কবি আল মাহমুদ একটি ইতিহাস

img

কবি আল মাহমুদ। একটি নাম, একটি ইতিহাস! আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।
জন্ম এবং পরিবার
আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। পিতার নাম আব্দুর রব মীর এবং মাতার নাম রৌশন আরা বেগম। তাঁর দাদা আবদুল ওহাব মোল্লা ব্রিটিশ-ভারত শাসনামলে হবিগঞ্জ জেলায় জমিদার ছিলেন। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন। 
আল মাহমুদ ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দা নাদিরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।
শিক্ষা ও কর্মজীবন
কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকু- হাই স্কুলে পড়ালেখা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। 
সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে মাহমুদ ঢাকা আগেমন করেন। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলা পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলা পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে তিনি ভারত গমন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভাবে অংশ নেন। যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ নামক পত্রিকায় প্রতিষ্ঠা-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সম্পাদক থাকাকালীন এ সময় সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাদ- ভোগ করেন। ‘১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োাগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।’ [উইকিপিডিয়া]

সাহিত্যজীবন
১৮ বছর বয়সে তার কবিতা প্রকাশিত হয়। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ, কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তিনি সুপরিচিত হন।
তার কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। 
তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার নগরকেন্দ্রিক প্রেক্ষাপটে ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস “কবি ও কোলাহল”। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম সোনালি কাবিন।
উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থ
লোক লোকান্তর (১৯৬৩)
কালের কলস (১৯৬৬)
সোনালী কাবিন (১৯৭৩)
মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬)
আরব্য রজনীর রাজহাঁস
বখতিয়ারের ঘোড়া
অদৃশ্যবাদীদের রান্নাবান্না
ঝবষবপঃবফ চড়বসং - অষ গধযসঁফ (১৯৮১)
দিনযাপন
দ্বিতীয় ভাঙ্গন
একটি পাখি লেজ ঝোলা
পাখির কাছে ফুলের কাছে
আল মাহমুদের গল্প
গল্পসমগ্র
প্রেমের গল্প
যেভাবে বেড়ে উঠি
কিশোর সমগ্র
কবির আত্মবিশ্বাস
কবিতাসমগ্র
কবিতাসমগ্র-২
পানকৌড়ির রক্ত
সৌরভের কাছে পরাজিত
গন্ধ বণিক
ময়ূরীর মুখ
না কোন শূন্যতা মানি না
নদীর ভেতরের নদী
পাখির কাছে , ফুলের কাছে
প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা
প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা
প্রেমের কবিতা সমগ্র
উপমহাদেশ
বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ
উপন্যাস সমগ্র-১
উপন্যাস সমগ্র-২
উপন্যাস সমগ্র-৩
তোমার গন্ধে ফুল ফুটেছে (২০১৫)[১১]
ছায়ায় ঢাকা মায়ার পাহাড় (রূপকথা)
ত্রিশেরা
উড়াল কাব্য
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮)
জয় বাংলা পুরস্কার (১৯৭২)
হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২)
জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২)
কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৬)
কবি জসীম উদ্দিন পুরস্কার
ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬)
একুশে পদক (১৯৮৬)
নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০)
ভানুসিংহ সম্মাননা পদক (২০০৪)
লালন পুরস্কার (২০১১)
স্বকীয়তা
কবি তাঁর কবিতায় যে মৌলিকত্ব, ক্ষমতা ও শক্তির সাথে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের লোকসত্ত্বাকে ধারন করেছেন, তা আর কোনো কবির পক্ষেই সম্ভব হয় নি। আধুনিক বাংলা সাহিত্য কলকাত্তাইয়া বাংলা ভাষার ধার করে আনা ছাঁচ থেকে বেরিয়ে এসে নতুন পূর্ববঙ্গীয় যে চেহারা ধারণ করেছে, তার পেছনে আল মাহমুদের অবদান অপরিসীম। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক, সমালোচক শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, “বাংলা কবিতায় নতুন সম্ভাবনা এনেছেন আল মাহমুদ, পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেনি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন।” বাংলা কবিতার রাজধানীকে কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করার কৃতিত্ব এককভাবে যদি আল মাহমুদকে দেয়া হয়, তাতে কোনো ভুল হবে না।
ইসলামি ভাবধারা
“অথচ ঘুমের মধ্যে কারা যেনো, মানুষ না জ্বীন
আমার কবিতা পড়ে বলে ওঠে আমিন, আমিন।” [আল মাহমুদ]
১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর কবিতায় বিশ্ব¯্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস উৎকীর্ণ হতে থাকে; এজন্য তিনি তথাকথিত প্রগতিশীলদের সমালোচনার মুখোমুখি হন। ইসলামি আদর্শের প্রতিফলন ঘটতে থাকে তাঁর লেখায়। ফলে এক শ্রেণির প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী মহল তাঁর সমালোচনায় মেতে ওঠে। ইসলামি রাজনীতির দিকেও কবি কিছুটা ঝুঁকে পড়েন। ফলে তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে সেদিকে কবির ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তিনি আপন জগতে সমানতালে চালিয়ে যেতে থাকেন তাঁর সৃষ্টিযজ্ঞ। কবি অবজ্ঞাভরে বলেছিলেন, “দাড়ি রাখলে আর ধর্মভীরু হলেই যদি কেউ মৌলবাদী হয়; তবে অবশ্যই আমি মৌলবাদী!”

অবহেলিত কিংবদন্তি
কবি আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন, তাকে একটিমাত্র লেখায় বর্ণনা করা একেবারেই অসম্ভব। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের জাতীয় আত্মপরিচয় গড়ে তোলার একেবারে নেপথ্যের কয়েকজন মানুষের কথা যদি বলতে হয়, তবে তাদের ভেতর সাংস্কৃতিক পরিম-লে আল মাহমুদের নাম রাখতেই হবে। 
তবে তারপরেও এই কবি যেন কিছুটা অবহেলিত! কবির প্রাপ্য সম্মানের অনেকটাই হয়তো তিনি পান নি; অন্তত  কবির ধারণা এমনই। 
তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘সাহসের সমাচার’ গ্রন্থে তিনি বারবার এই কথাটাই বলেছেন।
“তোমরা আমাকে বোঝোনি। আমি বলি না বুঝবে না, বুঝবে। তবে তখন আমি আর থাকবো না। তবে এটা মনে রেখো, বাংলা সাহিত্যে যারা কিছু করতে চাও, আমাকে তোমার পাঠ করতেই হবে। এটা আমার আত্মবিশ্বাস।”
মৃত্যু
বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য কবি আল মাহমুদ ধুলোমাটির এই পৃথিবীর সমস্ত মায়া ছিন্ন করে বিদায় নিয়েছেন ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখ শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে রাজধানী ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে। তিনি নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
‘আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার/ যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।...মৃত্যুকে কামনা করে লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের দক্ষিণ মৌড়াইল এলাকার কবরস্থানে পারিবারিক জায়গায় মা-বাবার পাশে দাফন করা হয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদকে।
কবি আল মাহমুদ মারা গেলেও তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে! সোনালি কাবিন, লোক-লোকান্তর, বখতিয়ারের ঘোড়া, কালের কলস, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, পাখির কাছে ফুলের কাছে, কাবিলের বোনের মাধ্যমে তিনি শ্বাস-প্রশ্বাস নিবেন অনন্তকাল। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নেক কাজগুলো কবূল করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক