গঙ্গা-তিস্তা, পাহাড় -সুন্দরবন সর্বত্র ভারতীয় আগ্রাসন

img

Zamaluddin Bari
জামালউদ্দিন বারী
কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের এই গ্রহ বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। তবে আধুনিক মানব সভ্যতার ইতিহাস ৫-৭ হাজার বছরের বেশি নয়। মানুষের জীবনধারণ ও জীবনমান উন্নয়নে মানব সভ্যতার এই বিবর্তন এই গ্রহের যেসব মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তা পুরো প্রাণী জগৎ ও মানুষসহ প্রাণীদের খাদ্যচক্র ও জীববৈচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরগুলোকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই ক্ষতির শতকরা আশিভাগ সংঘটিত হয়েছে বিগত একশ’ বছরে। মানুষ যতই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বারা নতুন নতুন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে জীবনের গতি, জৌলুস ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছে ততই আমাদের এই গ্রহ তথা প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। স্টীম ইঞ্জিন থেকে শুরু করে জেট ইঞ্জিন আবিস্কার, কয়লা ও পেট্টোলিয়ামের ব্যবহার বৃদ্ধির মাত্রা ক্রমশ নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলার মধ্য দিয়ে মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যেই বিশ্বকে একটি চরম ঝুঁকির মুখে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন আমাদেরকে জলবায়ু পরিবর্তন ও চরমভাবাপন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশের মারাত্মক সংকটের কথা সম্মিলিতভাবেই ভাবতে হচ্ছে। তবে দেশে দেশে রাজনৈতিক সংকট, বিভাজন এবং রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে এই সংকট ক্রমে আরো ঘণীভূত হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক ক্লাইমেট চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ তথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব সম্প্রদায়ের করণীয় এবং অভিযোজনের ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা সর্বপ্রথম ও সরাসরি আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। যদিও ফসিল জ্বালানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে বিশ্বের উষ্ণায়ণ ও জলবায়ুর পরিবর্তনে যে ভূমিকা পালন করেছিল, তাতে আমাদের অংশগ্রহণ অতি সামান্য হলেও আমরাই বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। গ্লোবাল ওর্য়ামিংয়ের কারণে হিমালয়ের আইসক্যাপগুলো ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে গলে যাচ্ছে। এ ধারা বাড়তে থাকলে আগামী দশকের শেষ নাগাদ আমাদের এ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা কয়েক মিটার বেড়ে যাবে। এতে করে আমাদের উপকুলীয় জনপদের বিশাল অংশ পানিতে তলিয়ে যাবে। ফসলি জমিতে নোনাপানি ঢুকে ব্যাপক ফসলহানি ঘটাবে। কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিনত হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা চরম আকার ধারণ করবে। এসব আশঙ্কা সামনে রেখেই আমাদেরকে এখন আগামী দিনের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার দিকগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হচ্ছে।

পুঁজিবাদি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জাতিগত ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা আমাদের এই গ্রহকে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলে বাস করছি। এ অঞ্চলের পাহাড়, নদনদী, বনভূমি, মাটি ও মানুষের মধ্যে হাজার বছরে একটি অভিন্ন সত্তা ও জীবনচক্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মানচিত্রের কারণে এই অভিন্ন সামগ্রিক সত্ত্বাকে বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান প্রধান পাহাড় ও নদনদীগুলো কোনো দেশের একক ভৌগলিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন হিমালয় পাহাড়ের অবস্থান নেপাল, ভারত, চীন ও তিব্বতে পরিব্যাপ্ত। তিব্বতের হিমবাহ থেকে নিসৃত জলরাশি নেপাল-ভারত ও বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। পদ্মার উজানে যেমন ভারতীয় অংশের নাম গঙ্গা, তিস্তার উজানের অংশের নাম ব্রহ্মপুত্র। একাধিক দেশের সীমান্ত অতিক্রমকারি নদীগুলো আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে স্বীকৃত। এসব নদীর উপর কোনো দেশের একপাক্ষিক নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫০ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশের নদীগুলোর উপর এককভাবে পানি আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। নদীগুলোর উপর একের পর এক বাঁধ নির্মান, শত শত কিলোমিটার সংযোগ খাল ও ফিডার ক্যানেল কেটে আন্তর্জাতিক নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ চরমভাবে ব্যাহত করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো নদীর পানি প্রবাহ ও পানি ধারণ ক্ষমতা অনেক কমে গিয়ে মূল নদীগুলোর প্রবাহ ও নাব্য হ্রাস পেয়েছে এবং শত শত শাখানদী শুকিয়ে বিলুপ্ত হয়ে এখন মজাখাল ও বর্ষায় মৌসুমী নদীতে পরিনত হয়েছে। তিস্তাপাড়ের কৃষিনির্ভর কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ফারাক্কায় বাংলাদেশের বিপর্যয় দেখার পর তিস্তার উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যভাগের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সরাসরি আক্রান্ত করেছে। আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার উপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মান করে বাংলাদেশের সাথে কোনো রকম সমঝোতা বা পানিচুক্তি ছাড়াই সত্তুরের দশকে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে দেয় ভারত। পরীক্ষামূলকভাবে চালুর কথা বলা হলেও বছরের পর বছর ধরে নানা টালবাহানার পর গঙ্গার পানিচুক্তি হলেও চুক্তির শর্ত বা বাধ্যবাধকতা অনুসারে কখনো বাংলাদেশকে প্রাপ্য পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দেয়নি ভারত। এভাবেই পদ্মা ও তার শাখানদীগুলো এক সময় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তিস্তার উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম চারণভূমি তিস্তা অববাহিকার প্রায় ৪ কোটি মানুষকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে ভারত।

সিন্ধু, গঙ্গা, ইরাবতি, মেকং, ব্রহ্মপুত্রসহ দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো তিব্বতের গিরিশৃঙ্গে উৎপত্তি হয়ে নেপাল ভারত হয়ে পাকিস্তান, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, লাওস, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ দেশগুলোর কৃষি, যোগাযোগ, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও নিরাপত্তা এসব নদীর উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো দেশ অন্য কোনো দেশ থেকে এমন পানি আগ্রাসণের শিকার হয়নি। এমনকি ভারতের অন্যতম আঞ্চলিক বৈরী দেশ পাকিস্তানের সাথেও সিন্ধু নদের পানি নিয়ে ভারতের আগ্রাসনের শিকার হতে হয়নি। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধুর পানিচুক্তি ৬০ দশকের বেশি সময় ধরে বলবৎ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ হলেও এই পানিচুক্তির উপর তার কোনো প্রভাব পড়েনি। অথচ বাংলাদেশের সাথে গঙ্গার পানিচুক্তি করেও ভারত তা রক্ষা না করে বাংলাদেশকে একটি চরম অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তিস্তার উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণের তিন দশক পেরিয়েও বাংলাদেশের সাথে পানিচুক্তি করতে নানা টালবাহানা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের উপর ভারতের পানি আগ্রাসন দীর্ঘ মেয়াদে পারমানবিক বিকিরণের চেয়েও বড় ধরণের ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারসহ বাংলাদেশের কোনো সরকারই আন্তর্জাতিক নদীর উপর ভারতের এই বৈরিতাপূর্ণ পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত রাজনৈতিক চাপ বা কূটনৈতিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। দেশের ১৭ কোটি মানুষ এবং আগামী প্রজন্ম ভারতের এই আগ্রাসণের চরম খেসারত দিতে চলেছে। অথচ এসব নদীর মূল নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে। উজানে অবস্থান করায় এবং বড় দেশ হওয়ায় ভারত যেমন বাংলাদেশের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে একইভাবে চীন ভারতের উপর আধিপত্যবাদী নীতি গ্রহণ করলে এবং নদীর উৎসমূলে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে ভারতের গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, নর্মদা পানিশূন্য হয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না। আগেই বলেছি, রাজনৈতিকভাবে যতই মানচিত্রের বিভাজন ঘটুক না কেন, পবর্তমালা, নদ-নদী, বনভূমি এবং সমুদ্রকে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্রের আওতায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা প্রায় অসম্ভব। যে কারণে ভারতের ফারাক্কা, তিস্তা বা টিপাইমুখ বাঁধ সমর্থনযোগ্য নয়, ঠিক একই কারণে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের উজানের চীনের বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের প্রকল্প সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু যে কাজ ভারত নিজেই বাংলাদেশের মত বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশির সাথে ৫দশক ধরে করে চলেছে, সেই একই ধরণের কাজ ভারতের বিরুদ্ধে চীন করতে শুরু করলে তার শক্ত প্রতিবাদ করার নৈতিক শক্তি ভারতের থাকে না। তিব্বতে ইয়ারলুং সাংবো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চীন এখন এসব নদীর উৎসমুখে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে এবং পানি প্রত্যাহার করে মরুভুমিকে সবুজ শস্যভূমিতে পরিনত করার পরিকল্পনা করছে।

ভারতের পানি আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশের পানি সংকট, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ক্ষতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে ভাবিত করলেও ভারতকে কখনো এ বিষয়ে নমনীয় দেখা যায়নি। এমনকি চীনের পক্ষ থেকেও উপমহাদেশে অববাহিকা ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। এখন চীনের ইয়ারলুং সাংবো প্রকল্পের পরিনাম সম্পর্কে ভীত ভারত কি চীনসহ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ ও অববাহিকা অঞ্চলকে নিয়ে আন্তর্জাতিক নদীর উপর একটি স্বচ্ছ পানিচুক্তি ও অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার কার্যকর একটি উদ্যোগ গ্রহণ করবে? তবে ভারত যাই করুক বাংলাদেশকে তার নদ-নদীর অস্তিত্ব সংকট নিয়ে বসে থাকার সময় আর নেই। বাংলাদেশের নদনদী, পাহাড়, সুন্দরবন এবং সমুদ্র নিয়ে ভারতের চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি, রক্তপাত ও অস্থিতিশীলতা, বাংলাদেশে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরুর আগে তিস্তার পানিচুক্তির মূলা ঝুলিয়ে তা প্রলম্বিত করা, সুন্দরবনের অদূরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্ত্র নির্মানের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনকে বড় ধরণের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়ার মত অপরিনামদর্শী কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ভারত। যে আইনগত প্রতিবন্ধকতা ও পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কার কারণে সুন্দর বনের ভারতীয় অংশে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অথচ সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ বাগেরহাটের রামপালে যৌথ বিনিয়োগে তাপবিদ্যুত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় ভারত সরকারের আগ্রহের কোনো কমতি নেই। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, ইরাবতি ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্যে বহু বিরল প্রজাতির একমাত্র আবাসস্থল এবং বাংলাদেশের উপকুলভাগের প্রাকৃতিক সুরক্ষা, বনজ সম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম প্রতিরক্ষা ব্যুহ রক্ষায় আন্তজার্তিক সম্প্রদায়, দেশের নাগরিক সমাজ এবং দেশি-বিদেশি পরিবেশ বাদি সংগঠনগুলোর আহ্বান ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে চলছে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ উদ্যোগ।

প্রায় এক দশক ধরে চলছে রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক। একদিকে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার, অন্যদিকে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদি সংগঠন, ইউনেস্কো, রামসার, দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিজ্ঞানীদের সুন্দরবন রক্ষার দাবি। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তাব গ্রহণের পর ইতিমধ্যে জাতীয় গ্রিডে আরো প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযুক্ত হয়েছে। এর অনেক পরে কাজ শুরু করেও চীনা সহযোগিতায় পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জাপানি সহযোগিতায় মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ দ্রুত সমাপ্তির কাছাকাছি চলে এলেও সুন্দরবন ধ্বংসকারি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্রগতি খুবই মন্থর। এমনকি রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিয়মান রূপপুর পারমানরবিক বিদ্যুত প্রকল্পও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ রেন্টাল পাওয়ার স্টেশনগুলোকে বসিয়ে রেখে কোনো বিদ্যুৎ খরচ না করেই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এখানেও ভারতের চাপিয়ে দেয়া বাণিজ্যের আগ্রাসন। দেশের রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে সার্ভিস চার্জ হিসেবে একদিকে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্ছা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে। দেশীয় রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মতই ভারত থেকে বিদ্যুত না নিয়েই বছরে হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। গত ৭ বছরে এ খাতে খরচ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুতে ভারত স্বয়ংসম্পুর্ন না হলেও ভূটান থেকে সোয়া ২ টাকা দরে বিদ্যুৎ কিনে বাংলাদেশে ৬-৮ টাকায় বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করছে। এভাবেই আমরা ভারতের সাথে বন্ধুত্বের খেসারত দিচ্ছি। বাংলাদেশকে ভারতের উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য ও নিম্নমানের সামগ্রীর ডাম্পিং স্টেশনে পরিনত করা হয়েছে। ভরা মৌসুমে ভারতীয় চাল, পেয়াজ, আলু বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে দেশের কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। আবার ঘাটতির সময় হঠাৎ করেই বিশেষ বিশেষ পণ্যের উপর অস্বাভাবিক বাড়তি ট্যাক্স আরোপ অথবা স্থলবাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিয়ে এ দেশের মানুষকে দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতীয় কর্মীরা বাংলাদেশ থেকে যে পরিমান রেমিটেন্স নিয়ে যায় তা ইউরোপ বা আমেরিকার যেকোনো দেশ থেকে বেশি। এরপরও ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকরা যখন তখন বাংলাদেশকে হুমকি দিয়ে চলেছে। আমাদের নদনদী, পাহাড়-সমুদ্র, সুন্দরবন, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ভারতীয় কৌটিল্যবাদী স্বার্থের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। তিস্তার পানিচুক্তি এবং গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর সময় ক্ষেপণের সুযোগ নেই। চীনের সহযোগিতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে শতবর্ষের মহা পরিকল্পনা ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন শুরুর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।


(উপসম্পাদকীয় কলাম, দৈনিক ইনকিলাব ১৭-০২-২১)