প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম

img

দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করতে এবং দেশের সুনাগরিক হিসেবে তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুলতে বহুমুখি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই।শিক্ষাজীবন শেষে বিশেষ করে দেশের কওমী শিক্ষার্থীরা এক ধরণের মনস্তাত্বিক অস্বস্থিতে ভোগেন। তারা কী করবেন? কোন পেশা গ্রহন করবেন? কীভাবে সংসার চালাবেন? দেশেরই সেবা করতে কোন কাজটি করলে তার জন্য সহজ এবং শোভনীয় এসব বিষয় নিয়ে তারা চিন্তিত থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের দেশের বড় বড় মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠিত মুহতামিম যারা দীর্ঘ ৩০/৪০বছর ধরে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে একটি পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছেন, নিজেদের সন্তাদির জন্য নিজেরাই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাটাও নিশ্চিত করে ফেলেছেন, তারা আর দশটা গরীব অথবা সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য কর্মসংস্থান নিয়ে কোন প্রকার চিন্তা-ভাবনা করেন না। তারা নিজ প্রতিষ্ঠানের ফারেগীনদের ভবিষ্যত নিয়ে কোন প্রকার দায় অনুভব করেন না।

এজন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে গতানুগতিক দাওরায়ে হাদীস শেষ করার পর ২/৩টি বছর নানামুখি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের তৈরী করার সুযোগ দিলে তারা নিজেরাই দেশের বিভিন্ন সেক্টরে প্রবেশের পথ করে নিতে পারতো। এজন্য বড় বড় মাদ্রাসাগুলোতে এক বছরের ব্যবসায় শিক্ষাকোর্স, সাহিত্য-সাংবাদিকতা, উচ্চারণ ও উপস্থাপনা কোর্স, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, প্রাত্যহিক আরবী ভাষা শিক্ষণ, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা কোর্স ইত্যাদির আয়োজন করলে ছেলেরা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যত গড়ে নিতে পারবে।

বর্তমানে অনেক তরুন ব্যবসায় এগিয়ে আসছে। কিন্তু এদের মৌলিক কোন প্রশিক্ষণ নেই, ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা নেই। বর্তমানে ব্যবসায় যে ধরণের জ্ঞান থাকতে হয়, ব্যবসায়িক কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হয় এ সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক কোন ধারণা না থাকায় নিজেদের উদ্যোগে কিছু করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু একটা সময়ে এসে তারা হতাশায় পড়ে যাচ্ছেন। বিশেষকরে অর্থ সংকট, লেন-দেনে মানুষের চরিত্র, ব্যাংকিং সুযোগ-সুবিধা আদায়ের কৌশল জানা না থাকায় তারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

দেশে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। অথচ এক্ষেত্রে আলেমদের কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। কেউ কেউ কাজ করছেন। তা সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত উদ্যোগে।তারা যতটুকু শিখেছেন তাও নিজেদের একান্ত আগ্রহে। এতটুকু শিক্ষা যদি প্রতিষ্ঠান থেকে শিখে আসতে পারতেন তাহলে তারা আরো বেশি অগ্রসর হতে পারবেন। ভাষার নেতৃত্ব গ্রহন করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। এতে দেখা যায় এক সপ্তাহ বা ১৫দিনের জন্য কোর্সের আয়োজন করে থাকেন। অথবা দিনব্যাপি প্রশিক্ষণের আয়োজন থাকে। সেখানেও আবার ৫০০/টাকা ফি দিতে হয়। অথবা ১০০০/১৫০০/- টাকা ফি দিতে হয়। এতে অনেকেই আগ্রহ বোধ করেন না।

কওমী মা্দ্রাসায় যে সকল বিষয়ে বছরব্যাপী তাখাসসুসের ব্যবস্থা করা হয়, তার সাথে অন্তত আরো ৩টি বিষয়কে এ মুহুর্তে খুব গুরুত্বের সাথে দেশের সব বড় বড় প্রতিষ্ঠানে তাখাসসুস খোলা খুব জরুরী মনে করি। তিনটি বিষয় হলো: :
১। ভাষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, উপস্থাপনা, উচ্চারণ শিক্ষা কোর্স।
২। ব্যবসায় শিক্ষা, প্রচলিত ব্যবসার ধরণ, পদ্ধতির সাথে ইসলামী অর্থনীতির সমন্বয় শিক্ষা কোর্স।
৩। ইংলিশ স্পিকিং, কম্পিউটার পরিচালনা, ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক্স শিক্ষা কোর্স।

হাটহাজারী, পটিয়া, দারুল মাআরিফ, জামিয়া ইমদাদিয়া, ফরিদাবাদ, মালিবাগ, রাহমানিয়া, জামিল বগুড়া, বসুন্ধরা ইত্যাদির মতো প্রায় ১০০টি বড় মাদ্রাসায় যদি এসব কোর্স চালু করা যায়, তাহলে প্রতি বছর যদি প্রতিটি মাদ্রাসা থেকে ২০/২৫জন করে ছাত্রও বের হয়, তাহলে বছর শেষে দুই থেকে আড়াই হাজার প্রশিক্ষিত জনশক্তি বের হবে। তারা কোর্স শেষে নিজেরাই ভালো ভালো কমংস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে পারবে। শুধু তাই নয়, কওমী মাদ্রাসার সুনাম ও সুখ্যাতিকে আরো বেশি সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

আমাদেরকে সীমিত গন্ডী থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, কওমী মাদ্রাসাগুলোর কাছে জাতি আরো অনেক কিছু চায়। শুধু কোনরকমে দাওরায়ে হাদীস পাশ করিয়ে দেওয়াই যেন শেষ লক্ষ্য না হয়।

কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনকারী কোন ছেলে-মেয়েই যেন মনস্তাত্বিক দুর্বলতায় না ভোগে। তাদেরকে অবশ্যই আরবী, ইংরেজি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ন্যূনতম ব্যবহার শিখে আসতে হবে। তাহলে সমাজের সর্বস্তরে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

আর এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা ছোটখাটো সংগঠনের পক্ষ থেকে যে সব উদ্যোগ নেওয়া হয় এটা কোনভাবেই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদী ফলপ্রসুও নয়। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা উস্তাদদের খুব আনুগত্য করে, সেই উস্তাদরা যদি তাদেরকে এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে, তাদের মধ্যে এক ধরণের প্রেরণা সৃষ্টি করে মাঠে পাঠায় তাহলে তারা খুব ভালো করবে। এ ব্যাপারে বড়দের দৃষ্টি দেওয়া সময়ের অন্যতম দাবী। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সময়ের চাহিদা বুঝার তৌফিক দান করুন।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম
31.08.2020