কাশ্মীরবাসীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিলেই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হবে

img

কাশ্মীর পরিস্থিতি যেভাবে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে, নিরাপত্তাবাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তা এই মুহূর্তে ভারতকে ভাবিয়ে তুলছে। জ্ম্মু-কাশ্মীরে লাগাতার কারফিউ চলেছে, স্বাভাবিক জনজীবন প্রায় স্তব্ধ৷ হুরিয়াত ও কট্টর বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা গৃহবন্দি৷ অবিলম্বে রাজ্যে শান্তি আনতে না পারলে তা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার আশঙ্কা রয়েছে৷
২০১৬ সালের ৮ জুলাই কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীনের কমান্ডার বুরহান মুজাফফর ওয়ানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর থেকেই ফুঁসে ওঠে কাশ্মীর। সে থেকেই থেমে থেমে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কাশ্মীরি জনতার সংঘাত চলছে। হতাহতের সংখ্যাও অনেক। 
সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় আত্মঘাতি বোমা হামলায় ৪০ জনেরও বেশি সিআরপিএফ সৈন্য নিহত হওয়ায় ভারতে ব্যাপক সহিংসতার মুখে পড়ছে সাধারণ কাশ্মীরি জনগণ। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত কাশ্মীরিদের উপর হামলার ঘটনা ঘটছে। 
ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে।
কাশ্মীর সংকট সৃষ্টি করে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যারা এ দেশকে অর্থাৎ ভারতবর্ষকে দু’শ বছর ধরে শাসন-শোষণ করেছে।
ব্রিটিশরা ভারত ছাড়তে চায়নি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে তারা দুর্বল হয়ে পড়ায় ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ভারতবর্ষে তীব্র হয়। এ অবস্থায় সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ভারত ভেঙে পাকিস্তান নামক একটি তথাকথিত মুসলিম রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটালেও ইংরেজ-মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক অংশ কাশ্মীরসহ ভারতের কয়েকটি রাজা-বাদশাশাসিত রাজ্যের সমস্যার সমাধান না করে তা জিইয়ে রাখে। স্থির হয়, যে রাজা বা বাদশা ওই রাজ্যগুলো শাসনের দায়িত্বে আছেন, তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁর রাজ্য ভারতের অংশীভূত হবে নাকি পাকিস্তানের।
বাকি রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে ওই ফর্মুলামাফিক সমাধান ঘটলেও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা গেল না। সেখানে তখন ক্ষমতায় ছিলেন একজন রাজা। তিনি হিন্দু। আর ওই রাজ্যের জনসংখ্যার বিপুল অংশ হল মুসলিম। রাজা ভারতভুক্তির পক্ষে সিদ্ধান্ত নিলেও কাশ্মীরের মুসলিম বাসিন্দাদের একটি অংশ এবং পাকিস্তান তা মেনে নিতে নারাজ হয়। ফলে সৃষ্টি হয় সংকটের। এ সংকট এমনই যে ভারত বলছে, “কাশ্মীর ভরতের অবিচ্ছেদ্য অংশ” আর পাকিস্তান বলছে, “কাশ্মীর তাদের চাই-ই।” পরিণতিতে কাশ্মীরের একাংশ পাকিস্তানের দখলে এবং বৃহত্তর অংশ ভারতের দখলে।
দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে এ ইস্যুতে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। ছোট-বড় মিলিয়ে যুদ্ধও হয়েছে কয়েকটি।
কাশ্মীর সম্ভবত ভারত ও পাকিস্তানের যত হাজার মানুষের জীবনসম্পদ কেড়ে নিয়েছে, সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামেও অত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি!
ভারত-পাকিস্তানের বর্তমান সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটাই হল আলোচ্য বিষয়। সাময়িক সমাধানের চিন্তা না করে ভারত ও পাকিস্তান এগোবে কি না তা দেখতে হবে। এ সংকট জিইয়ে রাখার ফলে উভয় রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দু’টি দেশই সব সময় গুরুত্ব দিয়েছে জনগণের চেয়ে জমিনকে। ফলে যে কোনো উপায়ে দখলই ছিল তাদের মূল আগ্রহ। 
নীতিগতভাবে অবশ্য সবাই সমস্যাটির সমাধানের কথাই বলছেন, কিন্তু কাজে সেদিকে এগোচ্ছেন কমই। ফলে দীর্ঘায়িত হচ্ছে বিরোধ। আসলে মূল কথাটি মেনে নিতেই হবে যে, কাশ্মীর কাশ্মীরিদের। তাই যদি হয় তাহলে সামরিক পন্থায় সেদিকে এগোনো যাবে না-সমাধানের পথে আন্তরিকতা নিয়ে এগোতে হলে শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনা ছাড়া বিকল্প নেই। যেদিন ভারত-পাকিস্তান দেশ দু’টি একসঙ্গে হয়ে কাশ্মীরী জনগণকে গুরুত্ব দিতে পারবে, কাশ্মীরবাসীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারবে, সেদিনই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক