‘আলিয়া বা কওমির যে শিক্ষা এটাই ইসলামি শিক্ষা নয়’

img

মুসা আল হাফিজ। প্রজ্ঞাচর্চা ও বুদ্ধিজীবিতার যে ধারা ইসলামের সোনালি মনীষীরা রচনা করে গেছেন, সে ধারার অন্যতম প্রতিনিধি তিনি। লেখা ও গবেষণায় তার হাত ধরে বেরিয়ে আসছে অজস্র মুকুল।  তিনি ইতিহাস ক্ষুদাই করে তুলে আনছেন মিল্লাতের খোরাক।

সম্প্রতি তিনি দেশ, সমাজ, দেশের রাজনীতি, উন্নয়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বললেন আওয়ার ইসলামের সঙ্গে।

তিনি একদিকে যেমন মুসলিমদের নিয়ে বললেন, মুমিন পরিচয় থাকা সত্তেও আমরা অনবরত হেরে যাই, আবার দেশ-সরকাকে বুঝালেন, উন্নয়ন মানেই রাস্তাঘাট, সেতু আর ওভারব্রিজ বানানো নয়।

তিনি যেমন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে বললেন বৃটিশের ‘কেরানি তৈরির’ ব্যবস্থাপনা, অপরদিকে তিনি দেখালেন, ভারতবর্ষে ১৮৬৬ তে শুরু হওয়া দেওবন্দের শিক্ষাই কেবল ইসলামি শিক্ষা নয়।

কবি, গবেষক মুসা আল হাফিজের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আওয়ার ইসলামের প্রতিবেদক হামিম আরিফ।


আওয়ার ইসলাম : কেমন আছেন? কী ভাবছেন?

মুসা আল হাফিজ: ভালো, আল্লাহর শুকরিয়া। খোদার প্রতি বিশ্বাসে যে শক্তি, তা ভালো থাকাকে বিশ্বাসীদের ভবিতব্য বানিয়ে দেয়।

জীবনের কোনো বৈরী তরঙ্গ ‘ভালো থাকা’ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। সকল ঝড়ে, জলোচ্ছ্বাসে, খরায়, কালো রাতে, দুঃসহ দুপুরে ঈমান এক ইতিবাচক জীবনবাদিতার শান্ত, স্নিগ্ধ ঝর্ণা হয়ে মুমিনের জীবনে বইতে থাকে। ফলে তাকে কোনো পরিস্থিতি পরাজিত করার কথা নয়। জীবনের কোনো যুদ্ধে মর্দে মুমিনের হেরে যাবার কথা নয়।

কিন্তু আমরা হেরে যাই, মুমিন পরিচয় থাকা সত্তেও অনবরত হেরে যাই। ঈমানের যে জীবনবাদী দর্শন, তা কেন আমাদের চিত্তকে বিকশিত করছে না? ঈমানের যে প্রবল ও প্রশান্ত মুখ, তা কেন দৃষ্ট হচ্ছে না আমাদের জীবনে? আমরা কেমন মুমিন? – বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম।

আওয়ার ইসলাম : সমাজ- সংস্কৃতি নিয়ে কী ভাবছেন?

মুসা আল হাফিজ: সমাজ-সংস্কৃতি একটি প্রবল ভাঙ্গনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজজীবনে দগদগে ক্ষত তৈরি করেছে। সেখান থেকে পঁচা রক্ত ঝরছে, পুঁজ ঝরছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

সমাজ তার বহু মূল্যবোধ হারিয়ে চলছে। শ্রেয়োবোধ হারাচ্ছে। ঐতিহ্য হারাচ্ছে। সুকৃতী হারাচ্ছে। বহিরাগত যে সব অসুখ এতোদিন শক্তিশালী ছিলো না, তারা এখন আধিপত্য করছে। এ সব অসুখকে প্রতিরোধ করতে পারছে না একটি জীর্ণ, পঁচা, বার্ধক্যকবলিত, আড়ষ্ট সমাজদেহ।

ফলে পরিবার ভাঙছে, তছনছ হয়ে যাচ্ছে, সমাজ ভাঙছে, কৌমবোধ ভাঙছে। এবং এসব ভাঙ্গন গাসওয়া মনে হচ্ছে। স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। একে উস্কে দিচ্ছে দেশি, বিদেশি বিভিন্ন শক্তি। এর পরিণতি যে কত ভয়াবহ, কেউ খেয়াল করছি না। কোনো শক্তিই এই বিপর্যয়কে সেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে না।

আওয়ার ইসলাম : একে এতো বড় করে দেখছেন কেন?

মুসা আল হাফিজ : সমস্যা হিসেবে এটি বড় এবং বড়। রাষ্ট্র গড়ার আগে মানুষ গড়েছে পরিবার ও সমাজ। আমাদের যে সভ্যতা, বাঙ্গালি সভ্যতা বলুন, মুসলিম সভ্যতা বলুন, ভারতীয় বা প্রাচ্যীয় সভ্যতা বলুন, আমাদের সভ্যতা হচ্ছে পরিবার গড়ার সভ্যতা। সমাজকে পরিপুষ্ট করার সভ্যতা।

পশ্চিমারা পরিবার ভাঙছে, সমাজকে উপেক্ষা করছে। এটা তাদের অন্তঃসারশূন্য এক দিক। ভয়াবহ এক জীবনহীনতার মধ্যে ওদের জীবন খাবি খাচ্ছে। এই শূন্যতাকে ওরা ঢাকতে চায় পাশবিকবৃত্তির অবাধ চর্চার সাহায্যে এবং কৃত্রিম নানা উপকরণের সাহায্যে।

পশ্চিমা এই অসুখকে খুবই উদ্দীপনার সাথে আমাদের সমাজজীবনে আমন্ত্রণ করা হচ্ছে।

মূল্যবোধ ও শ্রেয়বোধকে লাঞ্চিত করা হচ্ছে, পরিবারকে উপেক্ষা করা হচ্ছে, পারিবারিক বন্ধনকে শিথিল করার প্রচারণায় মিডিয়া, সাহিত্যিক, সিভিল সোসাইটি, এনজিও ইত্যাদি খুবই শক্তিশালী ভূমিকা রাখছেন।

আমি বলতে চাই, পশ্চিমা দুনিয়া থেকে আমদানি করার বিষয় হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সৃষ্টিশীলতা ও উন্নতির নানাদিক। এটা তাদের ক্ষমতা, যা তাদের বাচিয়ে রাখছে ও শক্তিশালী করেছে।

এসব উপাদান আমাদের শক্তিশালী করতো। কিন্তু তা কি আমরা অর্জন করেছি? আমরা বরং নিয়ে আসছি তাদের অসুখগুলোকে।সমাজবিমুখতাকে, নগ্নতাকে, যৌনঅরাজকতাকে, মূল্যবোধের অবক্ষয়কে।

আমরা নিজেদের যা কিছু মহান, তা হারাচ্ছি। অন্যদের যা কিছু খারাপ, তা নিয়ে আসছি। আর এটাকে আধুনিকতা বলে চালিয়ে দিচ্ছি। এটা আসলে দেশ ও সমাজবিরোধী একটা অবস্থা। এটি জাতির প্রাণশক্তি ও তারুণ্যকে খুইয়ে ফেলার একটি প্রবণতা।

এর সাথে যারা জড়িত, যে সব মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, এনজিও এর গোড়ায় পানি ঢালছে, তারা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে প্রাণহীন করার কাজ করছে। ওরা সরকারের কাছে বা সমাজের কাছে নানাভাবে আদর পায়। আসলে ওদের পাওয়া উচিত তিরস্কার ও প্রত্যাখ্যান।

আওয়ার ইসলাম : সরকার ও সামাজিক শক্তির কাছে কী ভূমিকা আশা করছেন?

মুসা আল হাফিজ : সরকারকে বুঝতে হবে উন্নয়ন মানেই রাস্তাঘাট, সেতু আর ওভারব্রিজ বানানো নয়। আসল উন্নয়ন হচ্ছে ওই ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠন এবং জ্ঞানভিত্তিক ও উৎপাদনমুখি সুস্থ সমাজ নির্মাণ।

এ কাজটিতে বাংলাদেশের কোনো সরকারই মনোযোগ দেয়নি। মন দিলেও পথ আর পদ্ধতি ছিলো ভুল। আমার স্পষ্ট অভিজ্ঞান- নিজেদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বুনিয়াদের ওপর খাড়া করতে হবে প্রগতির প্রকল্প।

দুনিয়ার সব দেশের কাছ থেকেই উন্নতি ও অগ্রগতির ইতিবাচক অভিজ্ঞতা সমূহকে কাজে লাগানো যায়। কিন্তু নিজেদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে কোনোভাবেই খর্ব করা যাবে না।

বিশ্বের প্রতিটি অগ্রসর জাতি ও দেশ এ পথ ধরেই এগিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমারা আমাদের উন্নয়নকে তাদের স্বার্থের দৃষ্টিতে দেখে। তারা উন্নয়নের নামে আমাদের ওপর তাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের দাসত্বকে চাপিয়ে দিতে চায়।

দেখুন, স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উৎপাদনে ওদের মনোযোগ ও বিনিয়োগ খুবই অল্প। কিন্তু এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি মনোযোগ ও অর্থ ওরা ঢেলেছে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে তাদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির রঙ্গে রাঙাবার জন্য।

আমাদের মেয়েদের শরীরে ওদের পছন্দের পোশাক তুলে দেয়ার জন্য। আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধকে শিথিল করার জন্য। আমাদের তারুণ্যের মানসজগতকে ওদের সীমানায় নিয়ে যাবার জন্যে।

আমরা ওদের এসব প্রয়াসকে অনুগ্রহ মনে করেছি। ওরা আমাদের ক্ষতি করেছে আর আমরা ওদের প্রতি কৃতজ্ঞ থেকেছি।

সরকার ও সামাজিক শক্তিগুলো এসব মৌলিক বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারতো। আমরা সহযোগিতা নিতাম, কিন্তু নিজেদের সামগ্রিক কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে।

আমরা সহযোগিতা নিতাম, যাতে আর সহযোগিতা নিতে না হয়। মানে আমরা স্বাবলম্বী হবার পথে হাঁটতাম। নিজেদের মতো করে সহযোগিতা নিশ্চিত না হলে নিজেদের সবকিছু দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যত গড়ে তুলতাম। সমাজ ও তারুণ্যের মধ্যে অন্যের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির উপনিবেশ গড়ার সুযোগ দিতাম না।

আওয়ার ইসলাম: আপনি যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কি এর প্রতিফলন আছে?

মুসা আল হাফিজ: না, নেই। এ দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা আছে, তা নিজস্বতা ও আত্মপরিচয়সমৃদ্ধ অগ্রসর জাতিগঠনের জন্য যথেষ্ট নয়।

এ শিক্ষা ব্যবস্থা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে না। ফলে অগ্রগতির যে পথ দেখায়, তার গোড়াতেই গলদ। মানুষকে তার বিশ্বাস ও মূল্যবোধ এক বার্তা দেয়, আর শিক্ষাব্যবস্থা আরেক বার্তা দেয়, ফলে নিজের সাথে নিজেই রশি টানাটানি করতে থাকে। সে আত্মপরিচয় সঙ্কটে পড়তে থাকে।

গোড়ার শিক্ষাটা অনেক প্রভাবশালী। কিন্তু এদেশে তা কৃত্রিম বুনিয়াদে দণ্ডায়মান। ফলে দেখবেন, আমাদের শিক্ষিত শ্রেণির বড় একটি অংশ আত্মপরিচয় সংকটে ভুগেন। আর বুদ্ধিজীবীদের প্রধান অংশটিই এই সঙ্কটের জীবন্ত উদাহরণ।

এলিট শ্রেণির নৈতিক ভীত এত দুর্বল যে, সাধারণ মানুষও সমাজের মাথায় পা রেখে উন্নত হবার প্রতিযোগিতা করছেন। বৈষয়িক দিক দিয়ে তারা স্বাভাবিক উন্নতিতে সন্তুষ্ট নন। তাদের ‘আরো চাই, আরো চাই’ চিৎকারে চারদিক তটস্থ।

তাদের অতিশয় ক্ষুধা তাদের দুর্নীতিতে ডুবিয়ে দিচ্ছে। তারা সব ধরনের উন্নতি চান, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাদের উন্নতি চোখে পড়ছে না। এ রকম পরিস্থিতিতে জাতীয় অগ্রগতির মূল সড়কে আমরা এগুবো কীভাবে?

কতিপয় পরিসংখ্যান এবং জরিপকেই উন্নয়নের দলিল হিসেবে ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করবো?

আওয়ার ইসলাম: এ ক্ষেত্রে আপনার প্রস্তাব কী?

মুসা আল হাফিজ: প্রস্তাব সুস্পষ্ট। বৃটিশ প্রবর্তিত যে শিক্ষাকাঠামো, লর্ড মেকলে এটি প্রণয়ন করেছিলেন ‘দেখতে এদেশীয়, কিন্তু মনে মননে বিজাতীয়’ ‘শিক্ষিত কেরানি’ তৈরির জন্য।

দুই বার দেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেকগুলো শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে, তাদের রিপোর্ট এসেছে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিবাচক ও আমূল রূপান্তর হয়নি। যে তিমিরে ছিলো, সেখানেই থেকে গেছে।

এ দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিক, অগ্রসর ও বিশ্বসভায় প্রতিযোগিতাযোগ্য রূপায়ন অপরিহার্য্য। এই রূপায়নে জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ভিত্তিক আত্মনির্মাণ ও প্রগতির লক্ষ্য নিশ্চিত করতে হবে।

আওয়ার ইসলাম: ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে কী বলবেন?

মুসা আল হাফিজ: জেনারেল ধারায় ইসলাম শিক্ষার যে প্রক্রিয়া, সেটা ইসলামি মন ও মানস গঠনেই ব্যর্থ। এখানে কী পড়ানো হয়, এটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে পড়ানো হয়- তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দুঃখজনক যে, উভয়টাই ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষাদর্শনকে সামনে রেখে এগুয়নি। উভয়টাই ইসলামের জীবনীশক্তিকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে না। উভয়টাই সংস্কারযোগ্য।

আওয়ার ইসলাম: আরো বিশেষভাবে ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বলতে চাইছিলাম।

মুসা আল হাফিজ: মাদরাসা সমূহের কথা বলছেন? সেখানেই আসছি। আলিয়া বা কওমি মাদরাসার যে শিক্ষা, এটা ইসলামি শিক্ষার মধ্যে পড়ে। কিন্তু এটাই ইসলামি শিক্ষা নয়।

১৭৮০ সালে বা ১৮৬৬ সালে ইসলামি শিক্ষার সূচনা হয়নি। ইসলামি শিক্ষার সূচনা হয়েছে ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে। ইসলামি শিক্ষার আদর্শ প্রতিষ্ঠান যদি খুঁজতে হয়, সেটা ইসলামের সোনালি সময়কে বাদ দিয়ে কেন? তখন মাদরাসা সমূহে কী কী পড়ানো হতো?

রাসূলে কারিমের সা. শিক্ষা ব্যবস্থা রূপরেখা ও বিষয়ের ব্যাপকতা কেমন ছিলো? কেমন ছিলো কুফা, দামেশক ও বাগদাদের শিক্ষাগারগুলো? নেজামিয়া মাদরাসায় কী কী পড়ানো হতো?

বাগদাদের বিখ্যাত মুস্তানসিরিয়া মাদরাসায় কী কী পড়ানো হতো? হালব, কায়রো, বোখারা, সমরকন্দ, সিরাজ, করডোভা, গ্রানাডা, সানঅা ইত্যাদির মাদরাসাগুলোয় কী কী পড়ানো হতো?

এমনকি বাংলাদেশে সোনারগাঁয়ে সেই শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার রহ. মাদরাসায় কতগুলো বিষয় পড়ানো হতো, কীভাবে পড়ানো হতো?

ইসলামী শিক্ষার রূপায়নে এই ঐতিহ্যকে কীভাবে ভুলে যাওয়া সম্ভব? বিখ্যাত ফকিহ, চিন্তাবিদ তাকি উসমানি বলেছেন এবং ঠিকই বলেছেন যে, পাকিস্তানে ইসলামি শিক্ষার জন্য অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দ নয়, বরং জামেয়া কারাউইন।

তিনি কি দেওবন্দকে ছোট করলেন? না, দারুল উলূম দেওবন্দের কোনো চিন্তাবিদ স্কলারকেও প্রশ্ন করুন, তিনিও একই জবাব দেবেন। কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে দুনিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো।

৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজ নগরে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফাতিমা আল ফিহরি নামের এক মহিলা এর প্রতিষ্ঠাতা। তিউনিসিয়ার কারাওইন ছিলো তার পরিবারের আদিনিবাস। সে সূত্রে মসজিদকেন্দ্রিক এ বিশ্ববিদ্যালয় কারাউইন নামে খ্যাত হয়।

ইতালির বোলোনা (Bologna)-য় যখন প্রথম ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বহু আগে এটি বিশ্বজোড়ে খ্যাতি পায়। সেখানে কী কী পড়ানো হত? তাফসির- হাদিস, ফিকহ, সিরাত, ইতিহাস, দর্শন, ভাষা ও ব্যাকরণ, ভূগোল, চিকিৎসা ইত্যাদির পাশাপাশি আরো কত বিষয় সেখানে ছিলো খোঁজে দেখুন।

অনেক অমুসলিমও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অমুসলিম অ্যালামনি ছিলেন ইহুদি দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ মুসা বিন মাইমুন বা মাইমোনাইডস (১১৩৫-১২০৪)। তিনি শিক্ষা লাভ করেন আবদুল আরব ইবনে মোয়াশাহার তত্ত্বাবধানে।

কার্টিওগ্রাফার মুহাম্মদ ইদ্রিসির (মৃত্যু : ১১৬৬) মানচিত্র ইউরোপ অভিযানে ব্যবহার হয়েছিল রেনেসাঁর যুগে। এ জামেয়ার সন্তানদের মধ্যে ছিলেন ইবনে রুশায়েদ আল সাবতি (মৃত্যু : ১৩২১), মুহাম্মদ ইবনে আলহাজ আলআবদারি আলফাসি (মৃত্যু : ১৩৩৬), শীর্ষস্থানীয় তাত্ত্বিক মালিকি এবং সুপরিচিত পরিব্রাজক ও লেখক লিও আফ্রিকানাস।

আমরা যদি অন্য সব মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই, সেখানেও দেখবো বিষয় ও পদ্ধতিগত ব্যাপকতা।

ইসলামের জ্ঞানকাণ্ডে সবচে’ বেশি জলসিঞ্চন করেছেন যারা, তারা কী কী বিষয় পড়েছেন?

জামেয়া সমূহে কীসব বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করে ইমাম গাযালি গাযালি হয়েছেন, ফখরুদ্দিন রাযী রাযী হয়েছেন, জালালুদ্দিন রুমী রুমী হয়েছেন, ইবনে তাইমিয়া নিজেকে ইবনে তাইমিয়ায় পরিণত করেছেন?

বিষয়গুলো কি গুরুত্ববহ নয়? ইমাম বোখারি, তিরমিযি, কুরতুবি, ইবনুল কাসির, ইবনুল আসির, ইবনে খাল্লিকান, আলবেরুনী কিংবা আবদুল কাদির জিলানি, ইয্যুদ্দিন ইবনে আব্দুস সালাম থেকে নিয়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী অবধি ইসলামের জ্ঞানবৃক্ষরা যা পড়লেন, পড়ালেন, তাকে যদি উপেক্ষা করা হয়, তাহলে ইসলামি শিক্ষার সিলেবাস কীভাবে পূর্ণতা পায়?


এই সেদিনও মাদরাসাগুলো গ্রিক দর্শন পড়াতো। এখনও বহু মাদরাসায় পড়ানো হয়। আব্বাসী আমলে এ দর্শন অধ্যয়ন মুসলিম জ্ঞানতাত্তিকদের জন্য জরুরি হয়ে উঠে। মুতাজিলাসহ বিভিন্ন ন্যায়তত্তনির্ভর গোষ্ঠীর যুক্তিজাল ছিন্ন করতে এর বিকল্প ছিলো না। কিন্তু এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় কয়েক শ বছর আগেই। সামনে আসে আধুনিক দর্শন। যার প্রবল তোড়ে মুসলিমদের মেধা ও মনন হতে থাকে প্লাবিত।

এ দর্শনের বহু তত্ত সরাসরি নাস্তিকতা ও ধর্মত্যাগের ডঙ্কা বাজাতে থাকে। ইসলামের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু এ দর্শন পড়ানো হয় না। অন্তত ইসলামের পক্ষে লড়ার জন্য তো এর পঠন জরুরি ছিলো।

কিন্তু দেখা গেলো, মৃত গ্রিকদর্শন পড়ানো হচ্ছে৷ জীবিত ও প্রবল প্রতাপশালী আধুনিক দর্শন কানের পাশে হুংকার দিলেও সে গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই যে প্রবণতা, একে আপনি ইসলামি শিক্ষা বলে চালিয়ে দিতে পারেন না।

আমরা যার মধ্যে আছি, যা পড়ি আর যা বুঝি, সেটাই কেবল ইসলামি শিক্ষা, এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আওয়ার ইসলাম : কওমি মাদরাসা সম্পর্কে একটি প্রশ্ন। কওমি মাদরাসার বর্তমান বাস্তবতাকে কীভাবে দেখছেন?

মুসা আল হাফিজ: সাদা চোখে দেখলে বর্তমানে কওমি মাদরাসার প্রধান ঘটনা হচ্ছে সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়া। এটা অবশ্যই বড় বিষয় এবং যেভাবে হয়েছে তা অভিনন্দনযোগ্য।

অনেকেই এবং আমিও এক সময় ভীত ছিলাম যে স্বীকৃতির নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মূখ্য কি না? এখন পর্যন্ত সরকার থেকে এমন কোনো ইচ্ছা বা উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং স্বীকৃতির যে গেজেট এসেছে, তাতে স্পষ্ট, হাইয়্যাতুল উলইয়া যেভাবে চেয়েছে, সরকার সেভাবেই স্বীকৃতি ঘোষণা করেছেন।

সরকার এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বাস্তবতাবোধের সুফল অবশ্যই পাবেন। সমস্যা যেটা, সেটা কওমির ভেতরে। এখানে বৃহৎ একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠছে উপযোগবাদী। না, শুধু উপযোগবাদী নয়, বস্তুবাদী। এবং এ প্রবণতা দ্রুতই বাড়ছে।

এটা একসময় কওমিতে ছিলো অচিন্তনীয়। কিন্তু এখন এটা বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান। এর কুফল দৃশ্যমান হতে থাকবে ধীরে ধীরে। যখন আসল অবয়বে প্রকাশিত হবে, খুবই ভয়াবহ রূপে প্রকাশ পাবে।

কারণ ধর্মীয় পোশাকে প্রকাশিত বস্তুবাদী মানসিকতা খুবই কদর্য ও নোংরা হয়ে থাকে। এটি একটি দিক। আরেকটি দিক হলো, সমাজবিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। মাদরাসাগুলো হয়ে উঠছে একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

আওয়ার ইসলাম : সেটা কী রকম?

মুসা আল হাফিজ: দেখুন, কওমি মাদরাসা নামই দাবি করে জাতি ও সমাজের কেন্দ্রে থাকবে সে। মাদরাসা শুধু শিক্ষাগার নয়, আরো অধিক কিছু। অতীতে মাদরাসা সমাজের কেন্দ্রে থেকেছে। তার এক ডানা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, অপর ডানা মানুষের সাথে সম্পর্ক।

উভয় ডানা সক্রিয় হলেই সে উড়তে পারে আপন আকাশে। কিন্তু আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দিকটি চর্চা ও আচরণে আগের জায়গা ধরে রাখতে পারেনি। এটা সবাই স্বীকার করেন। আর আল্লাহর বান্দাদের সাথে সম্পর্কের দিক?

একটি অবশ্যই আরেকটির সাথে সম্পর্কিত। তবুও মানুষের সাথে সম্পর্কের দিকটি সামাজিক দায়বোধের অভাব, অতিপ্রতিক্রিয়া, ভারসাম্যহীনতা ও সুবিধাকাতর মানসিকতা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আওয়ার ইসলাম : শেষের কথাটি যদি আরেকটু খোলাসা করতেন…

মুসা আল হাফিজ : কওমি মাদরাসা মুসলিম সমাজের একটি কেন্দ্র। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী তার স্থায়ী শত্রু নয়, মিত্রও নয়। কিন্তু মুসলিম মাত্রই মাদরাসার দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের লক্ষ্যস্থল। এমনকি অমুসলিমরাও এর মধ্যে শামিল।

কিন্তু অতীতে দেখা দেখা গেছে, নির্বিচারে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা। যেন এ বিরোধিতা কওমি মাদরাসার চরিত্রের অংশ। এমন সব বক্তব্য আসতো, যা ছিলো চরম উত্তেজক। মনে হতো রাজনৈতিক এই দল কওমি ধারার প্রতিকূলে। এ প্রবণতা কওমি মাদরাসার ক্ষতি করেছে।

এখন অনেকেই বিএনপি ঘরাণার বিরোধিতায় মাত্রা হারাচ্ছেন। যেন এই রাজনৈতিক ঘরাণাকে কওমি ধারার শত্রুপক্ষ ঘোষণা করেই থামবেন। তারা ভুলে যান, আওয়ামী লীগ-বিএনপি ইত্যাদি গণমানুষের সংগঠন।

রাজনৈতিক দলের পলিসি যাই হোক, সে দলে যে ‘গণমানুষ’ তাদের মাদরাসার সাথে জড়িয়ে রাখতে হবে। দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের আওতায় তাদের আনতে হবে। তাদের সহযোগিতা যেমন মাদরাসার দরকার, তেমনি মাদরাসা থেকে যে আলো ছড়ায়, সেটা ছাড়া তাদের ধর্মীয় জীবন অচলাবস্থার মুখে পড়বে।

অতএব, উভয়কেই উভয়ের প্রয়োজন। কিন্তু দেখা যায়, অনেকেই কওমির ভবিষ্যতকে কোনো সরকার বা দলের ভবিষ্যতের সাথে একাকার করতে নেমে যান। একটি দল বা জনগোষ্ঠীকে এর স্থায়ী শত্রুর জায়গায় দেখতে চান।

অতিপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করুন। কওমি ঘরানার বিশিষ্ট কারো বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই তেড়ে মেরে ডাণ্ডা, করে দেব ঠাণ্ডা মেজাজে ঝাপিয়ে পড়া হচ্ছে। হৈ হৈ ব্যাপার, রৈ রৈ কাণ্ড শুরু হচ্ছে। যেন ক্ষমতা পেলে জামাল খাশোগির পরিণতি তাকে ভোগ করিয়ে ছাড়তেন।

সহস্রাব্দের ঋণ; গ্রন্থ ও গ্রন্থকার প্রসঙ্গে

এই যে মানসিকতা, এটা আলেমসূলভ নয়। সহনশীলতা আলেমদের অন্যতম দিক। ইমাম আবু হানিফার রহ. সমালোচনা হয়নি? ইসমাইল শহীদ রহ. এর সমালোচনা হয়নি? মদনীর রহ. কি সমালোচনা হয়নি? থানভির রহ. সমালোচনা হয়নি?

তাদের প্রতিক্রিয়া কী ছিলো? তাদের ভক্ত ও অনুসারীরা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতেন? সেটা বার বার ভুলে যাওয়া হচ্ছে। একটি চড়াচণ্ড প্রজন্ম যেন লাফিয়ে লাফিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। জিহবাকে তরবারি বানিয়ে সবখানেই তার প্রয়োগ ঘটাবে তারা।

চড়ামাত্রার বক্তারা খুবই জনপ্রিয়। ভারসাম্য যে যত দ্রুত হারায়, সে ততই বিপ্লবী।

মুসলিমদের মধ্যকার বিভিন্ন ফেরকার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে মাত্রাহীনতা এখন সাধারণ বিষয়। ফলে বিভিন্ন ফেরকার মধ্যে যুদ্ধংদেহি অবস্থা দিন দিন বাড়ছেই। আলোচনা ও বিতর্কের উদ্দেশ্য তো সংশোধন ও সত্য উন্মোচন।

কিন্তু সংশোধনচিন্তার বদলে আক্রমণের ফলে কোনো ফেরকার লোকই সংশোধিত না হয়ে আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। আবার নতুন ফেরকাও গড়ে উঠছে।

অপরদিকে গণসম্পৃক্ততা, মানুষের চিত্তকে সংশোধন ও কল্যাণের আলো দ্বারা অবিরাম অাকর্ষিত করার যে ধারা সেটাও ম্রিয়মান প্রায়। সব মিলিয়ে মাদরাসা হয়ে উঠছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অপরদিকে হারাচ্ছে আভ্যন্তরীণ সামর্থ। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই।

আওয়ার ইসলাম: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মুসা আল হাফিজ: পাঠকগণসহ আপনাদেরও ধন্যবাদ।

https://ourislam24.com/2018/10/15/%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%93%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%AF%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE/