশুপুত্র ইসমাঈলকে সহ জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে আসলেন, তখন ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে স্ত্রী হাজেরা সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহ প্রদত্ত এ ফয়সালা মেনে নিলেন। হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কি আল্লাহর নির্দেশে আমাকে এখানে রেখে যাচ্ছেন? তখন ইবরাহীম (আ.) বললেন, হ্যাঁ! হাজেরা বললেন : “আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে পরম ধৈর্যশীল পাবেন।” শান্তভাবে শিশুপুত্রের পাশে বসলেন এবং বললেন, “যে আল্লাহ এ নির্দেশ দিয়েছেন তিনি আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।” কী চমৎকার ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের নজরানা!

আছিয়া (রা.) ছিলেন ফেরাউনের সম্রাজ্ঞী। এরপরও দুনিয়া বিলাসিতা ও সমস্ত আরাম-আয়েশ পদদলিত করে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকার জন্য স্বেচ্ছায় সমস্ত দুঃখ-কষ্ট গ্রহণ করে নেন। ফেরাউনের কঠোর নির্যাতনের মাঝেও আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যকে বরণ করে নেন।
রাসূল (সা.) দ্বীনের কাজ করে যখন গভীর রাতে বাসায় ফিরতেন, খাদিজা (রা.) দরজার সাথে নিজের পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাতেন। যাতে দরজার আওয়াজ শোনা মাত্রই ঘুম ভেঙে যায়। একদিন রাসূল (সা.) খাদিজা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন হে খাদীজা! তুমি কি ঘুমাওনা? তখন খাদিজা (রা.) বললেন, “আল্লাহর নবী দরজায় করাঘাত করে দাঁড়িয়ে থাকবেন, আর আমি ঘুমে মশগুল থাকবো তা কি করে সম্ভব।”
রাসূল (সা.) এর সাথে শিআবে আবু তালিবে খাদিজা (রা.) ও অন্তরীণ ছিলেন। গাছের পাতা ছাড়া জীবন ধারণের আর কোন ব্যবস্থা তাদের ছিলনা। এর মাঝেও খাদিজা (রা.) সব সময় হাসিমুখে থাকতেন।
রাসূল (সা.) তাঁর ব্যাপারে বলেন, “আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম নারী আমাকে দান করেননি। মানুষ যখন আমাকে মানতে অস্বীকার করেছে, মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে তখন সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে। মানুষ যখন আমাকে বঞ্চিত করেছে, তখন সে আমাকে তার সম্পদের অংশীদার করেছে।”
খাতুনে জান্নাত ফাতেমা (রা.) ছিলেন রাসূল (সা.) এর কনিষ্ঠা কন্যা। উত্তম আখলাকের সমস্ত দিক ও অধ্যায় তাঁর মাঝে প্রতিফলিত হত। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি ফাতিমার চেয়ে একমাত্র তার পিতা ছাড়া আর কোন ভাল মানুষ দেখিনি।

সংসার জীবনে কৃচ্ছ সাধনার এক অনুপম দৃষ্টান্ত ফাতেমা (রা.)। দেখা যেত একাধারে তিনি হাতে ময়দা পিষার জন্য চাকা ঘুরাতেন, বাচ্চাদের দোল দিতেন আবার কুরআনের আয়াতও পড়তেন। আটা পিষতে পিষতে তাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে যেত, পানির মশক টানতে টানতে বুকে দাগ হয়ে যেত। এরপরও সাংসারিক কাজেও কখনো অভিযোগ পেশ করেননি। ইসলামের খেদমতেও কোন অবহেলা করেননি।
আসমা বিনতে আবু বকর শুরুতেই যারা ইসলাম গ্রহণ করেন তাদের মাঝে অন্যতম। একবার তার পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ না করায় মৃত্যুও তাঁর পরবর্তী শাস্তির আশঙ্কা মায়ের কাছে ব্যক্ত করে। জবাবে আসমা (রা.) বলেন, বকরী জবাই করার পর তার চামড়া ছিলে ফেলা হোক বা তাকে কিমা করা হোক তাতে বকরীর কোন কষ্ট হয়না।

এ কথা শুনে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে আবদুল্লাহ মায়ের নিকট দু‘আ চেয়ে লৌহবর্ম পড়ে দু‘আ চাইতে আসে। বার্ধক্যে দৃষ্টিশক্তিহীন আসমা (রা.) পুত্রের সাথে কোলাকুলি করার সময় লৌহবর্ম অনুভব করে বললেন, “প্রাণপ্রিয় পুত্র আব্দুল্লাহ! যারা শাহাদাতের আকাক্ষী হয় তারা বর্ম পরিধান করেনা।”
তিন দিন পর স্বীয় পুত্রের লাশ উল্টো করে ঝুলানো দেখে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বলেন- ইসলামের ঘোড় সওয়ার দ্বীনের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণ এ বীর পুরুষের কী ঘোড়ার পিঠ হতে নামার এখনো সময় হয়নি! আসমা (রা.)-এর এহেন ব্যক্তিত্বের কাছে হাজ্জাজের দম্ভ ও ঔদ্ধত্য ধূলিস্মাৎ হয়ে যায়।

খানসা (রা.)ও চমৎকার নসীহত দিয়ে তার চার ছেলেকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠান এবং একেক করে চার ছেলেই শাহাদাৎ বরণ করেন।
সর্বপ্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা.)। মুশরিকরা তাঁকে লোহার পোশাক পরিয়ে উত্তপ্ত বালুর মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখতো। রাসূল (সা.) পথ দিয়ে যেতে যেতে বলতেন, ধৈর্য ধারণ করো, তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। আবু জেহেলের বর্শা নিক্ষেপণে তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন।
এমনি আরো অসংখ্য মহিয়সী নারী ইসলামী সমাজ গঠনে নিজেদের সবটুকু উজাড় করেছেন। জাহেলী রসম-প্রথাকে পদদলিত করে সত্য আদর্শের আলোকে নিজ ব্যক্তিত্ব গঠন, পরিবার গঠন এবং সমাজ গঠনেই তারা আত্মনিয়োগ করেন। ফলশ্রুতিতে চমৎকার পবিত্রতার আবহ পূর্ণ একটি সমাজ উপহার দিয়ে গেছেন উত্তরসূরীদের।

মিসরীয় ইতিহাসে রানি নেফারতিতি রাজকার্যের সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করতেন। মিসরীয় দেয়ালচিত্রে এর প্রমাণ রয়েছে। গ্রিস সভ্যতার ইতিহাসে জানা যায়, সেই সময় মহিলারা বিভিন্ন চিত্রকলা, স্থাপত্যবিদ্যা ও ভাস্কর্যে পুরুষদের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করত।
যুগে যুগে নারীরা সময়ের মাইলফলক হিসেবে অবদান রেখে চলেছেন। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল অনন্য। সব পর্যায়ের নারীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশকে স্বাধীন করবার জন্য। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
সমসাময়িক কালে বহুজাতিক ও করপোরেট দপ্তরগুলোতে নারীরা বিভিন্ন পদবিতে নারী উদ্যোক্তা, নারী সংগঠক, নারী রাজনীতিক হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।

মানবসভ্যতায় যে নারীর রয়েছে এরূপ বিপুল ঐশ্বর্যম-িত ইতিহাস, পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সেই নারীই আজ নিগৃহীত, পীড়িত, অপমানিত হচ্ছেন অফিস-আদালতে কিংবা শিক্ষা প্রাঙ্গণে। সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষের লগ্নেও নারী নিরাপদ নয় স্বয়ং তার নিজ গৃহেও। পরিবর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার বেড়েছে করপোরেট লেভেলেও উচ্চ পদে উঠে আসছেন যোগ্যতাসম্পন্ন নারীরা। আগে ‘চাকুরে মহিলা’ মানেই যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা হতো, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নারীরা সে তির্যক দৃষ্টিকে ঋজু করতে পেরেছেন অনেকখানি। সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকার ব্যাপারে আধুনিক সমাজে নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী না মনে করে একে অন্যের পরিপূরক মনে করা উচিত।
 
লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক