ভারত এখন আর সেক্যুলার নয়, এটি এখন একটি হিন্দু রাষ্ট

img

মোবায়েদুর রহমান

আজকের মূল আলোচনার বিষয় ভারতের উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক আইন পরিষদে পাশ হওয়া কুখ্যাত ‘লাভ জিহাদ’ আইন। হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকারের মুসলিমবিদ্বেষ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেটি বোঝা যাবে এই লাভ জিহাদ আইনে। তার আগে আরেকটি বিষয়। বেশ কিছুদিন পর ইদানিং আবার কিছু লোক বলছেন যে, এই উপমহাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের কবর রচিত হয়েছে। অনেকে তো এখন প্রকাশ্যে বলছেন যে, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এসব কথাবার্তা বলে এরা কি বোঝাতে চান বা কি বলতে চান সেটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। এসব কথার একটি উৎস আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পন করে তখন পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানী সেনাদের দখলমুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে এক অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের পতন হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। দ্বিজাতিতত্ত্বের অবসান ঘটেছে। দ্বিজাতত্ত্ব সম্পর্কে যা বলা হয়, সেটি সংক্ষেপে হলো এই যে, ভারতীয় উপমহাদেশে দুটি জাতি রয়েছে। তারা হলো মুসলমান এবং হিন্দু। ভারতীয়দের প্রচারণা মতে এবং বাংলাদেশে তাদের কিছু অনুসারীর মতে, ভারতে দুইটি জাতি নয়, একটিই জাতি রয়েছে। তারা হলো ভারতীয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো বা দখল মুক্ত হলো ১৬ ডিসেম্বর। তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ স্বাধীনতা পাওয়ায় খুশিতে উদ্বেল হয়ে ওঠে। কিন্তু তার সাথে দ্বিজাতিতত্ত্বের কবর রচনা সম্পৃক্ত হয় কিভাবে? সেদিনের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ যে বাংলাদেশ পেল সেটা তো দুদিন আগেও ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান যখন বাংলাদেশ হলো তখন সেই পূর্ব পাকিস্তানের এক ইঞ্চি জায়গাও তো কম বেশী হলো না। তাহলে দ্বিজাতিতত্ত্বের অবসান হলো কিভাবে?

অত্যন্ত সাদামাটা কথায় ভারত বিভক্তির অর্থ কি? অর্থ হলো ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চলে পাঞ্জাব এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলার বিভক্তি। আপাতত পশ্চিমাঞ্চলের পাঞ্জাবের কথা ভুলে যাই। বাংলা নিয়ে কথা বলি। দিনাজপুর তো এক জেলা ছিল। সেটা ভেঙ্গে দুই জেলা, অর্থাৎ পূর্ব দিনাজপুর এবং পশ্চিম দিনাজপুর হলো কেন? পশ্চিম দিনাজপুর গেল ভারতের ভাগে। কেন? সেটি হিন্দু সংখ্যাগুরু বলে। নদীয়া জেলা সামগ্রিকভাবে মুসলিম প্রধান ছিল। কিন্তু তারপরেও জেলাটি ভাগ হলো। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুর পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের ভাগে পড়ে। অবশিষ্ট অংশ ভারতের ভাগে পড়ে। কেন? কারণ ঐ অবশিষ্ট অঞ্চল হিন্দু প্রধান ছিল। সমগ্র যশোর জেলা মুসলিম প্রধান ছিল। কিন্তু দুইটি থানা ছিল হিন্দু প্রধান। থানা দুটি হলো বনগাও এবং গৈঘাটা। সেজন্য ঐ দুটি থানাও ভারতকে তথা পশ্চিমবঙ্গকে দেওয়া হয়। পার্টিশন প্ল্যান অনুযায়ী দিনাজপুরের বালুরহাট অঞ্চল, পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ভাগে পড়ার কথা। কিন্তু বালুরঘাটে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি ছিল বলে বালুরঘাট পশ্চিমবঙ্গে গেল।

আরো আছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ, সিলেট, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির কথা। যদি দ্বিজাতিতত্তে¡র অবসান হয়ে থাকে তাহলে দুই বাংলা আজও আলাদা হয়ে আছে কিভাবে? তার ভিত্তি কি? আর ভারত বিভক্তির জন্য কারা দায়ী? এসব প্রশ্ন নিয়ে ৩০ বছর আগে ‘ইনকিলাবে’ কয়েকটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। মনে হচ্ছে, ৩০ বছর পর এগুলো নিয়ে আবার বিস্তারিত লেখার দরকার আছে। নতুন প্রজন্মকে অনেক নির্মম ঐতিহাসিক সত্য ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন তাহলে ঐসব ইতিহাস, ঐসব কাহিনী নিয়ে আবার লিখবো। এবং ইনশাআল্লাহ, খুব শীঘ্রই।
দুই

ফিরে যাচ্ছি লাভ জিহাদের কথায়। লাভ জিহাদেও আমরা দেখতে পাবো সেই দ্বিজাতত্ত্ব, অর্থাৎ দুই জাতি, অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের কথা। গেল বছরের নভেম্বর মাসে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বা রাজ্য উত্তর প্রদেশে বিজেপির যোগী আদিত্যনাথের সরকার একটি আইন পাশ করেছে। এটি অত্যন্ত কঠোর এবং নিষ্ঠুর একটি আইন। এটি যে কত কঠোর এবং নিষ্ঠুর আইন সেটি বাংলা ভাষায় খুব ভালভাবে বোঝানে যায় না। বরং ইংরেজি Draconian শব্দটি এই আইনটি বোঝানোর জন্য এ্যাপ্রোপ্রিয়েট। আইনটির নাম, ‘লাভ জিহাদ আইন’। এই আইনটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, ভারতের মুসলমান পুরুষরা প্রেমের ছলনা করে হিন্দু মেয়েদের বিয়ে করে থাকে। এই আইনে বলা হয়েছে যে, কোনো হিন্দু নারী যদি শুধুমাত্র বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয় তাহলে সেই বিয়ে আইনের চোখে অবৈধ বলে গন্য হবে। এই আইন মোতাবেক, কোনো নারী বিয়ের পর ধর্মান্তরিত হতে চাইলে তাকে অনুমতির জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দরখাস্ত করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট অনুমতি দিলে তবেই ঐ নারী ধর্মান্তরিত হতে পারবে। যে পুরুষ ছলনা করে হিন্দু নারীকে বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করেছে সেই মুসলমান পুরুষটির ১০ বছর কারাদন্ড হবে।

এই আইন পাশ হওয়ার পর উত্তর প্রদেশের মুসলমান কিশোর এবং যুবকদের ওপর পুলিশী নির্যাতন শুরু হয়। এসব নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গেলে অনেক পৃষ্ঠা খরচ করতে হবে। এখানে আমরা দুই একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। মোরাদাবাদের কান্তা এলাকায় ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিসে ২২ বছরের এক হিন্দু যুবতীর সঙ্গে একজন মুসলিম যুবকের বিয়ে হয়। যুবকের সাথে ছিল তার ভাই। বিয়ের আসরে বাধা দেয় আরএসএস অর্থাৎ সংঘ পরিবারের অন্যতম শাখা বজরং দলের কয়েকজন সদস্য। ঘটনাস্থলে আসে পুলিশ। তারা তরুণীটিকে একটি অজানা জায়গায় নিয়ে যায়। তারা চিকিৎসক ডেকে গর্ভপাতের জন্য মেয়েটিকে একটি ইঞ্জেকশন দেয়। বিষয়টি আদালতে গড়ালে তরুণীটি বয়ান দেয় যে, সে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে। ১৫ দিন জেল খাটার পর আদালত যুবকটিকে মুক্তি দেয়।

লাভ জিহাদের অজুহাত তুলে রাজস্থানের রাজ সামান্দ এলাকায় এক মুসলমান যুবককে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকান্ডের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। পবিত্র ইসলামে জিহাদ হলো ধর্মযুদ্ধ। ইসলাম প্রচারে এবং রক্ষায় কাফেরদের সাথে যুদ্ধকে বলা হয় জিহাদ। অথচ মুসলিম যুবক কর্তৃক হিন্দু নারীকে বিয়ে করাকে ওরা বলছে জিহাদ। পবিত্র জিহাদের কি অপব্যাখ্যা! সারা ভারতের বিবেকবান মানুষ লাভ জিহাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং প্রতিবাদ করেছেন। ভারতের ২৮ টি প্রদেশ বা রাজ্য এবং ৮ টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১৭ টি প্রদেশ বা রাজ্যে বিজেপি সরকার অথবা বিজেপির নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার রয়েছে। এইসব প্রদেশ এখন উত্তর প্রদেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাচ্ছে। অর্থাৎ তারাও এখন লাভ জিহাদ আইন পাশ করার পাঁয়তারা করছে। লাভ জিহাদ নামক ঐ ড্রাকেনিয়ান বা কুখ্যাত আইনটি পাশ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ৫১ জন মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯ জনকে আড়াই মাস পর্যন্ত আটক রাখা হয়।

এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত ৪ জন বিচারপতি লাভ জিহাদ আইনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। চার বিচারপতি বলেন, হিন্দু-মুসলিম বিরোধকে উষ্কিয়ে দেওয়ার জন্যই লাভ জিহাদ নামক এই আইনটি পাশ করা হয়েছে। অমর্ত্য সেন বলেন, তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে, লাভ বা প্রেমের মধ্যে কোনো জিহাদ নাই। এই আইনে মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। জীবনযাপনের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। অমর্ত্য সেন আরো বলেন, লাভ জিহাদ আইন করে মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ধর্মীয় স্বাধিকার ভোগ করার অধিকার ভারতের সংবিধানে দেওয়া হয়েছে। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা চারু গুপ্তা বলেছেন, যখন কোনো মুসলিম নারী কোনো হিন্দু পুরুষকে বিয়ে করে তখন বলা হয় প্রেম। কিন্তু যখন কোনো মুসলিম পুরুষ কোনো হিন্দু রমনীকে বিয়ে করে, তখন সেটা হয়ে যায় প্রতারণা ও জবরদস্তি। এটি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বিমুখী নীতি।

তিন
যদি লাভ জিহাদ শুধুমাত্র উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগীর ব্রেন চাইল্ড হতো তাহলে হয়তো এই মুহূর্তে বিষয়টিকে সিরিয়াসলি না নিলেও চলতো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিজেপিতে যারা আরএসএসের কর্ণধার, তারাও এর সম্পর্কে ওকালতি করছেন। যোগী আদিত্যনাথ একজন আরএসএস নেতা। আর রাজনাথ সিং তার চেয়েও সিনিয়র নেতা। তিনি অমিত শাহ্ এর আগে বিজেপির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এখন মোদির মন্ত্রিসভায় মোদি এবং অমিত শাহ্র পরেই তাঁর স্থান। বর্তমানে তিনি ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। কিছুদিন আগে এলাহাবাদ হাইকোর্ট লাভ জেহাদ আইন বাতিল করেছেন। তারপরেও রাজনাথ সিং বলছেন যে, বিয়ের জন্য ধর্মান্তর মেনে নেওয়া যায় না। আমি বিয়ের জন্য ধর্ম পরিবর্তনকে সমর্থন করি না। অনেক সময় দেখা যায়, লোভ দেখিয়ে বা জোর করে ধর্মান্তর করা হচ্ছে। এই আইন করার আগে উত্তর প্রদেশ সরকার অনেক ভেবে চিন্তেই আইনটি করেছে। এলাহাবাদ আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর বিবাহের সিদ্ধান্তে তৃতীয় কোনো পক্ষের নাক গলানোর কোনো অধিকার নাই।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি সরকার একের পর এক যেসব মুসলিমবিরোধী পদক্ষেপ নিচ্ছে তাতে পরিষ্কার প্রমাণ হচ্ছে যে দ্বিজাতিতত্ত্বের অবসান সম্পর্কে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ ভুল। বরং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পরেও অবশিষ্ট ভারতের অভ্যন্তরেও দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল। বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে তদস্থলে রাম মন্দির নির্মাণ, তিন তালাক প্রথাকে অপরাধ গণ্য করে আইন প্রণয়ন, গো মাংসাসীদের ওপর জুলুম ও খুন, নাগরিক পঞ্জী বা শুমারী করা, নাগরিকত্ব আইন সংশোধন, জম্মু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ এবং লাভ জিহাদ- সবই এই ধারাবাহিকতার অংশ।

পবিত্র ইসলামে কোনো মুসলিম নারী বা পুরুষের কোনো মুশরিককে বিয়ে করার অনুমতি নাই। এক্ষেত্রে বিয়ে করলে ঐ মুশরিক নারী বা পুরুষকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। অবশ্য এখানে জোর-জবরদস্তি বা প্রতারণার কোনো সুযোগ নাই। এক্ষেত্রে যদি ঐ নারী বা পুরুষ স্বেচ্ছায় মুসলমান না হন তাহলে তাকে বিয়ে করা যাবে না।
ভারত এখন আর সেক্যুলার নয়। এটি এখন একটি হিন্দু রাষ্ট।
journalist15@gmail.com