দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আলেমদের চেয়ে বেশি দরদী আর কে?

img

ইক্বামতে দ্বীন তথা দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন একটি ব্যাপক বিষয়। এ নিয়ে আমাদের বিস্তর আলোচনা-পর্যালোচনা রয়েছে। দ্বীন এমন একটি জীবন ব্যাবস্থা যা মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ গাইডবুক। মানুষকে সৃষ্টি করার পর মানুষের মধ্যে আল্লাহর বিধান ও আল্লাহ প্রদত্ত নীতিমালার ওপরে সমাজকে পরিচালনা করার জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল এসেছেন। নবী রাসূলগণ কেউ কেউ দ্বীনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন, কেউ কেউ শুধু দাওয়াত দিতে দিতেই জীবন শেষ করেছেন।

দ্বীনের প্রধান উদ্দেশ্য মানুষকে সচেতন করা, সর্তক করা। আল্লাহর বিধান স্মরণ করিয়ে দেওয়া। রাসুল সা.কে আল্লাহ তায়ালা বহুভাবে বলেছেন যে, আপনার কাজ হলো, আমার দাওয়াত মানুষের কাছে উত্তম পন্থায় পৌঁছে দেওয়া। কে দ্বীন গ্রহন করলো, আর কে গ্রহন করলো না এর জন্য নবী-রাসূলগণকে জবাবদিহি করতে হবে না। কিন্তু উত্তম পদ্ধতিতে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে কী না সে সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। আর সে জন্যই বিদায়হজ্জ্বের ভাষণে সোয়া লক্ষ সাহাবীর সামনে রাসুল সা. সাহাবাদের লক্ষ্য করে বলেন, আমি কি তোমাদের সামনে আমার দাওয়াতকে যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি? সাহাবায়েকেরাম সমস্বরে বলেন. হ্যাঁ, আপনি যথাযথভাবে আমাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে বলেন, আমি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়েছি।

এর আলোকে বলতে চাই, আমরা নবীর যোগ্য উত্তরসুরি হিসেবে আমাদের তথা
আলেম সমাজের মৌলিক কাজ ৪টি।
১। দ্বীনি দাওয়াতকে যথাযথ সুন্দরভাবে পদ্ধতিতে এই সমযের মানুষের সামনে উপস্থাপন করা।
২। আমরে বিল মারুফ, তথা সৎকাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করা, প্রেরণা দেওয়া, সকল প্রকার ভালো কাজের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা।
৩। নেহি আনিল মুনকার তথা অসৎ কাজ, অন্যায় কাজ, সমাজবিরোধী কাজ, রাষ্ট্রবিরোধী কাজ যে বা যারাই করুক তা প্রতিরোধ করা।
৪। দ্বীনি শিক্ষার পরিবেশ তৈরী করা, দ্বীনের যাবতীয় মৌলিক বিষয়ে যেন কোনভাবেই কোন সমাজে বিভ্রান্তি তৈরী না হয়ে যায়, দ্বীন থেকে যেন মানুষ গাফেল না হয়ে যায় এ জন্য দ্বীন শিখার ব্যবস্থা করা।

ভারত উপমহাদেশে কেউ মানুক বা না মানুক এ ৪টি কাজ কিছুটা হলেও সুন্দরভাবে আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সমাজে হাজারো বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়া সত্ত্বেও মানুষের কাছে অন্তত এ বার্তাটি পৌছানো সম্ভব হয়েছে কোনটা দ্বীন আর কোনটা দ্বীন নয়। ভারতীয় আলেম সমাজের এটা এক বড় ধরণের সফলতা।

এদেশের আলেম সমাজ দ্বীনের দাওয়াত নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে অব্যাহত রেখেছেন। নিজেরা সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করে মানুষের কাছে এ বার্তাটি পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন যে, এটা দ্বীন, আর ওটা দ্বীন নয়। হয়তো সমাজের অনেক মানুষই এসব অনুসরণ করছে না, মানছে না, তথাপি এটা পরিস্কার করা সম্ভব হযেছে যে, সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য যে কোন সাধারণ মানুষ জানে।

এমনিভাবে ভারত উপমহাদেশের আলেম সমাজ সবসময়ই একটি বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন, সেটা হলো সৎ কাজের আদেশ করা, সমাজের মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহবান করা, ইসলামের সৌন্দর্যকে তাদের সামনে তুলে ধরা, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে, প্রতিষ্ঠা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। একাজটা উলামায়ে কেরামগণ করে গিয়েছেন।

পাশাপাশি ভারত উপমহাদেশে যখনই দ্বীন বিরোধী কোন চক্রান্ত হয়েছে, কোন বাতিল ফিরকা মাথা চাড়া উঠেছে, দ্বীনের নামে নতুন নতুন ফেরকা তৈরীর চেষ্টা করা হয়েছে, দ্বীনের কোন মৌলিক বিষয়ে ‍ভুল ব্যখ্যা দেওয়ার কোন চেষ্টা কেউ করেছে এর বিরোদ্ধে সবসময়ই রুখে দাঁড়িযেছেন। এসব ক্ষেত্র যখনই আলোচনায় আসে, তখন কিছু মানুষ আলেম সমাজের সামগ্রীক আন্দোলনকে সামনে না এনে ব্যক্তি বিশেষের ত্রুটি-বিচ্যুুতিকে খুব বড় করে ‍তুলে ধরে।

এক্ষেত্রে আমি উদাহরণ দিয়েই বলতে চাই, মাওলনা হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. দেশ বিভাজনের সময় বিভাজনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, এটাকেই কিছু মানুষ এত বড় করে উপস্থাপন করে যে, এদেশে ইসলামী দাওয়াত, তালীম এর ক্ষেত্রে যেন এদেশের আলেম সমাজের আর কোন অবদানই নেই। ঐটা ছিল একটি রাজনৈতক সিদ্ধান্ত। এটা ভুলও হতে পারে, সঠিকও হতে পারে। কিন্তু এটাই ভারতীয় আলেম সমাজের চূড়ান্ত অর্জন বা বিসর্জন নয়।

কেউ কেউ ভারত উপমহাদেশের আলেম সমাজের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ইংরেজি শিক্ষাকে হারাম বলেছিলেন, নিরুৎসাহিত করেছিলেন এটাকেই আলেম সমাজের বড় ধরণের অদূরদর্শিতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চান।এরা একবারও এটা ভাবতে পারেন না যে, ক্ষমতাসীন মুসলমানদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল জায়গা থেকে ইংরেজরা হটিয়ে দেওয়ার পর যখন ওদেরই নেতৃত্বে, ওদেরই সিলেবাসে এদেশের মানুষদেরকে ওদেরই স্বার্থে এদেশের শত শত বছর ধরে চলে আসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নির্মূল করে ইংরেজি শিক্ষা চালু করেছিল, ওই সময় যদি এদেশের সকল মুসলমান দলে দলে ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ইংরেজি শিক্ষা শুরু করে দিতো তাহলে আজ ভারত উপমহাদেশে কোটি কোটি পাক্কা ঈমানদার পাওয়া যেতো না। আজকে লক্ষ লক্ষ আলেম, হাফেজ, কারী, ইমাম, খতীব, ওয়ায়েজ কিছুই পাওয়া যেতো না।

ভারতীয় আলেম সমাজ ভারত উপমহাদেশে দ্বীনি শিক্ষারও হেফাজত করতে সক্ষম হয়েছেন। আজকে যারা মিষ্টার হয়েও ইসলাম নিয়ে কথা বলতে পারেন, তারা পরোক্ষভাবে এদেশের আলেম সমাজের কারণেই এতটুকু করতে সক্ষম হচ্ছেন।

ভারতীয় আলেম সমাজ প্রথমত: দ্বীনি শিক্ষার হেফাজত করেছেন, অত:পর দাওয়াত ও তাবলীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কোটি কোটি বনি আদমের অন্তরে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। এবং দেশ পরাধীন হওয়ার পর থেকে অদ্যবধি সৎ কাজের আদেশ করে আসছেন, যে কোন অসৎ কাজ, দ্বীন বিরোধী কাজে প্রচন্ড বিরোধিতা করতে সক্ষম হয়েছেন।

হ্যাঁ, প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারতীয় আলেম সমাজ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্বীন কায়েমে কতটুকু সফল হয়েছেন? রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন কায়েমে কতটুকু অবদান রেখেছেন? আমি এ ব্যাপারেও বলবো, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারত উপমহাদেশের আলেম সমাজ দ্বীন কায়েমে সর্বোচ্চ সফলতা না পেলেও যারা রাষ্ট্র চালায় তাদেরকে সতর্ক রাখতে সক্ষম হযেছেন। তাদেরকে সর্বোচ্চ চাপের মধ্যে রাখতে এখনো পর্যন্ত সারা বিশ্বের মধ্যে ভারত উপমহাদেশের আলেমদের সফলতাই বেশি। আজ বিশ্বের কোথাও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইসলাম কায়েম নেই। না মধ্যপ্রাচ্যে, না অন্য কোন দেশে।

অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় শক্তি যতটুকু দ্বিধাহীন চিত্তে ইসলাম বিরোধী অনেক কাজ করতে সাহস করে, ভারত উপমহাদেশে, এমন কি হিন্দুরাষ্ট্র ভারতেও ইসলাম বিরোধী কোন কাজ করতে রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হয়। আজকে হয়তো কট্টরপন্থী বিজেপি ইসলাম বিরোধী অনেক কিছুই করছে, কিন্তু সেই ভারতেই বিজেপির ভিতকে দুর্বল করতে নানাভাবেই ভারতীয় উলামায়ে কেরাম যথেষ্ট ভূমিকা রেখেই চলেছেন।

কিছু মানুষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ারটাতে বসতে পারাকেই ইসলাম কায়েম মনে করে। যে কোন মূল্যে ঐ চেয়ারটা একবার দখল করতে পারলেই ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে এমনটা বিশ্বাস করে। এরা মনে করে, ঐ চেয়ারটায় বসেই রাষ্ট্রে নামাযের রাষ্ট্রীয় হুকুম জারি করে দিবে, বেশ্যাখানা বন্ধ করে দিবে, মদ হারাম করে দিবে, নারীদের পর্দার ভিতর থাকার আইন জারি করে দিবে এবং পরিপূর্ণ ইসলাম কায়েম হযে যাবে। বাস্তব অবস্থা হলো, কোনভাবে ঐ চেয়ারটাই ইসলামী পোশাকধারী কেউ বসে যেতেও পারলেও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতার কারণে এর তেমন কিছুই করতে পারবে না, যেমনটা পারছে না আজকের এরদোয়ান। তার মাথার ওপর এখনো কামাল আতাতুর্কের ছবি ঝুলছে।

ভারত উপমহাদেশে এদেশের আলেমরা একটি সচেতন মুসলিম সমাজ উপহার দিতে সক্ষম হযেছে। এত ব্যাপক সফলতা বিশ্বের অনেক দেশেই সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ চেয়ারে বসতে পারাকেই আমি একমাত্র ইক্বামতে দ্বীনি কাজ মনে করি না। এটা চূড়ান্ত লক্ষ্য। হয়তো অচিরেই ইনশাআল্লাহ সেই লক্ষ অর্জনে মুসলমানদের কোন দল সক্ষম হবে। এদেশে ইসলামের ওপর চূড়ান্ত আঘাত আসার সময় এদেশের আলেমরা যতটা কৌশলের সাথে দ্বীনি শিক্ষা, দাওয়াত ও মুসলিম সমাজকে রক্ষা করতে পেরেছেন, উসমানি খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র তুরস্কেও এতটা সফলতা সেই অঞ্চলের আলেমরা করতে পারেননি। তুরস্কে মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় যে পর্যায়ের চূড়ান্ত জুলুম নেমে এসেছিল সেটা ভারতীয় আলেমদের কারণে বৃটিশ করতে সক্ষম হয়নি।

আজকে এরদোয়ানদের ক্ষমতার শীর্ষারোহন দেখে আমরা এদেশের আলেমদের কেউ কেউ অহনির্শ গালি দিই, ভারত উপমহাদেশে এমন একজন এরদোয়ান দাঁড়িয়ে যান, দেখবেন এদেশে ইসলাম কীভাবে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইনশাআল্লাহ অচিরেই হবে। অচিরেই আমরা একজন নব্য এরদোয়ান ভারত উপমহাদেশেও দেখতে পাবো। তখন এদেশের আলেম সমাজকেই সবচেয়ে বেশি সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখতে পাবেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম কায়েমে যারা আলেম সমাজকে প্রতিবন্ধক মনে করেন তারা ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে পশ্চাদগামী মানসিকতা ধারণ ও লালন করেন বলেই আমি মনে করি। এক্ষেত্রে নিজেদের ব্যর্থতা, অদূরদর্শিতার জন্য আলেম সমাজকে দায়ী করা এক ধরণের কূপমন্ডুকতা। এরদোয়ানদের মতো আপনারা এদেশের মাটিও আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যশীল কৌশর অবলম্বন করে দেখেন আলেমগণ আপনাদেরকে কীভাবে মাথায় তুলে নাচে। ইসলামের জন্য এদেশের আলেমদের চেয়ে দরদ আর কা’র বেশি হতে পারে?


জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম
01.09.2020
রুফাকা টাওয়ার