স্বীকৃতির জন্য বেফাক তার নামটি পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে -মুসলেহ উদ্দীন রাজু

img

কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতির বিষয়টি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শেষ মুহুর্তে এসে নানান উড়ো কথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ফলে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দ্বারস্থ হই, বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়্যাহ বাংলাদেশ এর সম্মানিত সহ-সভাপতি, হাইয়াতুল উলয়া’র অন্যতম সদস্য, আল্লামা নুরুদ্দীন গওহরপুরী রহ. এর সুযোগ্য সাহেবজাদা মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন (রাজু) ভাইয়ের সঙ্গে। নুরবিডি ডটকম এর পক্ষ থেকে টেলিফোনে গৃহিত দীর্ঘ এই সাক্ষাতকারে অনেক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে।পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা প্রত্রস্থ করা হলো।

নুরবিডি ডটকম: শুরুতেই তাঁর কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যে, সম্প্রতি হঠাৎ করে চট্ট্রগ্রামে কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতি নিয়ে ৫টি বোর্ড আলাদাভাবে মিটিং করে, এর কারন কি? স্বীকৃতির উপর কি এর কোন প্রভাব পড়বে?

মুসলেহ উদ্দীন রাজু: হাইয়াতুল উলয়ার জন্য সরকার অনুমোদিত ৩২সদস্য বিশিষ্ট যে নিয়মতান্ত্রিক কমিটি আছে, তার নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। বৈঠকে সকল বোর্ডের সদস্যগণ উপস্থিত থাকছেন। সেখানে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কথা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে, মতবিনিময় হচ্ছে।

গত এক মাস পুর্বে সর্বশেষ হাইয়াতুল উলয়ার বৈঠকে মাওলানা রুহুল আমীন সাহেব উপস্থিত ছিলেন। এর আগের মিটিং গুলোতে অসুস্থ্যতার জন্য হযরত উপস্থিত থাকতে পারেননি, তাঁর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। উনাদের সাথে আলোচনা করেই সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বেফাক সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে, এখলাসের সাথে সকলকে নিয়ে কাজ করছে।

যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়, সেটা হলো- সরকারের পক্ষ থেকে ১সপ্তাহ সময় দিয়ে একটি খসড়া নীতিমালা চাওয়া হয়। কী নিয়মের আলোকে কওমী মাদ্রাসার সনদ বাস্তবায়িত হবে তার একটি ধারণাপত্র চাওয়া হয়। সে প্রেক্ষিতে হাইয়াতুল উলয়ার মিটিং এ সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে একটি খসড়া গঠনতন্ত্র তৈরী করা হয়। এটা নিয়ে বৈঠকে উম্মুক্ত আলোচনা করা হয়।গঠনতন্ত্রের ব্যাপারে সকলেই একমত হন।

এছাড়া নিম্নের দুটি বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহনে মুক্ত আলোচনা হয়। বিষয় দুটি হলো-

ক। এক বোর্ডের মাদ্রাসা অন্য বোর্ডের আওতাধীন কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।
খ। এক বোর্ডের ছাত্র অন্য বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিতে পারবে না। পরীক্ষা দিলে শাস্তির আওতায় আসবে।

এ দুটি বিষয়ে নিয়ে কিছুটা বিতর্ক হয়। পরবর্তীতৈ সকলেই একমত পোষণ করেন এবং সেটা সরকারের নির্দিষ্ট কমিটির কাছে পৌছানো হয়।

কোনভাবেই তাদের কথা বলতে দেওয়া হয়না, বা তাদেরকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়না এমন অভিযোগ উঠেনি। হঠাৎ করে তারা কেন সেখানে মিটিং করলেন সেটা বোধগম্য নয়।এতে কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতির বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ছাড়া কোন উপকার বয়ে আনবে না। তাদের যদি কোন প্রস্তাব থাকতো, ক্ষোভ থাকতো, তাহলে সেটা চেয়ারম্যান, বা কো চেয়ারম্যানকে অবহিত করতে পারতেন।

নুরবিডি ডটকম: জনাব শামীম আফজাল সাহেব কিভাবে কমিটির সাথে যুক্ত হলেন, তাঁর কাছে উলামায়ে কেরাম কেন ধর্না দিলেন?

মুসলেহ উদ্দীন রাজু: বিষয়টি হচ্ছে, উলামায়ে কেরাম তাঁর কাছে ধর্ণা দেয়নি। বরং তিনি যখন সরকারের নিকট থেকে কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতি বাস্তবায়নে সরকার গঠিত কমিটিতে সদস্য হওয়ার চিঠি পেলেন, তখন সেটা নিয়ে আলোচনার জন্য হাইয়াতুল উলয়ার নেতৃবৃন্দের সাথে সেই চিঠি সমেত যোগাযোগ করেন এবং তিনি কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতি বিষয়ে জানতে আগ্রহী হন। সে প্রেক্ষিতে মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব এবং মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেব ডিজি মহোদয়ের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর কাছে প্রস্তাবিত গঠনতন্ত্র এর একটি কপি হস্তান্তর করেন। 
এখানে একটি অনলাইন জনাব আব্দুল কুদ্দুস সাহেবের সাক্ষাতের বিষয়টি উল্লেখ করলেও মাওলানা আশরাফ আলী সাহেবের নাম এড়িয়ে যায়। এ কারনে কিছুটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

নুরবিডি ডটকম : হাইয়াতুল উলয়া সরকারের নিকট থেকে জমি নিচ্ছে? এ ব্যাপারে আপনার কী বক্তব্য?

মুসলেহ উদ্দীন রাজু : এ বিষয়টিকে যেভাবে দেখা হচ্ছে, আসলে বিষয়টি তা নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টার পক্ষ থেকে এটি একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মাত্র। সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পর্যালোচনা হচ্ছে। সকলের পছন্দ হলে সেটা গ্রহন করা হবে, নতুবা নয়। এক্ষেত্রে যতটুকু আলোচনা হয়েছে তাতে পরিস্কার হয়েছে যে, সরকার কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতি দিচ্ছে, সরকার জমিটা দিয়ে হয়তো কৃতিত্বটা নিতে চায়। এই জমির জন্য কেউ আবেদন করেনি। তারপরও আলোচনায় এটা সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, একান্তই যদি নিতে হয়, তাহলে অবশ্যই হাইয়াতুল উলয়ার পক্ষ থেকে উপযুক্ত মূল্য দিয়েই নেওয়া হবে।

পাশাপাশি জনাব মুসলেহ উদ্দীন রাজু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: হাইয়াতুল উলয়ার জন্য সরকার স্ব-প্রণোদিত হয়ে প্রদত্ত জমি নিতে আপত্তি, কিন্তু জনাব ফরিদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের মাদ্রাসায়ও লিজ নেওয়া জমি আছে, বারিধারা মাদ্রাসায় লিজ নেওয়া জমি আছে, হাটহাজারী মাদ্রাসায় লিজ নেওয়া জমি আছে। এছাড়াও ঢাকার অনেক মাদ্রাসার জায়গা সরকারের ভূমিতে। সেটা আপত্তিজনক না হলে এখানে আপত্তি আসবে কেন?

নুরবিডি ডটকম: ইউজিসি এর ৯সদস্য বিশিষ্টি কমিটি আসলে কি?

মুসলেহ উদ্দীন রাজু : ইউজিসি’র পক্ষ থেকে ৯সদস্য বিশিষ্ট যে কমিটি করা হয়েছে এখানে আমাদের কোন হাত নেই। এটা শুধুমাত্র সরকারের নির্দেশে গঠিত হয়েছে। হাইয়াতুল উলয়া সরকারের কাছে স্বীকৃতির যে দাবী জানিয়েছে সেটা বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এটি একটি সুনির্দিষ্ট কমিটি।যেখানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া’র প্রতিনিধি আছে, ইউজিসি এর প্রতিনিধি আছে, এরসাথে ইফাবা এর ডিজি মহোদয়কেও রাখা হয়েছে। এই কমিটিই সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রস্তাব তুলে ধরবেন। তাদের সাথে লিয়াজো করার জন্য হাইয়াতুল উলয়ার কাছে সরকারের তরফ থেকে ৫জন আলেমের তালিকা চাওয়া হয়েছে। যা আল্লামা আহমদ দা.বা. এর কাছে এসেছে। তিনি এককভাবে যাদের পছন্দ করেন তাদের দিয়ে সেই তালিকা পুর্ণ করে জমা দিবেন। সরকারের কাছে হাইয়াতুল উলয়ার বিষয়টি তারা পরিস্কার করবেন।এখানে অস্পষ্টতার কিছুই নেই। এটা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

নুরবিডি ডটকম: স্বীকৃতি বিষয়ে নানা কথা ছড়ালেও এ নিয়ে কেউ কথা বলছেন না কেন?

মুসলেহ উদ্দীন রাজু : আসলে কথার পিঠে কথা বাড়ালে সমস্যাই শুধু বাড়বে। সমাধান হবে না। অনেকে ঘরোয়া বৈঠকের আলোচনাগুলো পছন্দনীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে বাইরের কাছে তুলে ধরছেন। কোন বিষয়ে তারা দ্বিমত পোষণ করলে সেটা সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে হাইয়াতুল উলয়ার কাজে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করতে চান। সে জন্য এর উত্তর দেওয়াটা সমীচিন মনে করা হচ্ছে না।

হাইয়াতুল উলয়ায় বেফাক এর প্রতিনিধিগণ খুব আন্তরিকতার সাথেই স্বীকৃতির বিষয়টি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে। যে প্রক্রিয়ায় গেলে সেটা সুন্দর মতো সমাধা হবে সেটাই অনুসরণ করা হচ্ছে। মৌলিক বিষয়ে সরকারের কোন কমিটির কাছেই কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। হবেও না।

এখানে আরও একটি বিষয় আছে। সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে এটা পরিস্কার যে, দাওরায়ে হাদীসের যে সকল মাদ্রাসা বাংলাদেশে আছে, তার প্রায় ৮৫%শতাংশ বেফাক নিয়ন্ত্রন করে। সে জন্য হাইয়াতুল উলয়ার কমিটিতে বেফাকের প্রতিনিধি স্বাভাবিক কারনেই বেশি। এ কারনেও অনেকে সত্য জেনেও চুপ থাকছেন। বেফাককে বিতর্কিত করার কৌশলী চেষ্টাও সেটা মনে করা যেতে পারে।

জনাব মুসলেহ উদ্দীন রাজু আফসোস করে বলেন: হাইয়াতুল উলয়ার কাজের ক্ষেত্রে যে সকল মতবিরোধ হয়, বা ব্যাখ্যা চাওয়া হয়, সে সকল ক্ষেত্রে অনেক সময় আল্লামা আহমদ শফি দা.বা, বা আল্লামা আশরাফ আলী সাহেবের ব্যখ্যাও অনেকে গ্রহন করতে চান না। এটা খুব বেদনাদায়ক।তাদের প্রতিও যদি আস্থা না রাখা হয়, তাহলে কোথায় সমস্যার সমাধান মিলবে? কিভাবে সমস্যার সুরাহা হবে?

স্বীকৃতি আদায়ের জন্য বেফাক শুরু থেকেই ছাড় দিয়ে আসছে। বেফাক আর কত ছাড় দিবে? বেফাক স্বীকৃতি নিয়ে গত ৩০ বছর ধরে এককভাবে আন্দোলন করে আসছে। আল্লামা আজিজুল হক রহ, মাওলানা আব্দুল জব্বার রহ প্রমুখসহ অসংখ্য আলেমের ত্যাগ ও কোরবানীর বদৌলতে যখন স্বীকৃতি একটি চূড়ান্তরূপ লাভ করে, তখন শুধুমাত্র ঐক্যের স্বার্থে বেফাক তার নিজের নামটি পর্যন্ত ছাড় দিতে রাজি হয়।

হাইয়াতুল উলয়ার নামে যে অফিসটি নেওয়া হয়েছে, সেখানে প্রতি মাসে প্রায় ১লাখ ৫০হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে এককভাবে বেফাক ১লাখ টাকা, অন্যান্য প্রতিবোর্ড মাত্র ১০ হাজার টাকা চাঁদা ধরা হয়। সেই টাকাও তারা দিচ্ছে না। বরং বেফাককে এককভাবে খরচ বহন করতে হচ্ছে। এছাড়া এ বছর খাতা দেখা বাবদ প্রায় ৪৫লাখ টাকা বিল আসে। সেটা বেফাক এককভাবে ২৫লাখ এবং অন্যান্য ৫টি বোর্ড মিলে বাকী ২০লাখ টাকা ম্যানেজ করতে বলা হয়। সেটাও দেওয়া হয়নি। বেফাকের পক্ষ থেকে ১বছর মেয়াদী সময়ে ধার দিতে বলা হয়, তাতেও তারা সম্মত হয়নি। সামান্য কিছু টাকা অন্যান্য বোর্ড দিতে সামর্থ হয়।

এভাবে প্রতিটি কাজে পরোক্ষভাবে বিরোধিতা করা হচ্ছে। উপরুন্ত দোষ চাপানো হচ্ছে বেফাকের উপর। অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় বেফাক এককভাবে অনেক বড়। সুতরাং কওমী মাদ্রাসার স্বকীয়তা রক্ষায় বেফাকের দরদ কোন অংশেই কম নয়। সেটা সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে। কওমী মাদ্রাসার কোন প্রকার ক্ষতি হোক সেটা বেফাক কখনই চাইবে না। স্বীকৃতির বিষয়ে কোন ভুল সিদ্ধান্ত হলে ক্ষতিতো বেফাকেরই বেশি হবে। আসল বিষয় হচ্ছে: স্বীকৃতির কার্যক্রম যথাযথভাবেই চলছে। এটা নিয়েও মূলত: ক্ষোভ নয়, ক্ষোভ অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে। যেটা এখান প্রকাশ করা হচ্ছে সেটা আসলেই দুঃখজনক।

নুরবিডি ডটকম: আমাদেরকে সময় দেওয়ায় আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মুসলেহ উদ্দীন রাজু: ধন্যবাদ আপনাদেরকেও।