জিহাদ হতে হবে সীরাতের নমূনায় (১)

img

------------- মুফতী আবদুস সালাম চাটগামী
( গত ১/১২/২০ঈ. বুধবার দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারীর ইফতা বিভাগের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে মুফতীয়ে আযম আবদুস সালাম চাটগামী হাফিযাহুল্লাহ, জিহাদ সম্পর্কে প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহাযারা।)

(১মপর্ব)
نحمده ونصلي على رسوله الكريم، أما بعد:
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ سورة التوبة:122)
তাফাক্কুহ ফিদদীন আপনাদের মূল লক্ষ্য!
আলোচ্য আয়াতটি সূরা তাওবার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। আল্লাহ তাআলা সূরা তাওবায় জিহাদ বিষয়ে এবং মুশরিক ও মুনাফিকদের ব্যাপারে অনেক বিধিবিধান বর্ণনা করেছেন। জিহাদ বিষয়ে কুরআনুল কারীমে অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, জিহাদে শরীক হওয়া সকল মুমিনের জন্য আবশ্যক। কারো জন্য জিহাদ থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই।

আমি যে আয়াত পড়েছি, এর পূর্বের আয়াত দ্বারা এটাই বুঝে আসে। বিশেষকরে তাবুক যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেনি, তাদের মধ্যে কিছু তো মুনাফিক ছিল। আর কিছু একনিষ্ঠ মুমিনও ছিল। তাবুকে শরীক না হওয়ায় মুমনিদের সাজা পেতে হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাহাবায়ে কেরাম মনে করেছেন যে, জিহাদ থেকে বিরত থাকা কারো জন্যই বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত দ্বারা এ ধারণা দূর করেছেন যে, তোমরা যেমন ভেবেছো বিষয়টি তেমন নয়। আল্লাহ তাআলা আয়াতের প্রথম অংশে ইরশাদ করেন, “মুসলমানদের জন্য উচিত নয় যে, তারা সবাই জিহাদে বের হয়ে যাবে।” তাহলে তাদের কী করা উচিত? আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে কোনো একটি দল ফিকহ ফিদদীন অর্জন করার জন্য বের হয় না ?” আয়াতের প্রথম অংশে জিহাদের ব্যাপারে। সেখানে বলেছেন: সবাই যাতে বের না হয়। কোনো একটি দল বের হবে।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে দীন শেখার ব্যাপারে। সেখানেও বলেছেন: সবাই দীন শেখার জন্য বের হবে না। প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একটি দল বের হবে।
তো এখানে দীনের ‍ুদুটি বিভাগের কথা উল্লেখ হয়েছে। প্রত্যেক বিভাগ অপরটির সাথে সম্পর্ক রাখে। সকল মানুষ এক কাজে লেগে গেলে দুনিয়ার নেযাম ঠিক থাকবে না। একটি বিল্ডিং তৈরী করার সময় কেউ ইট তৈরী করে। কেউ দেয়াল তৈরী করে। কেউ দরজা, জানালা তৈরী করে। সবাই একই কাজে লেগে যাওয়া মারাত্মক ভুল।
দীনের প্রত্যেক বিভাগে কাজ হওয়া চাই। দীনের প্রত্যেক বিভাগে কিছু কিছু লোক কাজ করবে। যাতে দীনের সকল বিভাগ জারি থাকে। এই তারতীব, এই কর্মবন্টন কুরআন-হাদীসে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
তাফাক্কুহ ফিদদীন অনেক বড় বিষয়। কুরআন-হাদীস , ফিকহ ইত্যাদি সবকিছু দীনকে বোঝার জন্য, দীনের ইলম অর্জন করার জন্য। এটা আপনাদের বৈশিষষ্ট্য যে, আপনারা তাফাক্কুহ ফিদদীন অর্জণ করার জন্য বের হয়েছেন। এখানে সমবেত হয়েছেন। মাদরাসায় থাকা অবস্থায় তাফাক্কু ফিদদীনই আপনাদের মূল লক্ষ্য থাকবে। আয়াতের দাবি অনুযায়ী আপনারা দীনের ইলম ও আহকাম শিক্ষা করবেন। দীন শিক্ষাকে মূল লক্ষ্য বানাবেন।

#জিহাদের বিধান পালনে ইতিদাল (মধ্যমপন্থা) জরুরী
আয়াতে জিহাদের বিধানের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে। জিহাদ ফরযে কিফায়া। হাদীসে উল্লেখ হয়েছে:
الجهاد ماض إلى يوم القيامة
এক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, জিহাদের জন্য বের হওয়া যেমন ফরযে কিফায়া; ইলমের জন্য বের হওয়াও ফরযে কিফায়া। কিফায়া পর্যায়ের জিহাদ ফরয হওয়ার পর যদি কেউ বের না হয়, তাহলে সবাই গুনাহগার হবে। আবার যদি সবাই বের হয়ে যায়, তাহলেও গুনাহগার হবে। কেননা, এতে দীনের অন্যান্য বিভাগ শূন্য হয়ে যাবে। বেকার হয়ে যাবে। কেউ বের না হওয়া যেমন অপরাধ, তেমনিভাবে কোনো বিভাগে কাজ হলো না, এটাও অপরাধ। ইতিদাল রক্ষা করা জরুরী।
দীনের সকল শাখায় কাজ হওয়া জরুরী। তাবলীগওয়ালারা যদি বলে, সবাইকেই বরে হতে হবে, তাহলে তা ইতিদাল পরিপন্থী হবে। এটা দীনের শিক্ষা নয়। বিষয়টা আপনাদের ভালো করে বুঝে নিতে হবে। কোনো বিধানের গুরুত্ব ও পর্যায় কতটুকু তা জানতে হবে। দীনের সকল শাখায় কাজ হওয়া চাই। এটা অতীব জরুরী। এটাই দীনের তাকাযা। দীনের দাবী।
ইতোমধ্যে আপনারা জানতে পেরেছেন, সফরে জিহাদ ফরযে কিফায়া। ইলমের জন্য বের হওয়াও ফরযে কিফায়া। উভয়ের আলাদা আলাদা শর্ত আছে। সফরে ইলমের আলাদা কিছু শর্ত রয়েছে। সফরে জিহাদেরও আলাদা কিছু শর্ত রয়েছে। আজ জিহাদের শর্তসমূহের ব্যাপারে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার ইচ্ছা করি।

#শর্ত না বুঝে জযবা প্রদর্শন ঠিক নয়
আপনারা নাকি জিহাদওয়ালা। জযবাওয়ালা। আজকাল অধিকাংশ তালিবুল ইলমকে শেকায়েত করতে শোনা যায় যে, আমাদের আসাতিযায়ে কেরাম জিহাদের ফযীলতের ব্যাপারে, জিহাদে বের হওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেন না। কিন্তু এই শেকায়েত সহীহ নয়। বাস্তবসম্মত নয়। কেননা, জিহাদের আলোচনা কুরআনে আছে; হাদীসে আছে। কুরআন ও হাদীসের দরস চলছে; লেখনির মাধ্যমেও আলোচনা করছেন অনেকে। তবে কার্যত জিহাদ কখন আরম্ভ হবে তা শর্তনির্ভর। জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য এবং জিহাদে বের হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে।
আসবাবে জিহাদ, জিহাদের উপযোগী স্থান, তরবিয়তপ্রাপ্ত জনশক্তি, আমীর নিযুক্তি, প্রতিরক্ষা শক্তি ও অস্ত্রসস্ত্র ইত্যাদি বিষয়গুলো জিহাদের অন্যতম শর্ত। এখানে বসে বসে বাবুল জিহাদের কিছু হাদীস পড়ে লাফালাফি করলে তো হবে না। এটা দীন নয়।

দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলা নবী বানিয়ে মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে, শরীআতের বাস্তবায়নকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। দীর্ঘ তেরো বছর মক্কায় কাটিয়েছেন, যা ছিল দারুল হারব। এই দারুল হারবে তেরোটি বছর শত জুলুম-নির্যাতনের মাঝেও তালীম-তাবলীগের কাজ চালিয়ে গেছেন। প্রতিবাদ করেননি। গরম নয়, নরম কথা বলেছেন। পাথরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। কিন্তু পাল্টা পাথর ছুঁড়েননি। সাহাবায়ে কেরাম কষ্ট সহ্য করেছেন। এতকিছুরও পরও আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল জিহাদের হুকুম দেননি। মক্কায় কিছুসংখ্যক লোক মুসলমান হয়েছিলো। কিন্তু এ সংখ্যা কাফেরদের তুলনায় কিছুই ছিলো না। এমতাবস্থায় যদি লড়াই হতো, তবে খুব সহজেই কাফেররা মুসলমানদের নিঃশ্বেষ করে দিতো। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা তো দীনকে যিন্দা করা। কিয়ামত পর্যন্ত দীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম যখন মেহনত করলেন এবং যতটুকু কাজ হওয়ার ততটুকু হলো, তখন আল্লাহ তাআলা হুকুম দিলেন, আপনি আর এখানে অবস্থান করবেন না। এখানে থাকলে কেবল কষ্টই পেতে হবে। এরা দীন কবুল করবে না। মদিনায় হিজরত করুন; যেখানে আপনি আযাদির সাথে দীন প্রচার করতে পারবেন। তখন একদা বারোজন মদীনাবাসী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় দফায় আশিজন ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনায় ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনায় ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী আরও অনেকে ছিলেন। তাদের বাসনা ছিলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন মদীনায় চলে আসেন। তারা তাঁকে সর্বদিক দিয়ে সযোগিতা করবেন।
হিজরতের বিধান জারি হওয়ার পর কত কষ্ট করে সাহাবায়ে কেরাম হিজরত করেছেন। কত ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন তারা হয়েছেন। মক্কার মুশরিকরা সাহাবায়ে কেরামকে আপন জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করে রিক্তহস্ত করেছে।
মদিনার আনসারী সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেমন বিরল সহযোগিতা করেছিলেন ইতিহাস তার সাক্ষী! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করলেন। প্রত্যেক মুহাজিরকে একেকজন আনসারী সাহাবীর সাথে জুড়িয়ে দিলেন। ঠিক যেমন সম্পর্ক দুই সহোদরের মাঝে হয়ে থাকে।
আনসারী সাহাবায়ে কেরাম ঈমানকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন। মুহাজির মুমিনদের থাকার জায়গা দিয়েছেন। জমিন দিয়েছেন। ব্যবসার জন্য অর্থকড়ি দিছেন। মদিনার আনসার সাহাবায়ে কেরাম মুহাজির ভাইদের বলেছেন, আমাদের ঘরে আপনাদের অংশ রয়েছে।
আমাদের জমিনে আপনাদের অংশ রয়েছে। বাগানেও আপনাদের অংশ রয়েছে। কিন্তু মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম বলেছেন, থাকার জন্য জায়গা দেয়া এতটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমরা ততদিন আপনাদের ঘরে থাকবো, যতদিন নিজেরা থাকার ঘরের ব্যবস্থা করতে পারবো না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় তাশরীফ আনলেন। মদীনাবাসীরা জায়গা দিলেন। সেখানে মুশরিক, আহলে কিতাব, ইহুদী, নাসারা ছিলো। মক্কা থেকে গিয়ে মুসলমানদের একটি জামাত সেখানে আশ্রয় নিলো। জায়গা পাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে মসজিদ নির্মাণ করলেন। মাদরাসা কায়েম করলেন। দীন শিক্ষা দেয়ার কাজ শুরু করলেন। রাসূল মসজিদে নববী ছাড়া আরও ষোলটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। আযাদি অর্জন হলো। মসজিদ নির্মাণের আযাদি। দীনের শিক্ষা প্রচার-প্রসারের আযাদি। যে আযাদি মক্কায় ছিলো না, সেটা মদিনায় এসে অর্জন হলো। সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে নববীতে এসে স্বাধীনভাবে দীনি শিক্ষা নিতে পারতেন এবং দিতে পারতেন। তালীম-তাবলীগের সূচনা হয়ে গেলো। মাদরাসার সূচনা হয়ে গেলো।
মদিনায় আসামাত্রই জিহাদের হুকুম আসেনি। যখন সেখানে অবস্থান সুদৃঢ় হলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির, আনসার, নতুন, পুরাতন সব সাহাবায়ে কেরামের আদমশুমারী করলেন।
লক্ষ করুন, কথাগুলো দেমাগে সংরক্ষণ করতে হবে। আমি জিহাদের শর্ত বর্ণনা করছি। ‘হাওয়াই’ কথা বলছি না। এ সব কথা কিতাবে আছে। জিহাদ বুঝতে হলে শর্তকে বুঝতে হবে। অন্যথায় জিহাদ বোঝা হবে না; বরং নিজের খাহেশাতকেই বোঝা হবে। শর্ত না বুঝে জযবা প্রদর্শন ঠিক নয়।
তো হালত যখন প্রতিকূল হয়, ভূখণ্ড যখন দারুল হারব হয়, অথবা দারুল হারবের মতো হয়, তখন আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সীরাতকেই অনুসরণ করতে হবে। গোড়া থেকে চিন্তা করতে হবে।
চলবে...